দেশে কতজন বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের মালিক এবং তারা কী ধরনের অস্ত্র সঙ্গে রাখেন, তার কোনো হিসাব নেই খোদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। এমনকি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে গত ৩১ জানুয়ারির মধ্যে সব বৈধ অস্ত্র কাছের থানা বা ডিলার পয়েন্টে জমা দেওয়ার নির্দেশ ছিল, কিন্তু কতগুলো জমা হয়েছে, সে হিসাব নেই মন্ত্রণালয়ের কাছে।
অন্যদিকে জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ে বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে এখনো ১ হাজার ৩৩১টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। এর বাইরে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ছড়াছড়ির খবরও শোনা যায়। গত শনিবার মুন্সীগঞ্জে রাজনৈতিক সংঘাতের সময় প্রকাশ্যে বেশ কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্রের শোডাউন ও গুলির দৃশ্য বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার হয়েছে। ফলে ভোটের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, নির্বাচনি মাঠে ততই শঙ্কা বাড়াচ্ছে এসব বৈধ-অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র।
রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) বৈধ-অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের সংখ্যাসহ সার্বিক বিষয়ে খোঁজখবর নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যান এ প্রতিবেদক। এ সময় আলাপকালে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক শাখার ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে বৈধ অস্ত্রের সংখ্যা, অস্ত্রের ধরন বা ব্যবহারকারী কে–এসব কোনো তথ্যই নেই। বৈধ অস্ত্রের তালিকা প্রতি জেলার জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে রয়েছে। তারা যাচাই-বাছাই করে অস্ত্র ব্যবহারের জন্য যোগ্য ব্যক্তির অনুকূলে অস্ত্রের লাইসেন্স ইস্যু করে থাকেন। অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল বা নবায়নও তারাই করে থাকেন। ডিসিরা তাদের নিজ নিজ জেলায় বৈধ অস্ত্র ব্যবহারকারীর সংখ্যা কতজন বা কতগুলো অস্ত্র ব্যবহারের জন্য লাইসেন্স অনুমোদন রয়েছে, সেগুলো বলতে পারবেন। এমনকি ৩১ জানুয়ারির মধ্যে কতগুলো অস্ত্র সারা দেশে জমা হয়েছে, তারও কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নেই বলে খবরের কাগজের কাছে স্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এ প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ঢাকা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানান, ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার অস্ত্রের লাইসেন্স অনুমোদন করা হয়েছে। তবে এই সংখ্যা নিয়মিত কমবেশি হয়ে থাকে। একই সংখ্যায় স্থির থাকে না। কারণ হিসেবে জেলা প্রশাসনের এই কর্মকর্তা জানান, অস্ত্র ব্যবহারের নতুন নীতিমালায় অস্ত্রের লাইসেন্স নবায়নের জন্য টাকার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। ফলে অনেকেই অস্ত্রের লাইসেন্স নবায়ন না করে ইতোমধ্যে ‘সারেন্ডার’ বা জমা দিয়েছেন। আবার ৫ আগস্টের পর অস্ত্র জমা দেওয়ার জন্য সরকারের নির্দেশ অমান্য করে অনেকেই অস্ত্র জমা দেননি। এতে সেই লাইসেন্সের অনুমোদন বাতিল হয়ে সেটি এখন অবৈধ অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিতই নতুন অস্ত্রের লাইসেন্স ইস্যু করা হচ্ছে।
সর্বশেষ গত ১৮ জানুয়ারির সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী এ পর্যন্ত কতটি অস্ত্র জমা হয়েছে–জানতে চাইলে জেলা প্রশাসনের এই কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী নির্বাচন উপলক্ষে গত ৩১ জানুয়ারির মধ্যে সাধারণ নাগরিকদের কাছে থাকা সব বৈধ অস্ত্র জমা দেওয়ার জন্য সময় ছিল। কিন্তু পুলিশের পক্ষ থেকে এখনো এ বিষয়ে কোনো তথ্য জেলা প্রশাসনকে সরবরাহ করা হয়নি। ফলে এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্যও জেলা প্রশাসনের কাছে নেই।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিত্র এবং দেশের রাজধানী তথা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জেলা ঢাকার ক্ষেত্রে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বা তথ্য সংরক্ষণের বিষয়টি উদ্বেগজনক বলে মনে করেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।
এ প্রসঙ্গে সাবেক আইজিপি ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুল কাইয়ুম গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘বৈধ অস্ত্রের সব ধরনের তথ্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরে থাকার কথা, এটাই স্বাভাবিক। এমনকি অবৈধ অস্ত্রের বিষয়েও তথ্য থাকতে হবে। কিন্তু দেশের যে প্রেক্ষাপটে থানা থেকেও বিপুল অস্ত্র-গুলি লুট হয়েছিল, সেগুলোও অনেকটা উদ্ধার হয়নি। ভোটের আগে এই তিন-চার দিনে সবগুলো উদ্ধার করতে পারবে বলেও আশা করি না। এ অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বাড়তি সজাগ থাকতে হবে। কেউ যাতে বের করতে না পারে, ব্যবহার করার সুযোগ না পায়, সেদিকে কঠোর দৃষ্টি রাখা জরুরি। পাশাপাশি অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করতে হবে।’
গত ১৮ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখার উপসচিব আবেদা আফসারী স্বাক্ষরিত একটি প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছিল, ‘৩১ জানুয়ারির মধ্যে স্থগিতকৃত/লাইসেন্সভুক্ত আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদসমূহ লাইসেন্সধারীর (স্থায়ী/বর্তমান) ঠিকানার নিকটস্থ থানায় বৈধ ডিলারের নিকট লাইসেন্স গ্রহীতা নিজে/মনোনীত প্রতিনিধির মাধ্যমে জমা দিতে হবে। আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত লাইসেন্সধারী ব্যক্তির আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও প্রদর্শন সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ থাকবে।’
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, সামরিক-অসামরিক কর্মকর্তা, বিভিন্ন সরকারি-আধা সরকারি এবং বেসরকারি দপ্তর, আর্থিক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনাসমূহে নিয়োজিত নিরাপত্তা প্রহরী, রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও জাতীয় সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের অনুকূলে আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স ও তার সশস্ত্র রিটেইনারদের ক্ষেত্রে এই আদেশ প্রযোজ্য হবে না।
এমন প্রেক্ষাপটে বৈধ-অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র নির্বাচনি মাঠের শান্তি-শৃঙ্খলায় বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ওমর ফারুক। রবিবার তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেভাবে অবৈধ অস্ত্র বা লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি। তার মাঝে আবার নির্বাচন ঘিরে অনেককে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে, যারা সেটি এখনো বহন বা ব্যবহার করতেও পারবেন। ফলে এসব পরিস্থিতি নির্বাচনে একধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে।’
ড. মো. ওমর ফারুক বলেন, কোনো কারণে নির্বাচন যদি সুষ্ঠু না হয় বা ভোটের মাঠে বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয়, তখন এসব অস্ত্র নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। তা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা সরকারের দায়িত্বশীলদের বাইরে যে কারও হাতেই আগ্নেয়াস্ত্র থাকা মানেই সেটা সাধারণ ভোটার বা জনগণের জন্য ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
এ বিষয়ে রবিবার কথা বলতে পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার এআইজির সরকারি মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে এই শাখার অন্য একজন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, থানা থেকে লুট হওয়া ১ হাজার ৩৩১টি আগ্নেয়াস্ত্র এখনো (গতকাল পর্যন্ত) উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।