জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নাগরিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কারণ বেশির ভাগ নাগরিক সেবা পেতে এর দরকার হয়। তবে এনআইডিতে ভুল থাকলে সেবা নিতে তাদের অসুবিধায় পড়তে হয়। কিন্তু সেই ভুল সংশোধন করতে গিয়েও নানা হয়রানি ও বিড়ম্বনার শিকার হতে হয় গ্রাহকদের। আর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এমন অব্যবস্থাপনার সুযোগে অফলাইন-অনলাইন দুই মাধ্যমেই প্রতারণার ফাঁদ পেতে বসেছে প্রতারক চক্র। ফলে দ্রুত বা কম সময়ে এনআইডি সংশোধনের জন্য তাদের ফাঁদে পড়ে আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন অনেকে। আর সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলে চক্রের সদস্যরা হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থ। অন্যদিকে এনআইডি সংশোধনের জন্য ব্যক্তিগত ডকুমেন্টস ও তথ্য দিয়ে ঝুঁকিতে পড়ছেন গ্রাহকরা।
এনআইডি সংশোধনে সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের সঙ্গে সংস্থাটির অসাধু কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সেবামূলক এই কাজে এমন অপতৎপরতার জন্য প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘসূত্রতাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এখন শুধু ভোট দেওয়ার মাধ্যম নয়, বরং ব্যাংকিং, সম্পত্তি, চাকরি, ভাতা ও নাগরিক অধিকারের মূলে এটি অপরিহার্য। এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিলের সংশোধন কার্যক্রমে অনিয়ম, প্রতারণা ও গাফিলতি গ্রহণযোগ্য নয়।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের এনআইডি কার্যক্রমে বিশ্বাসযোগ্যতা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার স্বার্থে এনআইডি সংশোধনে চলমান এই প্রতারকের কর্মকাণ্ড দমন করাই এখন সময়ের দাবি। কারণ পরিচয়পত্রের ভুলে অনেকের চাকরি হয় না, কেউ বেতন বা পেনশন পান না, কেউ ব্যাংকে লেনদেন করতে পারেন না। কারওবা পাসপোর্ট ও ভিসা করতে অসুবিধা হয়। এমনকি পরিচয়পত্রে ভুল থাকায় অনেক হতদরিদ্র ভিজিএফসহ বিভিন্ন ত্রাণ পর্যন্ত নিতে পারেন না। পরিচয়পত্রসংক্রান্ত এ ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
প্রতারণার ধরন
এনআইডি সংশোধন কাজে অফলাইন ও অনলাইন দুই মাধ্যমেই সক্রিয় দালাল ও প্রতারক চক্রের সদস্যরা। তাদের লক্ষ্য আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবন এবং জেলা-উপজেলা নির্বাচন অফিসে এনআইডি সংশোধন করতে গিয়ে হয়রানি বা বিড়ম্বনার শিকার হওয়া গ্রাহকরা। দ্রুত কাজ করে দেওয়ার আশ্বাসে ‘অফিসে যাইতে হইবে না’, ‘তাড়াতাড়ি করায়ে দিমু’ ইত্যাদি কথার জালে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে।
সম্প্রতি এনআইডি সংশোধন করতে গিয়ে নির্বাচন ভবন এলাকায় দালালের খপ্পরে পড়েন মিরপুরের শাহ আলী থানার বাসিন্দা আনিছুর রহমান (৪৬)। জিজ্ঞেস করতেই খবরের কাগজকে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন অফিসে বারবার ঘুরেও আমি এনআইডি সংশোধনের কাজ করতে পারিনি। শেষে বিরক্ত হয়ে এক দালালের মাধ্যমে কাজ করার চেষ্টা করেছিলাম, তাতেও ব্যর্থ হয়েছি। ওই দালাল প্রথমে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ৩ হাজার টাকা নিলেন। পরে কাগজপত্র হারিয়ে গেছে বলে আমার কাছ থেকে আরও ২ হাজার টাকা নিলেন। এর তিন দিন পর যোগাযোগ করলে তার ফোনটি বন্ধ পাই। অগত্যা তাকে খুঁজে না পেয়ে আবারও নির্বাচন অফিসে এসেই লাইনে দাঁড়িয়েছি।’
অনলাইনে অভিনব ফাঁদ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার) বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে রকমারি ফাঁদ পেতেছে প্রতারকরা। এসব পেজে ‘এনআইডি হেল্প সেন্টার/লাইন’, ‘দ্রুত এনআইডি সংশোধন’, ‘ঘরে বসে করুন নাম, বয়স ও ঠিকানা পরিবর্তন’, ‘এনআইডি/স্মার্টকার্ড সংশোধন’, ‘হারানো এনআইডি বের করা হয়’- এ ধরনের বিজ্ঞাপন দিয়ে ভুক্তভোগীদের আকৃষ্ট করে আস্থা অর্জন করে প্রতারকরা। এমনকি সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রতিনিধি পরিচয়ে অনেকে এনআইডি সংশোধনে আবেদনের নামে গ্রাহকের ছবি, জন্মসনদ সংগ্রহ করে। আর কাজ করে দেওয়ার আশ্বাসে বিপুল টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পরও সেবা দেয় না। গ্রাহকের নাম ও তথ্য সংগ্রহ করে রাখে প্রতারক চক্র। পরে ওই গ্রাহকের তথ্য হয়রানি, জালিয়াতি বা পরিচয় চুরির কাজে প্রতারকরা ব্যবহার করে।
