চলতি মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। গত দুই মাসের তুলনায় এ মাসের ১৭ দিনে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রোদ, এই বৃষ্টি- এমন আবহাওয়াই এডিস মশার বিস্তারে খুবই সহায়ক হয়। এ কারণে এ মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। রোগী বাড়লে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ে। আগামী অক্টোবর মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুর এমন ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা থাকতে পারে। এবারের ভয়াবহতা ২০১৯ সালের মতো হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
এদিকে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনায় সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বিশেষায়িত হাসপাতালের পরিচালক, জেলা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক, সিভিল সার্জন, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে জরুরি ১২ নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জুলাই মাসে ১০ হাজার ৬৮৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। মৃত্যু হয় ৪১ জনের। আগস্ট মাসে ভর্তি হয়েছেন ১০ হাজার ৪৯৬ জন। মৃত্যু হয়েছে ৩৯ জনের। সেপ্টেম্বর মাসে মাত্র ১৭ দিনে ভর্তি হয়েছেন ৮ হাজার ৩৩৮ জন, মৃত্যু হয়েছে ৩৯ জনের।
চলতি বছরে ডেঙ্গু রোগী বাড়তে শুরু করে জুন থেকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, থেমে থেমে বৃষ্টিতে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে যায়। রাস্তায় কিংবা বাসাবাড়ির আনাচে-কানাচে পড়ে থাকা পলিথিন, বিভিন্ন খাবারের প্যাকেট, ডাবের খোসাসহ বিভিন্ন আধারে পানি জমে যায়। এখন সেখান থেকেই এডিস মশার বিস্তার হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, মাঝে ডেঙ্গুর প্রকোপ কিছু কম ছিল। বৃষ্টির কারণে এখন বাড়ছে। অক্টোবরেও বাড়বে। তিনি বলেন, ২০২৩ সালের মতো পরিস্থিতি না হলেও ২০১৯ সালের মতো হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৯ সালে ১ লাখ ১ হাজার ৩৭৪ জন আক্রান্তের মধ্যে ১৬৪ জনের মৃত্যু হয়। চলতি বছরের এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৯ হাজার ৮৪১ জন। মৃত্যু হয়েছে ১৬১ জনের। এবার ১৯ সালের মতো আক্রান্ত না হলেও বছরের সাড়ে ৯ মাসে মৃত্যু প্রায় তখনকার সমান। তবে এবার যদি ১৯ সালের মতো আক্রান্তের সংখ্যা হয়, তাহলে মৃত্যুর সংখ্যা দুই থেকে তিন গুণ বেশি হওয়ার আশঙ্কা জনস্বাস্থ্যবিদদের।
২০২০ সালে করোনার কারণে ডেঙ্গুর দিকে নজর ছিল না। ২০২১ সালে আক্রান্ত হন ২৮ হাজার ৪২৯ জন। মৃত্যু হয় ১০৫ জনের। ২০২২ সালে ৬২ হাজার ৩৮২ জন আক্রান্ত হন। মৃত্যু হয় ২৮১ জনের। ২০২৩ সালে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। সে বছর আক্রান্ত হন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন। মৃত্যু হয় ১ হাজার ৭০৫ জনের। ২০২৪ সালে ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন আক্রান্তের মধ্যে ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, সারা দেশে যদি আন্দোলনের মতো ছাত্রদের অংশগ্রহণে পরিচ্ছন্নতা অভিযান করা যেত, তাহলে হয়তো একটা দৃশ্যমান পরিবর্তন আসত। সে ধরনের কিছু হচ্ছে না। বাসাবাড়িতে ফুলের টবে যাতে পানি জমে না থাকে, সে দিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
২৪ ঘণ্টায় ৫ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ৬৬২
ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৬২ জন। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, মৃত পাঁচজনের চারজন নারী, একজন পুরুষ। নারী চারজনের বয়স যথাক্রমে ২৭, ২৮, ৫৪ ও ৫৫ বছর। পুরুষের বয়স ৫৪ বছর। মৃত নারীদের দুজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং অন্য দুজন এবং এক পুরুষ রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১২ নির্দেশনা
১. ডেঙ্গু রোগীদের জরুরি ভিত্তিতে এনএসওয়ান পরীক্ষা করতে হবে। এনএসওয়ান/এন্টিজেন কিটের জন্য সিএমএসডি অথবা সিডিসির সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
২. ভর্তি ডেঙ্গু রোগীদের যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হবে হাসপাতালে সেসব পরীক্ষা সার্বক্ষণিক করার ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় সাধারণত যেসব ওষুধ এবং অন্য চিকিৎসা উপকরণের প্রয়োজন হয়, হাসপাতালে সেগুলোর প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. ভর্তি সব ডেঙ্গু রোগীকে হাসপাতালের একটি নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে বা কক্ষে বা স্থানে রাখতে হবে।
৫. ভর্তি ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগীদের চিকিৎসার জন্য মেডিসিন, শিশু ও প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে বোর্ড গঠন করতে হবে। এই বোর্ডের তত্ত্বাবধায়নে মেডিকেল অফিসার/রেসিডেন্ট/প্রশিক্ষণার্থী চিকিৎসকদের একটি নির্দিষ্ট দল তৈরি করতে হবে যারা শুধু ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগীদের চিকিৎসা দেবেন।
৬. বহির্বিভাগে আসা রোগীদের মধ্যে যাদের ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত বলে সন্দেহ হবে, তাদের একটি নিদিষ্ট কক্ষে ওপরে উল্লিখিত বিশেষজ্ঞ বোর্ড এবং চিকিৎসকরা চিকিৎসা প্রদান করবেন।
৭. ভর্তি ডেঙ্গু রোগীদের আইসিইউর প্রয়োজন হলে তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।
৮. ডেঙ্গুর তথ্য সংরক্ষণ ও প্রেরণের জন্য একজন নার্সকে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব প্রদান করতে হবে।
৯. ডেঙ্গু রোগী মারা গেলে সংক্ষিপ্ত তথ্য ৬ ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালের পরিচালক/তত্ত্বাবধায়ক এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালককে (হাসপাতাল ও সিডিসি) লিখিতভাবে জানাতে হবে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিশদ তথ্য যাচাই করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও সিডিসি) বরাবর পাঠাতে হবে।
১০. হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ককে মেয়র (সিটি করপোরেশন/পৌরসভা) বরাবর হাসপাতালের চারপাশে মশক নিধন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনার জন্য চিঠি দিতে হবে।
১১. প্রতি শনিবার সকালে হাসপাতালে পরিচালক/তত্ত্বাবধায়ক/সিভিল সার্জনের সভাপতিত্বে ডেঙ্গু সমন্বয় সভা করতে হবে।
১২. অন্যান্য জেলা হাসপাতাল প্রয়োজনে এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে পারবে।