দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর পূর্ণ করেছে এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই সঙ্গে গণভোট আয়োজনের চ্যালেঞ্জিং দায়িত্ব সামনে রেখে কমিশনের ৩৬৫ দিনের এই যাত্রাপথ কেমন ছিল, সামনে তারা কেমন করবে- সেসব দিকেই এখন দৃষ্টি সবার। বছরব্যাপী নির্বাচন প্রস্তুতির শেষ ধাপে গত ১৯ নভেম্বর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ শেষ করেছে ইসি। এখন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত কমিশন।
গত বছরের ২১ নভেম্বর গঠিত হয় সিইসি নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের এই কমিশন। বিগত এক বছরে ইসি ভোটার তালিকা হালনাগাদ, সংসদীয় আসনের সীমানা চূড়ান্তকরণ, আচরণবিধি প্রণয়ন, পোস্টাল ভোটিং চালুসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ভোট এবং ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে ইসির তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতিও প্রায় শেষ। তবে গণভোটের চূড়ান্ত কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণে এখনো সরকারের নির্দেশ ও গণভোট আইন/অধ্যাদেশের অপেক্ষায় আছে সংস্থাটি।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তিগত ও লজিস্টিক প্রস্তুতিতে কমিশন যথেষ্ট সক্রিয়; কিন্তু গণভোট যুক্ত হয়ে যাওয়ায় তাদের স্বাভাবিক প্রস্তুতির কাঠামো এখন প্রায় দ্বিগুণ চাপের মুখে পড়েছে।
এক দিনে দুই ভোট, সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে এবারই প্রথম একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট আয়োজন করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এমন কঠিন বাস্তবতায় দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর পূর্ণ করলেও সামনে যে কাজ তার জটিলতা ও পরিধি এই কমিশনের আগের সব অভিজ্ঞতাকে ছাড়িয়ে গেছে। কারণ একই দিনে দুই ধরনের ভোট মানে দ্বিগুণ ব্যালট, দ্বিগুণ প্রশাসনিক প্রস্তুতি, দ্বিগুণ পর্যবেক্ষণ; কিন্তু সময় ও সম্পদের চাপ হবে এক দিনের। সেই চাপ কীভাবে সামাল দেবে ইসি, এটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সামনে অচেনা পরীক্ষাক্ষেত্র
এই কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর গত এক বছরে তিনবার ভোটার তালিকা হালনাগাদ করেছে। এ ছাড়া ভোটকেন্দ্রের তালিকা যাচাই, সীমানা পুনর্নির্ধারণ, আচরণবিধি সংশোধন এবং পোস্টাল ভোটব্যবস্থা সম্প্রসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সম্পন্ন করেছে। এসব কাজ সাধারণত এক নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্য যথেষ্ট ধরা হয়। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। গণভোট অনুষ্ঠানের অধ্যাদেশ এখনো জারি হয়নি। অথচ ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন এবং গণভোট, দুটি একসঙ্গে করার পরিকল্পনা রয়েছে।
গণভোট ঘিরে নতুন সমীকরণ
সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটের জন্য আলাদা রঙের ব্যালটপত্র, আলাদা গণনা শিট, আলাদা সিল, আলাদা ব্যালট বাক্স রাখতে হবে। একজন ভোটার যখন কেন্দ্রে যাবেন, তাকে দুটি লাইনে দাঁড়াতে হবে বা একই বুথে দুটি ব্যালট দিতে হবে- এই প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রিসাইডিং অফিসারদের আলাদা নির্দেশনা ও প্রশিক্ষণ দরকার।
অধ্যাদেশ জারি না হওয়ায় এখনো গণভোটের ব্যালট নকশা, প্রশ্নের ফরম্যাট, গণনা ম্যানুয়াল- এসব কিছুই চূড়ান্ত করা যায়নি। ফলে চালু কাজের পাশাপাশি ‘অতিরিক্ত প্রস্তুতি’ যুক্ত হয়েছে; আর সেটি কোনো রুটিন ইভেন্টের মতো নয়।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার খবরের কাগজকে বলেছেন, ‘একই দিনে সংসদ নির্বাচন আর গণভোট- এটি শুধু দুটি ভোট নয়; এটি দুটি প্রশাসনিক কাঠামো পাশাপাশি দাঁড় করানোর মতো ব্যাপার। সব দিক বিবেচনা করেই আমরা প্রস্ততি নিচ্ছি। জনগণকে দেওয়া ওয়াদা পূরণে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করাই আমাদের লক্ষ্য।’
নির্বাচনি সংলাপে কী পেল কমিশন?