অনলাইনে বিজ্ঞাপন দেখে এনআইডি সংশোধন করতে গিয়ে প্রতারকদের ফাঁদে পড়েছিলেন ঢাকার রায়েরবাজার এলাকার বাসিন্দা রাশেদুল ইসলাম (৩৭)। রাশেদুল জানান, তার এনআইডিতে মায়ের নামের বানান ভুল থাকায় অনলাইনে আবেদন করেন। ফেসবুক পেজে ‘দ্রুত এনআইডি সংশোধন’ নামে একটা বিজ্ঞাপন দেখে তিনি সংশ্লিষ্ট ফোন নম্বরে যোগাযোগ করেন। কাজটি করতে তারা রাশেদুলের কাছে ৭ হাজার টাকা দাবি করে। তবে টাকাসহ প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস নিয়েও তারা কাজটি করে দেয়নি। পরে ভুক্তভোগী রাশেদুল বিজ্ঞাপনে থাকা ওই ফোন নম্বরটি বন্ধ পান, এমনকি ওই চক্রের পেজটি পুনরায় খুঁজে পেতে ব্যর্থ হন।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক সময় নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে অ্যাক্সেস করে নাগরিকদের সুরক্ষিত তথ্য সংগ্রহ করছে কিছু চক্র। পরে তা ব্যবহার করা হচ্ছে ভুয়া এনআইডি তৈরি, ঋণ জালিয়াতি বা অবৈধ সম্পত্তি লেনদেনে। এনআইডি সংশোধন করতে আসা ভুক্তভোগীদের জালে ফেলতে নির্বাচন অফিসের আশপাশে বিচরণ করা এসব দালালের সঙ্গে ইসি সচিবালয়ের অসাধু কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত। দালালরা অফিসে কর্মরত ওই সব অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে ভুক্তভোগী গ্রাহকের আবেদন ফরম পূরণ, ছবি তোলা, তথ্য এন্ট্রিসহ সব কাজ করে থাকে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী খবরের কাগজকে বলেন, ‘দালালদের সক্রিয়তা আসলে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা ও সেবা জটিলতারই ফল। সাধারণ মানুষ বারবার ঘুরেও সমাধান না পেয়ে বাধ্য হয়ে অসদুপায় অবলম্বন করছেন। এই সুযোগে সক্রিয় হচ্ছে প্রতারক চক্র, যা দেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও ব্যক্তি নিরাপত্তা- তিন ক্ষেত্রেই হুমকি।’ এ ধরনের প্রতারকদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও ফৌজদারি আইনের বিভিন্ন ধারা অনুযায়ী জালিয়াতি, তথ্য চুরি ও প্রতারণার অভিযোগে মামলা করার পরামর্শ দিলেন তিনি।
জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক এ এস এম হুমায়ুন কবীর খবরের কাগজকে বলেছেন, ‘আমরা সম্প্রতি এনআইডি সংশোধন নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ পাচ্ছি। প্রায় ৯ লাখ আবেদন নিষ্পত্তির জন্য আমরা বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম নিয়েছিলাম। তাতে জমে থাকা বেশির ভাগ আবেদনই নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে। এনআইডিবিষয়ক প্রতারণার ঘটনায় কিছু প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অনলাইনে প্রতারণার বিষয়ে আমাদের তদন্ত চলছে।’ তিনি আরও জানান, তৃতীয় পক্ষ এনআইডি যাচাইয়ের নামে ডেটা চুরি করেছে- যার মধ্যে কিছু ব্যাংক ও বেসরকারি সংস্থাও রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধেও তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এনআইডিবিষয়ক প্রতারণা বন্ধে নির্বাচন কমিশনের অনলাইন সিস্টেম আরও সহজ, স্বচ্ছ এবং সেবাপ্রত্যাশীদের জন্য ব্যবহারবান্ধব করা জরুরি। ইসির মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এনআইডি তথ্যের নিরাপত্তা রক্ষা এবং সার্ভার অ্যাক্সেস সীমিত করা জরুরি। দালাল ও প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রমাণ সাপেক্ষে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতারক চক্রের তৎপরতা সম্পর্কে গণসচেতনতা বাড়াতে তারা গণমাধ্যম ও সিভিল সোসাইটির ভূমিকা জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন।