নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসও পূরণ হয়নি। এরই মধ্যে প্রশাসনে গতি আনতে জোর দেওয়া হয়েছে। আর এ জন্য সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ব্যাপক রদবদল আনা হচ্ছে। দক্ষ ও যোগ্য লোক বসাতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোন পদে নতুন নিয়োগ দেওয়া হবে এরই মধ্যে তার তালিকা করা হয়েছে।
এসব পদের অনেকগুলোতে এরই মধ্যে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অনেক পদে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে এখনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি অনেক পদে। এখনো যোগ্য লোক খোঁজা হচ্ছে। কাকে নিয়োগ দেওয়া হবে এ নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে চিন্তাভাবনা চলছে। এসব নিয়োগে আওয়ামী শাসনামলে বঞ্চিত দক্ষ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এরই মধ্যে সচিবালয়ে বিএনপিপন্থি কর্মকর্তাদের তৎপরতা বেড়েছে। তাদের পক্ষ থেকে সচিবসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পেতে দাবি ও একধরনের চাপ বাড়ানো হচ্ছে। তবে এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিভিন্ন বৈঠকে প্রশাসনের দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছেন।
বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, যে সব পদে নতুন ব্যক্তি নিয়োগ দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তার মধ্যে, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও পরিচালক, পেট্রোবাংলা (বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ কর্পোরেশন) চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান ও পরিচালক, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) মহাপরিচালক, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) মহাপরিচালক, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক।
এ তালিকায় আরও আছে শিল্প, রেলওয়ে, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, স্বাস্থ্য ও অর্থ বিভাগের সচিব এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান। সিভিল অ্যাভিয়েশনের সদস্য, পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালক, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর অতিরিক্ত মহাপরিচালক, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) পরিচালক, পায়রা বন্দরের সদস্য, মোংলা বন্দরের সদস্য, ঢাকা ওয়াসার ডিএমডি, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সিইও, চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকও (এমডি) আছেন এ তালিকায়। এ তালিকায় আরও আছেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পরিচালক।
বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়েছে, ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ, বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাই একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কেউ যাতে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হয়, সেটাও নিশ্চিত করা হবে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক। প্রশাসনে গতি আনতে দলীয়করণমুক্ত দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে। আরও সতর্ক থাকতে এসব নিয়োগে যেন কোনো ধরনের বাণিজ্য না হয়। সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দলীয়করণ বন্ধ করতে হবে। অতীতে দেখা গেছে, যখন যে দল আসে, সে দল প্রশাসন, পুলিশ, রাষ্ট্রীয় ও সরকারি সংস্থাসহ সব জায়গায় নিজেদের লোক বসিয়ে দিয়েছে। মানুষ এটা আর দেখতে চায় না। এতে দুর্নীতি হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে দুর্নীতিবাজরা নতুন সরকারের নীতি নির্ধারকদের অনেকের সঙ্গে যোগসাজশে এসব নিয়োগ পেয়ে থাকে। এসব ব্যক্তিরা অদক্ষ। এদের এড়িয়ে চলা দেশের অগ্রগতির স্বার্থে উত্তম।
২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশ আইএমএফের সঙ্গে ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তি করে। ঋণ চূক্তির অন্যতম শর্ত ছিল দুর্নীতিমুক্ত গতিশীল প্রশাসন। ঋণের দুই কিস্তি আটকে দিয়েছে সংস্থাটি। কিস্তি ছাড়ে অন্য শর্ত পূরণের সঙ্গে প্রশাসনে গতি আনতে রদবদলসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ওই বছরের ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হয়। এরপর প্রশাসনে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়। প্রথম ছয় মাসেই সিনিয়র সচিব ও সচিব পদে ১৪ জন, গ্রেড-১ পদের ১ জন ও অতিরিক্ত সচিব পদের ১৯ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। একই সময়ে সিনিয়র সচিব ও সচিব পদের ২৩ জন, গ্রেড-১ পদের ২ জন ও অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের ৫১ কর্মকর্তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। এরপরও আরও বেশ কিছুসংখ্যক কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়।
জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন সরকার প্রশাসনে বড় পরিবর্তন আনছে। এতে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের অনেককে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে চুক্তিতে থাকা কয়েকজন সচিবের জায়গায় নতুন করে দায়িত্ব দেওয়া হবে বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে এসব নিয়ে তৎপরতা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ বদলি হতে পারেন, এমন প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। আশাকরি এতে প্রশাসনে গতি আসবে।