আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের গণভোট একই দিনে আয়োজনের সরকারি সিদ্ধান্তে নতুন করে পরিকল্পনা সাজাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এক দিনে দুটি ভোট আয়োজনের চ্যালেঞ্জ এখন ইসির সামনে। এ পর্যায়ে দুই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা এবং ভোট গ্রহণের তারিখ চূড়ান্ত করতে ব্যস্ত সংস্থাটি। ইসির একাধিক অসমর্থিত সূত্র জানিয়েছে, আগামী ৪ অথবা ৭ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণা ও ৫ ফেব্রুয়ারি ভোটের তারিখ ঘোষণার পরিকল্পনা ইসি সচিবালয়ের। এরই মধ্যে তফসিলের প্রস্তুতিও প্রায় শেষ। সরকারি নির্দেশ পেলেই তা ঘোষণা করা হবে।
বাংলাদেশে ১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালে তিনটি গণভোট হয়েছে। তবে কখনো জাতীয় নির্বাচনের দিনে গণভোট হয়নি। এবার জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতির শেষ ধাপে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত- সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হবে একই দিনে। এতে অপ্রত্যাশিতভাবে ইসির কর্মপরিধি দ্বিগুণ হয়ে গেছে। তারপরও সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী একসঙ্গে সংসদ ও গণভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি। ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ের সংগ্রহ, সীমানা পুনর্নির্ধারণ, ভোটকেন্দ্রের তালিকা, ভোটার তালিকা, নতুন রাজনৈতিক দল ও পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন ও প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ- সবই চূড়ান্তের পথে।
প্রবাসে থাকা বাংলাদেশি ভোটারদের বিষয়টিও রয়েছে। সংসদ নির্বাচনে প্রতীক নিয়ে ব্যাপক প্রচার থাকবে প্রার্থীদের আর গণভোট নিয়ে গ্রামে-গঞ্জে সচেতনতামূলক প্রচার চালানোর বিষয় রয়েছে। ব্যয় ২০ শতাংশের বেশি বাড়বে। এ পর্যায়ে গত ১৩ নভেম্বর থেকে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচনি সংলাপ করছে কমিশন।
এদিকে আসন পুনর্বহালে উচ্চ আদালতের রায় নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে ইসি। সম্প্রতি বাগেরহাটের আসন পুনর্বহালের রায় এবং সীমানা পুনর্নির্ধারণসংক্রান্ত আরও প্রায় ৩০টির বেশি আবেদন আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, আদেশের কপি হাতে পাওয়ার পর করণীয় ঠিক করবে কমিশন। তবে সংসদীয় আসনের জটিলতার মীমাংসায় বিলম্ব ঘটলে সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণায় প্রভাব পড়বে- এমন শঙ্কা বেড়েছে।
কোন কোন খাতে ব্যয় বাড়বে
বর্তমান নির্বাচনের প্রস্তাবিত বাজেট ২ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকা। আলাদা দিনে গণভোট হলে অতিরিক্ত ব্যয় হতো প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এক দিনে করলেও ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা বাড়তি খরচ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একই দিনে দুই ভোট আয়োজন কিছুটা সাশ্রয়ী হলেও ব্যয় বাড়বে অন্তত ২০ শতাংশ। ইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ভোটকক্ষ বাড়ানো, অতিরিক্ত ব্যালট পেপার ছাপানো, অতিরিক্ত ব্যালট বাক্স বা ভিন্ন রঙের ব্যালট ব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সংখ্যা বাড়াতে নির্বাচনি ব্যয় বাড়াতে হবে।
ভোটকেন্দ্র অপরিবর্তিত, বাড়বে ভোটকক্ষ
গতকাল মঙ্গলবার ইসি প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী এবার দেশে ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার। এর সঙ্গে যুক্ত হবেন প্রায় ১০ লাখ প্রবাসী ভোটার। এসব ভোটার প্রথমবার আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেবেন। এই ভোট গ্রহণের প্রক্রিয়াও ইসিকে সামলাতে হবে।
সংসদ নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে এবার ইসির নির্ধারিত ভোটকেন্দ্র রয়েছে ৪২ হাজার ৭৬১টি। এটি আপাতত অপরিবর্তিত রাখার কথা ভাবছে কমিশন। তবে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৯টি ভোটকক্ষ বা বুথের সংখ্যা বাড়ানোর দরকার হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কারণ দুটি ব্যালট দেওয়ায় ভোটারের বেশি সময় লাগবে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় বয়োবৃদ্ধ ও স্বল্পশিক্ষিত ভোটারদের ক্ষেত্রে গণভোটের ব্যালট বুঝতে অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে। তাই বুথ সংখ্যা কমিয়ে যে নতুন বিন্যাস করা হয়েছিল, সেটি পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। দুটি ব্যালটের আলাদা গণনার জন্য সম্ভবত দুটি আলাদা গণনা টিম, অতিরিক্ত সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার, অতিরিক্ত গণনা প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হতে পারে। ৯ থেকে ১০ লাখ ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৭ থেকে ৮ লাখ সদস্য নিয়োজিত থাকবেন ভোটে। ইসির নির্দেশে রিটার্নিং অফিসারের তত্ত্বাবধানে ৩০০ আসনে সার্বিক নির্বাচন পরিচালনা হয়। এরই মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক করেছে।
ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, সংসদ ও গণভোটের ব্যালট গণনায় আলাদা দুই সেট লোকবল না হলে গণনার সময়সীমা দীর্ঘ হবে। ফলে রাতভর গণনা বা পরদিন পর্যন্ত কাজ চালাতে হতে পারে।
নতুন চাপ: ব্যালট পেপার, বাক্স ও সরঞ্জাম
দুটি নির্বাচনের ব্যালট পেপার আলাদা রঙে ছাপাতে হবে। সংসদ নির্বাচনের ব্যালট এবং গণভোটের ব্যালট একসঙ্গে রাখতে হলে রং আলাদা করা বাধ্যতামূলক। ইসির সাবেক উপ-সচিব মিহির সারওয়ার মোর্শেদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মতো একই বাক্সেও রাখা যায়, কিন্তু অতিরিক্ত ব্যালট বাক্সের প্রয়োজন হতে পারে, বিশেষ করে উচ্চ আদালত বা দলের নজরদারি বিবেচনায়।
তিনি বলেন, ‘এক দিনেই দুটি ভোট অর্থাৎ আড়াই লাখ বাড়তি ব্যালট বাক্স ব্যবহার হলে পরে সেগুলো আর কাজে লাগবে না- অতিরিক্ত সংরক্ষণ ব্যয়ও তৈরি হবে।’
এদিকে গণভোটের প্রশ্ন, ব্যালটের নমুনা, গণনার নিয়ম, কেন্দ্র বন্ধ বা ভোট বাতিলের বিধান- এসব এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গণভোট অধ্যাদেশ জারি না হলে ইসির পক্ষ থেকে প্রকৃত প্রস্তুতির হিসাব করা যাচ্ছে না। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- দুই ভোটে অনিয়ম হলে কোন ভোট বাতিল হবে, গণভোটের আগে নাকি সংসদের ভোট আগে গণনা হবে, প্রচারের দায়িত্ব কে নেবেন, রাজনৈতিক দল নাকি ইসি- এসব বিষয়ে কমিশনের অবস্থান এখনো স্পষ্ট হয়নি।
গুজব ও অপতথ্য প্রতিরোধ
এবারের নির্বাচনে অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে গুজব, অপপ্রচার ও অপতথ্য। ফলে এসব প্রতিরোধে ব্যাপকভাবে ‘কাউন্টার ন্যারেটিভ’ প্রচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ইসিকে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, তথ্য অধিদপ্তর ও জেলা তথ্য অফিস। ইসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, গুজব, অপপ্রচার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার। এর মাধ্যমে নির্বাচনি পরিবেশ অস্থিতিশীল করে তোলা, সহিংসতা সৃষ্টি- এমনকি ভোট প্রশ্নবিদ্ধ করার মতো পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। এই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে কাউন্টার ন্যারেটিভ সচেতনতামূলক প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ খবরের কাগজকে বলেছেন, ‘কাউন্টার ন্যারেটিভ প্রচারের দুটি বিষয় রয়েছে। একটি হচ্ছে মানুষকে নির্বাচনমুখী করা এবং উৎসবমুখর পরিস্থিতি তৈরি করা। আরেকটি হচ্ছে একজন ভোটার কীভাবে ভোট দেবেন- সেই সচেতনতা তৈরি করা। নির্বাচনে সংসদ টিভি ব্যবহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে সংসদ চলছে না। তাই সংসদ টিভি নির্বাচনে ব্যবহার করা যাবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথাবার্তা চলছে। কোন পদ্ধতিতে কীভাবে একজন ভোটার জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট দেবেন, সেই প্রচারও চালাবে ইসি। এ জন্য বিটিভি, সংসদ টিভি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনসচেতনতামূলক প্রচার চালাবে ইসি। এর মাধ্যমে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে প্রবাসীদের উৎসাহিত করার কাজও করা হবে।’
প্রবাসী ভোট ও প্রশিক্ষণের চাপ
প্রবাসী ভোটারদের জন্য এবারই প্রথম চালু হচ্ছে পোস্টাল ভোট। প্রবাসীদের অ্যাপভিত্তিক নিবন্ধন ১৮ নভেম্বর থেকে চালু হচ্ছে। তাদের কাছে সংসদের পাশাপাশি গণভোটের ব্যালটসহ দুটি খাম পাঠাতে হবে। এতে ডাক খরচ, প্রস্তুতিমূলক সময়, যাচাই-বাছাই সবই বাড়বে।
কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য দুটি সেশন বাড়িয়ে দিতে হবে। ভোট গ্রহণসংক্রান্ত সাধারণ প্রশিক্ষণের সঙ্গে গণভোটসংক্রান্ত প্রশিক্ষণের নতুন সেশন যুক্ত হবে। প্রশিক্ষণে থাকবে গণভোটের ব্যালট ইস্যু, গণনা আলাদা করা, রংভেদে ব্যালট শনাক্তকরণ, ফলাফল পাঠানোর ধাপ নির্দেশনা। সাবেক কর্মকর্তাদের ভাষায়, ‘চ্যালেঞ্জ নয়, কিন্তু কাজ অনেকটা দ্বিগুণ।
ইসি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে গণভোট নিয়ে কাজ শুরু করেনি, কারণ আইন-বিধি হাতে নেই। তবে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতিতে ইসির ৯০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন। সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, ‘প্রস্তুতির বড় অংশই সংসদ নির্বাচনের জন্য। গণভোট যোগ আমাদের সমন্বয় করতে হবে। কিন্তু এটা সামলানো সম্ভব, যদি রাজনৈতিক দলগুলো সহযোগিতা করে। এ পর্যায়ে সরকারের নির্দেশ পেলে ও গণভোটের আইন-বিধি জারি হলে ইসির পূর্ণমাত্রার প্রস্তুতি শুরু হবে। দেশের নির্বাচনি ইতিহাসে এটি হবে সবচেয়ে বড় এক দিনের ভোট আয়োজন। কাজেই পুরো দেশবাসীর নজর এখন নির্বাচন কমিশনের দিকে।’