জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদে দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বড় ধরনের ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এবার ভোটে অংশ নেওয়া ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টি দলের নেই কোনো নারী প্রার্থী। অথচ জুলাই জাতীয় সনদে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর অঙ্গীকার ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর। জুলাই সনদে স্পষ্টভাবে বলা আছে– পরবর্তী সংসদ নির্বাচন থেকে প্রতিটি রাজনৈতিক দল অন্তত ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেবে। উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ আসনে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং ধাপে ধাপে সংসদে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্বের পথে এগিয়ে যাওয়া। নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সামাজিক বাধা এখনো এ ক্ষেত্রে বড় বাধা। এ বিষয়ে অনেক দলেরই আন্তরিকতা নেই। আর যেসব দলে নারীরা রাজনীতিতেই নেই, তারা ৫% নারী প্রার্থীর অঙ্গীকার পূরণ করবে কী করে!
কোন দলে নারী প্রার্থী কতজন?
নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে নারী প্রার্থী মাত্র ৭৮ জন, যা মোট প্রার্থীর ৩.৯৩ শতাংশ। নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ৩০টি দল একটিও নারী প্রার্থী দেয়নি। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি দল জুলাই সনদের ৫ শতাংশ পূরণ তো দূরের কথা, ন্যূনতম নারী প্রতিনিধিত্বের উদ্যোগও নেয়নি।
দলভিত্তিক প্রার্থী বিশ্লেষণে দেখা যায়– দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপিতে এবার নারী প্রার্থী সবচেয়ে বেশি, কিন্তু সেটা মাত্র ১০ জন। এরপর জাতীয় পার্টিতে (জেপি) ৬ জন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলে (জেএসডি) ৬ জন, গণসংহতি আন্দোলনে ৫ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টিতে ৩ জন এবং গণঅধিকার পরিষদ থেকে ৩ জন নারী প্রার্থী দলীয় মনোনয়ন পেয়ে সরাসরি ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
অন্যদিকে বেশির ভাগ ছোট দল এক বা দুজন নারী প্রার্থী দিলেও বড় অংশ কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি। স্বতন্ত্র হিসেবে নারী প্রার্থী হয়েছেন ১৭ জন। অর্থাৎ মোট নারী প্রার্থীর মধ্যে ৬১ জন দল মনোনীত এবং ১৭ জন স্বতন্ত্র। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নিজ উদ্যোগে নির্বাচনে লড়ছেন।
নিজ যোগ্যতা নাকি উত্তরাধিকার
নারী প্রার্থীদের সামাজিক ও রাজনৈতিক পটভূমি বিশ্লেষণে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। দল মনোনীত নারী প্রার্থীদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ উত্তরাধিকারসূত্রে রাজনীতিতে এসেছেন– স্বামী, বাবা বা নিকট আত্মীয় আগে সংসদ সদস্য, মন্ত্রী বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। অর্থাৎ আনুমানিক ৩০ শতাংশ নারী প্রার্থী পারিবারিক বা সম্পর্কভিত্তিক প্রভাবের কারণে মনোনয়ন পেয়েছেন। এতে করে দলীয় রাজনীতিতে নিজ যোগ্যতায় উঠে আসা নারীদের সুযোগ আরও সংকুচিত হয়েছে।
আগের আইন, বর্তমান আইন ও জুলাই সনদ
বাংলাদেশের সংসদে বর্তমানে ৩০০টি সাধারণ আসনের বাইরে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন রয়েছে। এসব আসনে নারীরা সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না; সংসদে দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের অনুপাতে আরপিও অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই ব্যবস্থা সংবিধানের ৬৫(৩) অনুচ্ছেদ ও জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪-এর আওতায় পরিচালিত। আগের আইন ও বর্তমান আইন– উভয় ক্ষেত্রেই এই কাঠামো অপরিবর্তিত রয়েছে।
