চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলায় পাহাড় এবং টিলা ধ্বংসের ঘটনা সম্প্রতি নতুন মাত্রা পেয়েছে। খবরের কাগজের অনুসন্ধানে ফটিকছড়ি উপজেলার ৭ নম্বর কাঞ্চন নগর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ কাঞ্চন নগর চারা বটতল ও আমতল এলাকায় টিলা কাটার তথ্য উঠে এসেছে। এ ছাড়া আনোয়ারা উপজেলার কেইপিজেডের ভেতরে পাহাড় কাটার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয়রা জানান, মহিন উদ্দিন নামে এক প্রবাসী ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চন নগর ইউনিয়নে এক্সক্যাভেটর দিয়ে উঁচু টিলা কাটেন। ওই টিলায় পুরোনো কবরস্থান থাকার অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ। তবে টিলা কাটা শুরু করার আগে তিনি চারপাশে পাকা দেয়াল তুলে দেন। যাতে বাইরে থেকে কেউ বুঝতে না পারেন ভেতরে কী হচ্ছে। তবুও বিষয়টি স্থানীয়দের নজর এড়ায়নি। দিন এবং রাতে সমানতালে টিলা কাটার ঘটনা দেখে তারা উপজেলা প্রশাসন এবং পুলিশকে খবর দেন। গত শুক্রবার রাতে পুলিশ গিয়ে টিলা কাটার বিষয়টি হাতেনাতে প্রমাণ পায়। এ সময় এক্সক্যাভেটর চালককে আটক করা হয়। তবে গতকাল শনিবার তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
ফটিকছড়ি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মুজিবুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘মুচলেকা নিয়ে এক্সক্যাভেটর মালিকের জিম্মায় আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তার অপরাধ নেই। তাই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। টিলার মালিককে থানায় আসতে বলা হয়েছে।’
জানতে চাইলে প্রবাসী মহিন উদ্দিন জানান, চার মাস আগে তিনি জায়গাটি কিনেছেন। এখন বাড়ি নির্মাণের জন্য এক্সক্যাভেটর দিয়ে মাটি কাটছেন। তবে যখন তিনি চারপাশে পাকা দেয়াল নির্মাণ করেন তখন তাকে কেউ বাধা দেয়নি।
টিলা কাটার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে অনুমতি নিয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পরিবেশ আইন সম্পর্কে ধারণা নেই। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে অনুমতি নেওয়ার বিষয়টি জানা ছিল না। জানলে আবেদন করতাম।’ থানায় যাওয়ার জন্য তাকে খবর দিয়েছি উল্লেখ করে বলেন, ‘যার কাছ থেকে জমিটি কিনেছি, তাকে সঙ্গে নিয়েই থানায় যাব।’
এদিকে আনোয়ারা-কর্ণফুলী উপজেলায় অবস্থিত কোরিয়ান রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (কেইপিজেড) আবারও নতুন কারখানা স্থাপনের নামে পাহাড় কেটে বনাঞ্চল ধ্বংস করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, ২০০৯ সালে উচ্চ আদালত কেইপিজেডকে ‘ড্রেসিং’-এর সীমিত অনুমতি দিলেও পাহাড় ধ্বংস করার অনুমতি দেননি। আদালতের নির্দেশনা ও শর্ত অনুয়ায়ী, যেকোনো ধরনের পাহাড় কাটতে হলে পরিবেশ অধিদপ্তরকে জানাতে হবে এবং জলাধার ও বনায়ন সংরক্ষণ করতে হবে। কিন্তু আদালতের নির্দেশনা, পরিবেশ আইনের বিধান এবং প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নির্বিচারে পাহাড় কাটছে কেইপিজেড।
এর আগে ২০১২ সালে পাহাড় কাটার অভিযোগে
কেইপিজেডের তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর মামলা করে। এতদিন বন্ধ থাকলেও আবারও পাহাড় কাটতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে প্রতিষ্ঠানটি।