গত ১৩ থেকে ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত চলা সংলাপে ইসি জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের প্রস্তুতি তুলে ধরলেও সব রাজনৈতিক দল প্রক্রিয়াটিকে আস্থার জায়গা হিসেবে দেখেনি। ৫৫ দলের মধ্যে জাতীয় পার্টিসহ ৭টি দলকে সংলাপে না ডাকা কমিশনের অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আরও বড় প্রশ্ন- সংলাপ শেষ হওয়ার পরও গণভোটের কাঠামো কী হবে, তা দলগুলো জানে না। ফলে জাতীয় নির্বাচনের মতোই গণভোটসংক্রান্ত বিধিবিধান নিয়েও বিভ্রান্তি রয়ে গেছে।
ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ জেসমিন টুলী খবরের কাগজকে বলেছন, ‘দুটি বড় নির্বাচন এক দিনে, এটি যে শুধুই কারিগরি চ্যালেঞ্জ তা নয়; রাজনৈতিক আস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়বে। দলগুলো যে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করেছে, সেই নির্বাচনই দুই ভাগে বিভক্ত, এটি আগে কখনো হয়নি। এমন পরিস্থিতি দলগুলোর জন্যও নতুন, চ্যালেঞ্জিং।’
গণভোট যুক্ত হওয়ায় দ্বিধা আরও বেড়েছে
আচরণবিধি সংশোধন এবং আরপিও পরিবর্তন- উভয়ই নভেম্বরের প্রথমার্ধে চূড়ান্ত করা হয়েছে। দলগুলো অভিযোগ করছে, গণভোট যুক্ত করার মতো বড় কাঠামোগত পরিবর্তন সামনে রেখে এ ধরনের বিধি সংশোধন খুব কম সময়ে দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে সম্প্রতি ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেছেন, ‘সব মতামত বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।’ কিন্তু গণভোটের নিয়ম, ব্যালট ডিজাইন, গণনার পদ্ধতি- এসব বিষয়ে এখনো কোনো বিশদ ঘোষণা নেই।’
নজরদারির জন্য কি আলাদা পর্যবেক্ষক নিয়োগ হবে? নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কি আলাদা নির্দেশ থাকবে? গণভোটসংক্রান্ত প্রচারের আলাদা বিধি কি থাকবে? এসব প্রশ্ন এখনো ঝুলে আছে।
দুই ভোটের ফল এক দিনে ঘোষণা কি সম্ভব?
অন্যদিকে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচনের ফল প্রকাশেও সময় লাগে। এখন প্রশ্ন- এক রাতে কি দুই ফল একসঙ্গে ঘোষণা সম্ভব?
যদি সম্ভব না হয়, তাহলে কোনটি আগে হবে?
এই ক্রমবিন্যাসের ওপরও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হতে পারে। সিইসি নাসির উদ্দিন বলেছেন, ‘অধ্যাদেশ প্রকাশ হলেই আমরা দুই নির্বাচন আলাদা লজিস্টিকে কীভাবে সামলাব, তা ঘোষণা করব।’ কিন্তু সময় এখন খুবই কম। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই তফসিল; ফেব্রুয়ারিতে ভোট।
নির্বাচন ব্যবস্থাপনাই ইসির আসল পরীক্ষা
সিইসি নাসির উদ্দিন সম্প্রতি বলেছেন, ‘আমরা রেফারি হব, রাজনীতিদিদরা হলেন আসল খেলোয়াড়। আমরা সব গর্ত বন্ধ করব।’ কিন্তু এবারের নির্বাচন-গণভোট মডেল, রেফারির কাজকে আরও কঠিন করে দিয়েছে।
কারণ দুটি ভোট, দুটি ব্যালট, দুটি গণনা, দুটি আইনি কাঠামো এবং একই দিনে ফল প্রকাশ- এই সমন্বয় সফল হলে সেটিই হবে এই কমিশনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। অন্যদিকে সামান্য সমন্বয়হীনতাও জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট- দুটিকেই বিতর্কে ফেলতে পারে।
নাসির কমিশনের প্রথম বছর ছিল কাঠামোগত প্রস্তুতির। কিন্তু দ্বিতীয় বছর হবে বাস্তব প্রয়োগের, আর সেই প্রয়োগ এবার দ্বিগুণ জটিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন- এই চ্যালেঞ্জই নির্ধারণ করবে কমিশনের সক্ষমতা, আস্থা, গ্রহণযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভবিষ্যৎ পথচলা।