আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একই সঙ্গে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ ও গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য ব্যয় হবে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। নির্বাচন পরিচালনায় ব্যয় হবে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
এভাবে গণভোট, পোস্টাল ব্যালট ও অন্যান্য খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা। সবমিলে নির্বাচন কমিশন (ইসি) এই খরচ মোট ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে। অন্য বছরের মতো এবারও নির্বাচনি এ বাজেট অনুমোদন হয়েছে।
ইসি সূত্র জানায়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যয় হয়েছিল ২ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ওই নির্বাচনে গণভোট ছিল না। তবে এবার জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে হবে। ফলে বাড়ছে খরচ। আসন্ন নির্বাচনে সরকারের কোষাগার থেকে এসব অর্থ খরচ করা হবে। এবার ভোটে ব্যয় বাড়ছে ৮৭৪ কোটি টাকা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা ও নির্বাচন পরিচালনার জন্য মোট ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। তবে পরে কিছুটা বাড়ানো হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো অংশ নেয়। এর আগে দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপিসহ কিছু রাজনৈতিক দল। ওই নির্বাচনে খরচ হয় প্রায় ২৬৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে নির্বাচন পরিচালনায় ৮১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেছনে ব্যয় হয়েছিল ১৮৩ কোটি টাকা। এ ছাড়া ২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনের জন্য ব্যয় হয় প্রায় ১৬৫ কোটি টাকা। কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যবস্থাপনা ও নির্বাচনি নানা উপকরণের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। এ কারণেই ক্রমশ নির্বাচনের খরচ বাড়ছে।
উল্লেখ্য, দেশে এ পর্যন্ত তিনবার গণভোট হয়েছে– ১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালে। তবে এই তিনটির কোনোটিই সংসদ নির্বাচনের দিনে হয়নি। এ জন্য খরচও কম হয়।
ইসির বাজেট শাখা থেকে জানা যায়, মূলত জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট হওয়ার কারণেই ব্যয় বাড়ছে। প্রচার, ব্যালট ছাপানোসহ নানা খাতে ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে গণভোট। নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি গণভোটের প্রচারে নির্বাচনি ব্যয় থেকে এবার ছয় মন্ত্রণালয় পাচ্ছে ১৪০ কোটি টাকা। গণভোটের প্রচারের জন্য সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় পাচ্ছে ৪৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া তথ্য মন্ত্রণালয় ৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা, ধর্ম মন্ত্রণালয় ৭ কোটি টাকা, এলজিইডি ৭২ কোটি টাকা, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা পাচ্ছে। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ শাখা গণভোট প্রচারে ৪ কোটি টাকা ব্যয় করছে বলে জানিয়েছে বাজেট শাখা।
নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ বলেন, ‘প্রথমে আমরা জাতীয় নির্বাচনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ২ হাজার ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ পাই। পরবর্তী সময়ে আমাদের সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট করার জন্য নির্দেশ দেয় সরকার। সে মোতাবেক আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত বাজেটের চাহিদা পাঠাই। যার পরিপ্রেক্ষিতে পরে এক হাজার ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ পাই। সব মিলিয়ে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছি।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা গণভোটের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যালট পেপার, কর্মী, যাতায়াত, খামসহ নির্বাচনি সামগ্রী বাবদ খরচ করছি। কিছু প্রচার ও কেনাকাটা কমিশন নিজেই করছে। এ ছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের এনওসির পরিপ্রেক্ষিতে এলজিইডি (সিসি ক্যামেরা), সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, ধর্ম, তথ্য, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় গণভোটের পক্ষে প্রচারের জন্য আমাদের বরাদ্দ থেকে অর্থ নিয়েছে।
সূত্র জানায়, অর্থ মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে নির্বাচনসংক্রান্ত এই বিপুল অঙ্কের অর্থব্যয়ের ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্ত জুড়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি)। এতে বলা হয়, ব্যয়ের ক্ষেত্রে ‘দ্য পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট-২০২৬’ এবং ‘দ্য পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস-২০২৫’সহ যাবতীয় আর্থিক বিধিবিধান ও নিয়ম যথাযথ অনুসরণ করতে হবে। নির্দেশনায় আরও বলা হয়, যে খাতে ব্যয়ের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হলো, সেই খাত ছাড়া অন্য কোনো খাতে এ অর্থ খরচ করা যাবে না। এ ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে ব্যয়কারী কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে। আর বরাদ্দকৃত অর্থ সাশ্রয় হলে ৩০ জুনের মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচনের জন্য চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে ইসির জন্য মোট বরাদ্দ ধরা হয় দুই হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিচালন খরচ ছিল ২ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন খরচ ছিল ২২৯ কোটি টাকা। এই মোট বরাদ্দের মধ্যেই সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রাথমিকভাবে ২ হাজার ৮০ কোটি টাকা রাখা হয়েছিল, যার সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত এক হাজার ৭০ কোটি টাকা।
নির্বাচন কাজে সবচেয়ে বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের দৈনিক খোরাকি ভাতায়। এতে বরাদ্দ থাকছে ৭৩০ কোটি টাকা। সরকারি গাড়ি ব্যবহারের জ্বালানি তেলে ব্যয় হবে ২৯৮ কোটি টাকা এবং চুক্তিভিত্তিক যানবাহন ব্যবহারে ব্যয় আরও ২০১ কোটি টাকা। মনিহারি পণ্য কেনাকাটায় ৫৮১ কোটি, নির্বাচন পরিচালনায় অংশগ্রহণকারীদের সম্মানী ব্যয় ৫১৫ কোটি, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ক্রয় ১৬২ কোটি, মুদ্রণ ও বাঁধাইয়ে ১০৮ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। যাতায়াত ভাতায় ১০৯ কোটি এবং বিজ্ঞাপন ও প্রচারে ১০৩ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আপ্যায়ন খরচ বাবদ ১৮৪ কোটি টাকা, পরিবহন ব্যয় ৮০ কোটি, অনিয়মিত শ্রমিকদের মজুরি ৩১ কোটি, স্ট্যাম্প ও সিল ১৭ কোটি, মেশিন ও সরঞ্জাম ভাড়া ১৫ কোটি, প্রশিক্ষণ পরিচালনা ব্যয় ৭ কোটি, ব্যালট বাক্স ৫ কোটি এবং অন্যান্য খাতে ৩ কোটি টাকা খরচ ধরা হয়েছে।