খবরের কাগজের আনোয়ারা সংবাদদাতা সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, কেইপিজেড নতুন কারখানা স্থাপনের জন্য পাহাড় কেটে সমতল করছে। এতে দেয়াঙ পাহাড়টি বিলুপ্তির পথে। এ ছাড়াও কেইপিজেডে থাকা বাকি টিলা-পাহাড়গুলোও সমান করে নতুন রাস্তা ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। ফলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। বন্যপ্রাণী লোকালয়ে নেমে আসায় ফসলের ক্ষয়ক্ষতি ও মানুষের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। গত সাত বছরে আনোয়ারা-কর্ণফুলী এলাকায় বন্য হাতির আক্রমণে ২২ জন নারী-পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন প্রায় অর্ধশতাধিক মানুষ। এ ছাড়া পাহাড় কাটার ফলে চলতি বছরের পহেলা মে পাহাড়ধসে দুই স্কুলছাত্রের মৃত্যু হয়।
পাশাপাশি কেইপিজেড কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়দের মধ্যে সীমানা নির্ধারণ নিয়ে প্রায়ই সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। গত ৭ মে স্থানীয়দের সীমানা দখল নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে থানা পুলিশ ও কারখানা পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. দিদারুল আলম ও নুরুল হক শাহ বলেন, ‘আনোয়ারা-কর্ণফুলীর এই পাহাড়গুলো আমাদের জীবনের অংশ। অথচ কেইপিজেড কর্তৃপক্ষ নতুন কারখানা স্থাপনের অজুহাতে এখানকার পাহাড়গুলো ধ্বংস করছে।’ তারা আরও বলেন, ‘সরকারের এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। পাহাড় টিকে থাকলে টিকবে জলাধার, বজায় থাকবে প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও বাঁচবে আমাদের আগামীর প্রজন্ম।’
কেইপিজেডের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) মো. মুশফিকুর রহমান খবরের কাগজকে জানান, তিনি এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে পারবেন না।
কেইপিজেডের ইতিহাস ও পরিবেশ সংরক্ষণ সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৬ সালে বেসরকারি ইপিজেড আইন অনুযায়ী কেইপিজেড ২ হাজার ৪৯২ একর জমির ওপর স্থাপিত হয়। সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, ৩৩% জমিতে বাধ্যতামূলকভাবে বনাঞ্চল গড়া ও ১৯% জমি জলাধার বা ফাঁকা জায়গা রাখতে হবে। তবে ৮৪০ একর জমিতে কারখানা নির্মাণের অনুমোদন ছিল।
পাহাড় কাটার বিষয়ে কথা বলার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম জেলার উপপরিচালকের মোবাইল নম্বরে ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিদর্শক মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন ফয়সালকে ফোন করা হলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে কল কেটে দেন।
জানতে চাইলে চিটাগং ডেভেলপমেন্ট ফোরামের মুখপাত্র মোহাম্মদ খোরশেদ আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘২০১১ সালের একটি রায়ে উচ্চ আদালত বাঁশখালীর গুনাগরি পাহাড়ের কাটা অংশ ছয় মাসের মধ্যে ভরাটের নির্দেশ দিয়েছিলেন। সে সময় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে পাহাড়টি ভরাটের কাজ শুরু করেছিল পাহাড়খেকোরা। কিন্তু সেই কাজটি পরিপূর্ণভাবে তখন সম্পন্ন করা হয়নি। বাস্তবতা হলো স্থানীয় প্রশাসনের যোগসাজশ কিংবা নির্লিপ্ততার কারণে চট্টগ্রাম শহর কিংবা উপজেলার সব জায়গার পাহাড় ও টিলা নিশ্চিহ্ন হচ্ছে। যা আমাদের জন্য চরম অশনিসংকেত। পরিবেশকে যেভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে একদিন পরিবেশ তার দ্বিগুণ প্রতিশোধ নেবে। নেমে আসবে বিপর্যয়।’