কাজ শেষ হওয়ার দুই বছর পর প্রায় ২০০ কোটি টাকার সরকারি প্রকল্পের সময় বাড়ানো হয়েছে ভুয়া স্মারক নম্বর ও স্বাক্ষর জালিয়াতি করে। সরকারি কাজে জালিয়াতির এই ভয়ংকর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) এক উপসহকারী প্রকৌশলী।
দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে সরকারি নথি জাল, ভুয়া স্মারক ব্যবহার, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার স্বাক্ষর জালিয়াতি এবং ব্যক্তিগত ই-মেইল ব্যবহার করে ব্যাংকের সঙ্গে দাপ্তরিক যোগাযোগের মতো গুরুতর অভিযোগে সওজের এক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্ত উপসহকারী প্রকৌশলী মো. জাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির সুপারিশ করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে সওজের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসানকে একাধিকবার ফোন দিলেও রিসিভ না করায় মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে সওজের ম্যানেজমেন্ট সার্ভিসেস উইংয়ের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ এস এম ইলিয়াস শাহ্ খবরের কাগজকে বলেন, ‘এ বিষয়ে কাজ (প্রক্রিয়া) চলছে। বিষয়টি আমরা দেখব।’
জানা গেছে, সওজের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. জাহিদুল ইসলাম পটুয়াখালী সড়ক সার্কেলের দপ্তরে কর্মরত থাকা অবস্থায় পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে ভুয়া স্মারক তৈরি, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার জাল স্বাক্ষর ও ব্যক্তিগত ই-মেইল ব্যবহার করে ব্যাংকের সঙ্গে দাপ্তরিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে বলে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করেন। এ ঘটনায় অভিযুক্ত প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অসদাচরণের অভিযোগে বিভাগীয় মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে।
অভিযুক্ত কর্মকর্তা মো. জাহিদুল ইসলাম বর্তমানে সওজ সড়ক বিভাগ, পিরোজপুরে সহকারী প্রকৌশলীর (চলতি দায়িত্ব) পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি এর আগে পটুয়াখালী সড়ক সার্কেলে উপসহকারী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন।
সওজের দাপ্তরিক নথি অনুযায়ী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন Payra 1320 MW Thermal Power Plant-এর সংযোগ সড়ক ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের প্রায় ১৬৬ কোটি ৪৬ লাখ ৭১ হাজার ৩০০ টাকার কাজ ২০২২ সালের জুনে শেষ হয়। একই বছরের ৩১ অক্টোবর Completion Certificate ইস্যু করা হয়। অর্থাৎ প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়।
কিন্তু এই বাস্তবতার বিপরীতে ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালী সড়ক সার্কেল থেকে ভুয়া স্মারক নম্বর ব্যবহার করে প্রকল্পের কাজের সময়সীমা ৫৪৮ দিন বাড়ানোর প্রস্তাব দেখানো হয়। তাতে দাবি করা হয়, প্রধান প্রকৌশলী এই সময় বাড়ানোর অনুমোদন দিয়েছেন, যা পরে অসত্য ও জালিয়াতির মাধ্যমে করা হয়েছে বলে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।
ওই ভুয়া চিঠিতে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর স্বাক্ষর জাল করা হয় এবং দাপ্তরিক ই-মেইলের বদলে ব্যবহার করা হয় অভিযুক্ত কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ইয়াহু ই-মেইল। ফলে ব্যাংকের সঙ্গে প্রকৃত অর্থে কোনো দাপ্তরিক যোগাযোগ হয়নি। পরবর্তী সময়ে ওয়ান ব্যাংক (ONE Bank) কারওয়ান বাজার শাখা থেকে ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর চিঠিটি যাচাইয়ের জন্য পটুয়াখালী সড়ক সার্কেলে পাঠানো হয়। অভিযোগ অনুযায়ী সেই ভেরিফিকেশন করে দেন অভিযুক্ত মো. জাহিদুল ইসলাম। কিন্তু ভেরিফিকেশনে সন্তুষ্ট না হয়ে পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ওয়ান ব্যাংকের দুই কর্মকর্তা সরাসরি পটুয়াখালী সড়ক বিভাগে এসে তদন্ত করেন। একই সঙ্গে আরও দুটি চিঠির বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করতে চাওয়া হলে জাল-জালিয়াতির ঘটনা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আসে।
এ ঘটনায় সওজের নিজস্ব তদন্ত প্রতিবেদনে অসত্য তথ্য প্রেরণ, স্বাক্ষর জালিয়াতি ও দাপ্তরিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের মাধ্যমে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে প্রমাণিত হয়। এ কারণে উপসহকারী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা (নং-০৩/২০২৫) রুজু করা হয়। পাশাপাশি ভুয়া কাগজপত্র তৈরি ও স্বাক্ষর জালিয়াতি করে প্রকল্পের কাগজ তৈরির অভিযোগে কঠোর শাস্তির সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে তার নিজের পক্ষে জবাব দেওয়ার জন্য ১০ দিনের সময় নির্ধারণ করে দেয় সওজ কর্তৃপক্ষ।
অভিযোগ এবং বিভাগীয় মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত উপসহকারী প্রকৌশলী মো. জাহিদুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিভাগীয় মামলা হয়েছে আমি জানি। এই মামলার শুনানিতে আমাকে ডাকা হয়। আমি শুনানিতে অংশ নিয়েছি এবং আমার জবাব দিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘যে চিঠির ভিত্তিতে আমাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, সেই চিঠির স্বাক্ষর আমার না। তা ছাড়া আমি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয়ে দায়িত্বে ছিলাম। আর চিঠি ছিল নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের। তাই নির্বাহী প্রকৌশলী কার্যালয়ের চিঠি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে দেওয়া যায় না।’
তা ছাড়া তার ই-মেইল ঠিকানা থেকে ব্যাংকে চিঠি পাঠানো হয়নি দাবি করে জাহিদুল ইসলাম বলেন, চিঠির হেডিংয়ে ই-মেইল আইডি ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘অফিসের চিঠি পাঠানো হলে আমার ব্যক্তিগত ই-মেইল আইডি ব্যবহার করা হবে কেন।’
এই পুরো জালিয়াতি প্রক্রিয়ার সঙ্গে তিনি অবশ্যই কোনোভাবে জড়িত নন জানিয়ে সওজের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘কোটি টাকার এই দায় আমি কেন নেব।’
তিনি বলেন, ‘সত্যি কথা, আমার সঙ্গে প্রধান প্রকৌশলীর কিছু দূরত্ব আছে এবং আমার ওপরে তার ব্যক্তিগত কিছু আক্রোশ আছে।’