ঈদের কেনাকাটায় বিভিন্ন ব্যান্ডের পোশাকে আস্থা রাখেন সাধারণ মানুষ। সেটাকে পুঁজি করে প্রতারণা করে যাচ্ছে নামিদামি ব্র্যান্ডগুলো। কেউ পুরোনো স্টিকারের ওপর নতুন স্টিকার লাগিয়ে দাম বাড়াচ্ছে, আবার কেউবা অন্যের উৎপাদিত পোশাক নিজেদের বলে দেদার বিক্রি করছে। ভোক্তা অধিকারের অভিযানে গুটিকয়েক ব্যবসায়ী ধরা পড়লেও অধিকাংশই রয়ে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এমন পরিস্থিতি নিয়ে ক্যাবের পাশাপাশি উদ্বেগ প্রকাশ করছেন খোদ ভোক্তা অধিকারের কর্মকর্তারা।
পোশাক ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের দুর্বলতা বা পছন্দকে টার্গেট করে কারসাজিতে মেতে উঠেছেন। কারণ ক্রেতারা ভাবেন–আমদানি করা কাপড়ের গুণগত মান ভালো, তাই দামও হবে বেশি। পাশাপাশি একটি পোশাক কত দামে কেনা, কোথায় তৈরি, বাস্তবে আমদানি করা কি না–এসব বিষয় যাচাই করার সুযোগ ক্রেতাদের থাকে না। আর এটাকেই পুঁজি করে নিয়মিত প্রতারণার আশ্রয়ে বাড়তি অর্থ আদায় করে যাচ্ছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ও ভোক্তা অধিকারের কর্মকর্তারা বলছেন, সাধারণ মানুষ কাপড় সম্পর্কে অভিজ্ঞ নন। তাই তারা ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবে বিভিন্ন নামিদামি ব্র্যান্ডের ওপর আস্থা রাখতে চান। আবার অনেকে তাড়াহুড়া করে কেনাকাটা সারেন। এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম নগরের টেরিবাজার, আগ্রাবাদ, দুই নম্বর গেট ও জিইসি মোড় এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। সংস্থাটির অভিযানে বিভিন্ন নামিদামি ব্র্যান্ডের প্রতারণা ধরা পড়ে। চট্টগ্রামে ঈদকেন্দ্রিক সবচেয়ে বেশি বেচাকেনা হয় নগরের রিয়াজউদ্দিন বাজার ও টেরিবাজার এলাকায়। গত ৭ মার্চ টেরিবাজারে অভিযান পরিচালিত হয়। সেখানে রাজস্থান নামক প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ইন্ডিয়ান স্টিকার বসিয়ে প্রতারণার বিষয় ধরা পড়ে। অন্যদিকে পুরোনো স্টিকারের ওপর নতুন স্টিকার লাগিয়ে দাম বাড়িয়ে পণ্য বিক্রি করছিল খাজানা নামক একটি প্রতিষ্ঠান।
এক দিন পর গত ৯ মার্চ নগরের আগ্রাবাদ এলাকায় অভিযান চালায় ভোক্তা অধিকার। সেখানেও মেলে ভয়াবহ প্রতারণার চিত্র। পোশাকের গায়ে ডাবল স্টিকার দিয়ে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছিল জেন্টেল পার্ক। পাশাপাশি অন্যের উৎপাদিত পোশাক নিজেদের বলে বিক্রি করছিল শৈল্পিক।
গত ১০ মার্চ সংস্থাটির নগরের দুই নম্বর গেট এলাকায় ফিনলে সাউথ সিটিতে অভিযানে দেখা যায়, সেখানে বাংলাদেশি পণ্য বিদেশি বলে বিক্রি করছিল গুজেল ও ইরানি বোরকা হাউস নামক প্রতিষ্ঠান। তারা পণ্যের ভাউচার দেখাতে পারেনি। পাশাপাশি লোকাল মার্কেট থেকে অন্যের তৈরি পোশাক কিনে নিজেদের উৎপাদিত বলে বিক্রি করছিল খাদি ঘর নামক প্রতিষ্ঠান।
গত ১১ মার্চ নগরীর জিইসি মোড় এলাকার সানমার ওশান সিটিতে অভিযানে দেখা যায়, বাংলাদেশি কাপড়কে পাকিস্তানি বলে বিক্রি করছিল অ্যাঞ্জেলিক নামক প্রতিষ্ঠান। তা ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি যথাযথ ভাউচার উপস্থাপন করতে পারেনি। এসব প্রতিষ্ঠানকে জরিমানার আওতায় আনা হয়েছে।
নগরের পূর্ব নাসিরাবাদ এলাকার বাসিন্দা মো. আকিব বলেন, ‘ঈদের সময় একটু বাড়তি অর্থ দিয়ে ভালোমানের পোশাক কিনতে চাই। তাই ভালো মানের বা নাম করা ব্র্যান্ডের ওপর আস্থা রাখি আমরা। কিন্তু অভিযানের পর যখন নামিদামি ব্র্যান্ডগুলোর প্রতারণা বিষয়ে জানতে পারি তখন হতাশ হয়ে পড়ি। শুধু জরিমানা করলে হবে না, এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া উচিত।’
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক ফয়েজ উল্লাহ বলেন, ‘আমদানি করা কাপড়ের ক্ষেত্রে এলসির কাগজ, আমদানিকারকের তথ্য, মোবাইল নম্বর সবকিছু থাকতে হবে। এর কোনোটাই দেখাতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। কেউ পুরোনো স্টিকারের ওপর নতুন স্টিকার লাগিয়ে দাম বাড়িয়েছেন, আবার অনেকে অন্যের উৎপাদিত পোশাক নিজেদের বলে বিক্রি করছেন। এটা ক্রেতার সঙ্গে প্রতারণা। আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
ক্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এস নাজের হোসাইন বলেন, ‘কাপড়ের দোকানে সারা বছর বেচাবিক্রি তুলনামূলক কম হয়। তাই ব্যবসায়ীরা পুরো বছরের মুনাফা রমজান মাসে করতে চান। অন্যদিকে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে অনেকেরই কাপড় সম্পর্কে ধারণা থাকে না। তাই দোকানদার দেশি কাপড়কে বিদেশি অথবা অন্যের উৎপাদিত পোশাক নিজেদের বললে যাচাই না করে তারা বাড়তি অর্থ দিয়ে কিনে ফেলছেন। এতে ক্রেতারা ঠকছেন।’