জুলাই সনদ এখানেই পরিবর্তনের প্রস্তাব এনেছিল। সনদে বলা হয়েছিল, সংরক্ষিত আসনের পাশাপাশি সাধারণ আসনে নারীর সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে হবে, যার প্রথম ধাপ হিসেবে প্রতিটি দলকে ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী দিতে হবে। কিন্তু এই বিষয়টি বাধ্যতামূলক আইনি কাঠামোয় যুক্ত না হওয়ায় দলগুলো বাস্তবে তা অনুসরণ করেনি।
দলগুলোর অঙ্গীকার ও বাস্তবতা
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নির্বাচনের আগে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন খুব সীমিত। কিছু বাম ও ছোট দল তুলনামূলক বেশি নারী প্রার্থী দিলেও বড় দলগুলোর অধিকাংশই ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেনি। শুধু তাই নয়; জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ৩০টি রাজনৈতিক দলের কোনো নারী প্রার্থীই নেই।
এ বিষয়ে ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন বিশ্লেষক জেসমিন টুলী খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশে নির্বাচন ব্যবস্থা নারীর প্রতি অনুকূল নয়। আর্থিক সামর্থ্য, পেশিশক্তি ও দলীয় কাঠামো– সবকিছুই পুরুষকেন্দ্রিক। শুধু সনদে অঙ্গীকার লিখলেই নারীর অংশগ্রহণ বাড়ে না, এর জন্য কাঠামোগত সংস্কার দরকার। দলগুলো এ বিষয়ে আন্তরিক নয়। আর যেসব দলে নারীই নেই, তারা ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী দেওয়ার অঙ্গীকার পূরণ করবে কী করে?’
ইসির পর্যবেক্ষণ
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার মনে করেন, নারীর প্রার্থী সংখ্যা কম হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সামাজিক বাধাই বড় কারণ। তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদে দেওয়া ৫% নারী প্রার্থী দেওয়ার অঙ্গীকার রাজনৈতিক দলগুলোর বড় অর্জন হিসেবে থাকলেও, অধিকাংশ দল তা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে– বিশেষত ইসলামী ও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর অনেকেই কোনো নারীকে মনোনয়ন দেননি। এর কারণ হলো তারা পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বের হতে পারছে না, আর এটা রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভবও নয়। নির্বাচনে নারীদের ভোটে অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে নির্বাচনি পরিবেশকে নারীবান্ধব এবং দলগুলোর মনোভাবের ইতিবাচক পরিবর্তন জরুরি।’
বিগত ১২ সংসদে নারীর সরাসরি অংশগ্রহণ
বাংলাদেশে নারীরা প্রথমবার সরাসরি সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন ১৯৭৯ সালে। এরপর ১২টি সংসদ নির্বাচনেও সরাসরি নির্বাচিত নারীর সংখ্যা কখনোই উল্লেখযোগ্য হারে বাড়েনি। দ্বাদশ সংসদে সাধারণ আসন থেকে সরাসরি নির্বাচিত নারী ছিলেন প্রায় ২০ জন। সংরক্ষিত ৫০ আসন যোগ হলেও মোট সংসদ সদস্যের তুলনায় নারীর অংশগ্রহণ এখনো সীমিত।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে– জুলাই সনদের নারী প্রার্থী সংক্রান্ত অঙ্গীকার দলগুলো পূরণ করেনি। সংরক্ষিত আসনের ওপর নির্ভরতা, সংসদে নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে দলীয় অনীহা এখনো স্পষ্ট। এ ছাড়া উত্তরাধিকারভিত্তিক মনোনয়ন ও কাঠামোগত বৈষম্যের কারণে নারীর সরাসরি রাজনৈতিক অংশগ্রহণ আজও সীমাবদ্ধ। জুলাই সনদ একটি সম্ভাবনার দরজা খুলেছিল, কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকায় তার সুফল মেলেনি। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রশ্নে এখনো বড় সংস্কারের অপেক্ষার বিকল্প নেই।