চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জন্য বার বার আবেদন জানালেও সরকার আমলে নেয়নি । এমন প্রেক্ষাপটে গত ৩১ জানুয়ারি থেকে দাবি আদায়ে কঠোর আন্দোলনে নেমেছেন বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারিরা। তাদের কর্মবিরতিতে এই ছয় দিন দেশের সর্ববৃহৎ এই বন্দর এবং কাস্টমস হাউস অচল ছিল।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) সকালে এ বিষয়ে আলোচনা করতে নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন চট্টগ্রামে এলেও মেলেনি স্থায়ী সমাধান। তার সঙ্গে আলোচনার পর দুই দিনের (শুক্র, শনিবার) জন্য কর্মবিরতি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে বন্দরের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সরকার থেকে ফলপ্রসু সিদ্ধান্ত না এলে রবিবার থেকে ফের কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন শ্রমিক নেতারা। বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রমে এভাবে বাধা আসায় উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা।
বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন থেকে জানিয়েছে ৩১ জানুয়ারি থেকে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ছয় দিনে ৫৪ হাজার কনটেইনার বন্দরে আটকা পড়ে। জাহাজগুলো জেটিতে ভিড়তে না পারায় বন্দরের বহির্নোঙরে কমবেশি ১০২টি জাহাজ পণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। সময়মতো পণ্য খালাস করতে না পারায় আমদানিকারকদের একটি জাহাজের জন্য আকার ভেদে প্রতিদিন ১৬ লাখ থেকে ১৮ লাখ টাকা মাশুল দিতে হয়। ছয় দিনের এই কর্মবিরতিতে আমদানিকারকদের অতিরিক্ত জরিমানা দিতে হয়েছে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো জানায়, শুধু তাই না, গত ছয় দিনে বন্দর থেকে সময়মতো কাঁচামাল খালাস করতে না পারায় দেশের ৫০টির বেশি শিল্পকারখানায় আংশিক উৎপাদন সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে। ২০টির মতো কারখানার উৎপাদন দুই থেকে তিন দিন ধরে বন্ধ। অন্যদিকে সময়মতো পণ্য রপ্তানি করতে না পারায় তৈরি পোশাক খাতসহ দুই শতাধিক কারখানা বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে চাপে পড়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্র জানায়, গত বছর চট্টগ্রাম বন্দর ৫ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা আয় করেছে। সে হিসাবে, প্রতিদিন চট্টগ্রাম বন্দর গড়ে ১৫ কোটি টাকা আয় করে। গত ছয় দিনের কর্মবিরতিতে সরকার ৯০ কোটি টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে। অপরদিকে বন্দরের অচলাবস্থার প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমসে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস পণ্যের শুল্কায়নের মাধ্যমে বছরে গড়ে ৭০ হাজার কোটি টাকা আয় করে। সে হিসেবে, দিনে সংস্থাটি ১৯২ কোটি টাকা আয় করে। গত ছয় দিনে কাস্টমস ১ হাজার ১৫১ কোটি টাকা আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে। সব মিলিয়ে এই ছয় দিনে বন্দর ও কাস্টমসের রাজস্ব ক্ষতি ১ হাজার ২৪১ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ নীটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম খবরের কাগজকে বলেন, ‘বন্দরে এই আন্দোলনের কারণে ব্যবসায়ীরা বড় লোকসানে পড়েছে। সারা বিশ্বের কাছে এই দেশের অস্থিরতার চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। এরই মধ্যে অনেক কারখানার কাঁচামাল বন্দর থেকে খালাস করতে না পারায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। অনেক পণ্য সময়মতো রপ্তানি করতে না পারায় বিদেশি ক্রেতারা আমাদের ভবিষ্যতে নতুন করে পণ্যের ক্রয়াদেশ দেবেন না বলেও জানিয়েছেন।’ এই আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া দেশের ব্যবসায়ীদের কঠিন হবে।
দ্রুত চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক করার আহ্বান জানিয়ে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) এর সভাপতি ও ইফাদ গ্রুপের ভাইস-চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, দেশের অর্থনীতির বৃহত্তর স্বার্থে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বাভাবিক করা প্রয়োজন। চট্টগ্রাম বন্দরকে বাংলাদেশের বাণিজ্যে ও বিনিয়োগের লাইফলাইন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ আমদানি ও রপ্তানির পণ্য এই বন্দরের মাধ্যমে খালাস হয়। আমদানি ও রপ্তানির জন্য এই বন্দর থেকে গড়ে প্রতিমাসে প্রায় ২.৬ লাখ টিইইউ এবং প্রতিদিন গড়ে ৯০০০ টিইইউ খালাস হয়, যা গত বুধবার থেকে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
বন্দরে এসে বাধার মুখে নৌপরিবহন উপদেষ্টা
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির সরকারি সিদ্ধান্তে শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রতিবাদে উত্তাল চট্টগ্রাম বন্দর। বিষয়টি নিয়ে গতকাল সকালে শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে আলোচনা করতে চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে আসেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন। সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটের দিকে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রশাসনিক ভবনের দিকে যাওয়ার সময় ৪ নম্বর গেটের বাইরে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ‘গো ব্যাক গো ব্যাক- ডিপি ওয়ার্ল্ড, ডিপি ওয়ার্ল্ড’, ‘দালাল চেয়ারম্যানকে আসতে দেওয়া যাবে না’সহ নানা স্লোগান দিয়ে উপদেষ্টার গাড়িবহর রাস্তায় আটকে দেন। পরে গাড়ি থেকে নামেন উপদেষ্টা।
শ্রমিকরা তখন উপদেষ্টাকে ঘিরে ধরে বিদেশি কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ড এর সঙ্গে সরকারকে চুক্তি না করতে বলেন এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এস এম মুনিরুজ্জামানসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় উপদেষ্টা তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসে সমস্যাগুলো আলোচনা করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, গত এক বছর ছয় মাস ধরে আমি দেশের জন্য কাজ করছি। পাবর্ত্য চট্টগ্রামে তিন বছর থাকার সময় আমি দেশের জন্য কোনো ক্ষতি করিনি। এ সময় চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহিম খোকন উপদেষ্টাকে বলেন, স্যার, আমরা দেশবিরোধী নই। আমি গত ৩২ বছর ধরে চট্টগ্রাম বন্দরে কাজ করছি। আমি আশা করি, শুধু ডিপি ওয়ার্ল্ড নয়, কোনো মাফিয়াই এখানে থাকতে পারবে না। বন্দর চেয়ারম্যান গত এক বছর ছয় মাসে আন্দোলনকারীদের অযৌক্তিকভাবে শাস্তি দিয়েছেন। তিনি উপদেষ্টার কাছে চেয়ারম্যানের বরখাস্তের দাবি জানান।
এ সময় উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন তাদেরকে রাস্তার ওপরে দাঁড়িয়ে না থেকে ভেতরে আলোচনা করার প্রস্তাব দেন। তখন শ্রমিক নেতারা দাবি করেন, বন্দর চেয়ারম্যান বৈঠকে উপস্থিত থাকতে পারবেন না। উপদেষ্টা আশ্বাস দেন– বৈঠকে বন্দর চেয়ারম্যান থাকবেন না। তিনি শুধু শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলবেন। এর পরই প্রতিবাদকারীরা তাকে যেতে দেন।
সে সময় বিক্ষোভকারীরা বলেন, লালদিয়া টার্মিনাল এবং ঢাকার পানগাঁও টার্মিনালের চুক্তি সরকার করে ফেলেছে। এসব চুক্তির বিষয়ে সকল তথ্য গোপন রাখা হয়েছে। এখন এনসিটি চুক্তি করতে তোড়জোড় চলছে। সামনে নির্বাচন। দায়িত্ব ছেড়ে যাওয়ার আগেই সরকার চুক্তিটি করতে চাইছে। এনসিটির মতো একটি লাভজনক টার্মিনাল বিদেশিদের হাতে তুলে দিতে এত তড়িঘড়ির পেছনে কী রহস্য থাকতে পারে? সরকার গোপনে চুক্তি করতে চাইছে।
বেলা ১২টার দিকে চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে নৌপরিবহন উপদেষ্টা বন্দর ব্যবহারকারী বিভিন্ন সংগঠনের নেতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তবে ওই বৈঠকে আন্দোলনকারী শ্রমিক নেতাদের রাখা হয়নি। পরে উপদেষ্টা পতেঙ্গার বোট ক্লাবে শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তাব দিলে তা প্রত্যাখ্যান করেন আন্দোলনকারীরা। তাদের বক্তব্য ছিল, বন্দর সংক্রান্ত বিষয়ে বৈঠক বন্দর ভবনেই হতে হবে। শেষ পর্যন্ত বিকেলে বন্দর ভবনেই বৈঠকের আয়োজন করা হয়।
কর্মবিরতি দুই দিনের জন্য স্থগিত
নৌপরিবহন উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বন্দর ভবন প্রাঙ্গণে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম ঐক্য পরিষদের দুই সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির ও ইব্রাহিম খোকন জানান, বন্দরের এনসিটি পরিচালনার চুক্তি থেকে সরকার সরে না এলে আগামী রবিবার থেকে আবারও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
সিদ্ধান্তে অনড় শ্রমিক-কর্মচারীরা
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম ঐক্য পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বলেন, উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে আমরা মোট চারটি দাবি উত্থাপন করেছি। আমাদের প্রধান দাবি হলো এনসিটি চুক্তি বাতিল করা। উপদেষ্টা আমাদের জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তিনি প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলে আগামী দুই দিনের মধ্যে আমাদের সিদ্ধান্ত জানাবেন। অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে– আন্দোলনরত কর্মচারীদের বদলি আদেশ প্রত্যাহার করা, আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে কোনো আইনি পদক্ষেপ না নেওয়া এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের বর্তমান চেয়ারম্যানের অপসারণ। এর মধ্যে উপদেষ্টা দুটি দাবি মেনে নিয়েছেন। তবে বন্দর চেয়ারম্যানের অপসারণের বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করবেন বলে উপদেষ্টা আমাদের জানিয়েছেন।
আরেক সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বলেন, ‘উপদেষ্টার আশ্বাসের ভিত্তিতে আমরা দুই দিনের জন্য কর্মবিরতি স্থগিত করেছি। উপদেষ্টা আমাদের কাছে দুই দিন সময় চেয়েছেন। এর মধ্যে সরকার যদি এনসিটি চুক্তি থেকে সরে না আসে, তবে আমরা রবিবার থেকে পুনরায় কর্মবিরতিতে যাব।’
যা বললেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা
শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে বৈঠক থেকে বেরিয়ে নৌ-উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেন, রমজানের আর বেশি দিন নেই। এ সময় বন্দর বন্ধ করে এ ধরনের আন্দোলন খুবই অমানবিক। বন্দর বন্ধ রাখার এখতিয়ার কারও নেই। বাধা দিলে সরকার হার্ডলাইনে যেতে পারে। কাল (শুক্রবার) সকাল থেকে বন্দর সচল না হলে সরকার হয়তো ভিন্ন চিন্তা করবে।
এনসিটি চুক্তির বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, চুক্তি বোধ হয় ঠেকানো যাবে না। তবে দেশের ক্ষতি করে কোনো চুক্তি হবে না। ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে নেগোসিয়েশন চূড়ান্ত হয়েছে কিনা, জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এখনো চূড়ান্ত হয়নি।