অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম হয়েছে। সমালোচনার কারণে বাতিলও হয়েছে সরকারের বেশ কিছু সিদ্ধান্ত। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের পদোন্নতি, পদায়ন নিয়ে সমালোচনার পাশাপাশি বঞ্চিত কর্মকর্তাদের ক্ষোভ এখন প্রশাসনের নিয়মিত চর্চায় পরিণত হয়েছে। একাধিক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে এসব অভিযোগ করেছেন। তাদের ক্ষোভের সঙ্গে সর্বশেষ গত সপ্তাহে যোগ হয়েছে যুগ্ম সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির ঘটনা।
গণ-আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। তিন দিন পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেন। বিগত সরকারের সময়ে প্রশাসনকে দলীয়করণ করার দীর্ঘ অভিযোগ ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে তাই প্রশাসন সংস্কার কার্যক্রম শুরু করে। এ উদ্যোগের প্রথমেই প্রশাসনের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়। এ সময় বাধ্যতামূলক অবসর, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে পদায়ন, শাস্তিমূলক বদলি, সুবিধাভোগী কর্মকর্তার অভিযোগে পদোন্নতি বঞ্চিত করাসহ অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রায় সব ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে এই সরকার।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বঞ্চিত কর্মকর্তারা এসব সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হলেও পদোন্নতি, পদায়ন ও বদলির অনেক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রশাসনের প্রায় সর্বত্রই প্রকাশ্যে আলোচনা, সমালোচনা শুরু হয়, যা এখনো অব্যাহত আছে।
এদিকে আজ থেকে জাতীয় নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ১২ দিন। প্রশাসনের ২০ ব্যাচের কর্মকর্তাদের যুগ্ম সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে ২৭ জানুয়ারি। সরকারের এ সিদ্ধান্তে আবারও আলোচনা, সমালোচনা ও বিতর্কের শুরু হয়েছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘ অবসরে থাকা কর্মকর্তাদের প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগে নিয়োগ দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে নানা মহলে সমালোচিত হয়েছে। গত মঙ্গলবার যুগ্ম সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পদে ১১৮ কর্মকর্তাকে পদোন্নতির এই প্রক্রিয়ায় গত সরকার আমলের সুবিধাভোগী কর্মকর্তারা পদোন্নতি পেয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। নির্বাচনের কয়েক দিন আগে শেষ সময়ে পদোন্নতি দেওয়ার এই সিদ্ধান্তে সরকারের নৈতিকতা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। শেষ সময়ে এসেও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সরকারের বিরুদ্ধে অপরিপক্বতার অভিযোগ তুলেছেন অনেকেই।
এ বিষয়ে সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার খবরের কাগজকে বলেন, ‘পদোন্নতির বিষয়টি সরকারের রুটিন ওয়ার্ক। এর সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে পদোন্নতির প্রক্রিয়া যদি ন্যায়সঙ্গতভাবে হয়ে থাকে তাতে অসুবিধা নাই। কিন্তু এই পদোন্নতিতে যদি কোনো পক্ষপাত হয়ে থাকে সেটা ঠিক না।’
কর্মকর্তারা অভিযোগ করে বলছেন, নির্বাচনের আর মাত্র দুই সপ্তাহ বাকি। তারা বলেন, ‘স্বল্প এই সময়ের মধ্যে এই পদোন্নতি প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ চেষ্টার অংশ হতে পারে, এমন শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন সরকার অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের প্রশাসনের শীর্ষ পদে নিয়োগ দিয়ে সমালোচিত হয়েছে। ক্ষমতায় এসেই তারা জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ নিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলে। ২০ জানুয়ারি আট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) বদলি করা হয়। তার ঠিক দুই দিন পর আবার তা বাতিল করায় সমালোচনার ঝড় ওঠে।’
৮ ইউএনওর পদায়ন ও প্রত্যাহার সম্পর্কে সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, ‘সরকার বিভিন্ন সময় বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে আবার তা বাতিল বা প্রত্যাহার করেছে। এটা তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দোদুল্যমানতাকে প্রকাশ করেছে। প্রথম থেকেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারের দ্বিধাগ্রস্ত মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। এর ফলে প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই সরকারের এসব সিদ্ধান্তের কারণে বিভ্রান্ত হয়েছেন।’
গত ২০ জানুয়ারি ভোলার চরফ্যাশন, চুয়াডাঙ্গার জীবননগর, ফরিদপুরের নগরকান্দা, পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া, বগুড়ার ধুনট, হবিগঞ্জের বাহুবল, নেত্রকোনার কলমাকান্দা ও বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার ইউএনওদের বদলি করে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আদেশে বলা হয়েছিল, নির্বাচন কমিশনের সম্মতি নিয়ে এই কর্মকর্তাদের বদলি করা হয়েছে।
আবার ঠিক দুদিন পর গত ২২ জানুয়ারি আরেকটি প্রজ্ঞাপনে ২০ জানুয়ারির বদলির আদেশ বাতিল করা হয়। তবে বাতিলের প্রজ্ঞাপনে ইসির মতামত গ্রহণের কোনো কথা উল্লেখ করা হয়নি। তবে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনা এমন যে, একটি রাজনৈতিক দলের আপত্তির পর নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় প্রথমে বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও আরেকটি রাজনৈতিক দল এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলে সরকার শেষ পর্যন্ত আদেশ বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক এক সচিব বলেন, ‘একবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আবার তা বাতিল। এ ধরনের আচরণ প্রশাসনিক বিষয়ে সরকারের অভিজ্ঞতাকে চ্যালেঞ্জ করে। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়, সরকারের সক্ষমতা নিয়ে। তবে ভুল সংশোধন করা হলে তা ইতিবাচকভাবে দেখা উচিত বলেও মনে করেন সরকারের সাবেক এই সচিব।’