‘ট্রাস্ট পেট্রলপাম্পের শেষ মাথা খুঁজে পাইনি। তিন চারটা পেট্রলপাম্পে গিয়েছি, সব বন্ধ। অনেক ঘুরে এখানে এসেছি। লাইনে ২ ঘণ্টা অপেক্ষার পর ৫০০ টাকার তেল পেলাম। ভীষণ কষ্ট হয়েছে। অবাক লাগছে। সরকার বলছে তেলের সংকট নেই। তাহলে কেন এই সংকট?’
রাজধানীর আসাদ গেটে তালুকদার ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেলে তেল পেতে এভাবেই ভোগান্তির কথা জানান মোহাম্মদপুরের নুরুল ইসলাম।
শুধু এই ফিলিং স্টেশনেই নয়, অন্য ফিলিং স্টেশনেও তেল পেতে ভোগান্তির চিত্র চোখে পড়েছে। তেল না পাওয়ায় অনেক ফিলিং স্টেশন বন্ধ রয়েছে। ঢাকার বাইরেও একই চিত্র। ডিপো থেকে চাহিদামতো জ্বালানি তেল সরবরাহ না করায় খুলনায় তেল উত্তোলন বন্ধ করে দিয়েছেন পেট্রলপাম্প মালিকরা। চাহিদামতো তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা না হলে সোমবার থেকে রাজশাহীর সব ফিলিং স্টেশন ডিপো থেকে তেল উত্তোলন বন্ধ রাখার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। অনেক ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল নেই লিখে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আসলে সংকট কোথায়?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পেট্রলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. নাজমুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা বিপিসি থেকে যা তেল পাচ্ছি তা বিক্রি করছি। না পেলে বিক্রি করতে পারছি না। চাহিদামতো তেল না পাওয়ায় এই সংকট শুরু হয়েছে। বিশেষ করে সীমা বেঁধে দেওয়ার পর সংকট বেড়েছে। বিভিন্ন পেট্রলপাম্পে লাইন দীর্ঘ হচ্ছে। অনেকে চাহিদামতো তেল না পেয়ে মব সন্ত্রাস করার চেষ্টা করছে।’
এ ব্যাপারে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ করা হলেও কোনো মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। পরে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়। তিনিও ফোন না ধরায় কোনো মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিকভাবে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এ অবস্থায় গত ৬ মার্চ ফিলিং স্টেশন থেকে তেল সরবরাহের সীমা বেঁধে দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। তারপর থেকেই তেল কিনতে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল পেতে লাইন দীর্ঘ হচ্ছে। সরকারের বেঁধে দেওয়া তেল পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাম্পের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে মোটরসাইকেল ও গাড়ির চালকদের।
শনিবার (১৪ মার্চ) দেখা গেছে, আসাদ গেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশনে তেল পেতে প্রাইভেট কার ও মোটরসাইলের লাইন চন্দ্রিমা উদ্যানে গিয়ে ঠেকেছে। লাইনে দাঁড়িয়ে তেল পেতে কারও কারও ২ ঘণ্টা লেগেছে। অপেক্ষমাণ সবার মধ্যে ছিল চরম ক্ষোভ।
এ সময় মনিরুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন বাইকচালক ক্ষুব্ধ স্বরে বলেন, ‘সরকার বলছে, তেলের কোনো সংকট নেই। তাহলে লাইন এত দীর্ঘ হচ্ছে কেন? সরকার কি দেখতে পাচ্ছে না। গণমাধ্যমে নিউজ হচ্ছে, মন্ত্রীরা কি দেখেন না? তেল পাওয়ার সীমা তুলে দেওয়া হচ্ছে না কেন?
ক্ষুব্ধরা আরও বলেন, ‘প্রথমে ২ লিটার করে দেওয়ার কথা জানানো হয়। পরে তা বাড়িয়ে ৫ লিটার করা হয়েছে। তাতে ৭ দিন যাওয়ার কথা। তাহলে পরিমাণের সীমা তুলে নেওয়া হচ্ছে না কেন? ওই ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার ফাত্তাহ আজিমসহ অন্যরা খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকার যে তেল দিচ্ছে, তা আমরা বিক্রি করছি। ফুরিয়ে গেলে স্টেশন বন্ধ থাকে। পরিমাণ বাড়ালে আমরাও বেশি করে বিক্রি করতে পারব।’
আসাদগেটের অপর পেট্রলপাম্প সোনার বাংলা সার্ভিস স্টেশনেও তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। এ সময় প্রাইভেট কারের মালিক হাসান মাহমুদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘দুই ফিলিং স্টেশনে তেল না পেয়ে এখানে লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। ঘণ্টা দুয়েক অপেক্ষার পর ২ হাজার টাকার তেল পেলাম।’
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, সরকার বলছে তেলের কোনো সংকট নেই। তাহলে তেল বিক্রির সীমা তুলে নিচ্ছে না কেন। আগে তো সব সময় এত দীর্ঘ লাইন ছিল না। সরকার তেল বিক্রির সীমা বেঁধে দেওয়ার পরই অবস্থা খারাপ হয়েছে। জনগণের স্বার্থে সীমা তুলে নেওয়া দরকার।’
মতিঝিলের পূবালী ফিলিং স্টেশন, শাহবাগের মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টার, বিজয় সরণিসংলগ্ন ট্রাস্ট পাম্প, শেওড়াপাড়ায় মেসার্স সবুর ফিলিং স্টেশন, হাজীপাড়া ফিলিং স্টেশনসহ বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনেও দেখা গেছে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট গাড়ির দীর্ঘ লাইন।
দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত রাখতে সরকারি ছুটির দিনেও ডিপো খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। গত বৃহস্পতিবার বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানার সই করা প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের নির্দেশ অনুযায়ী শুক্র ও শনিবারও বিপিসির অধীনে থাকা বিপণন কোম্পানিগুলোর প্রধান স্থাপনা বা ডিপো খোলা থাকবে এবং নিয়মিত তেল সরবরাহ অব্যাহত থাকবে।
এদিকে খুলনায় ডিপো থেকে চাহিদামতো জ্বালানি তেল সরবরাহ না করায় তেল উত্তোলন বন্ধ করে দিয়েছেন পেট্রলপাম্প মালিকরা। গতকাল শনিবার সকাল থেকে খুলনার দৌলতপুরে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা ডিপো থেকে জ্বালানি তেল উত্তোলন ও বিপণন বন্ধ রয়েছে। জ্বালানি তেলের সরবরাহ না থাকায় খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৬টি জেলার অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন বন্ধ হয়ে গেছে।
চাহিদামতো তেল সরবরাহ না হওয়া পর্যন্ত পাম্প মালিকরা ডিপো থেকে তেল উত্তোলন করবেন না বলে গতকাল খুলনায় জানিয়েছেন বাংলাদেশ পেট্রলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম।
তিনি বলেন, ‘মিডিয়াতে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল মজুত আছে বলে ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। সাড়ে ১৩ হাজার লিটারের ট্যাংকলরিতে ডিপো থেকে ৪ থেকে ৬ হাজার লিটার তেল দেওয়া হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় দ্বিগুণ বেড়েছে।
রাজশাহী মহানগরেও জ্বালানি তেলের সংকট চলছে। সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল সেখানকার পাম্প মালিকরা জানান, নিরবচ্ছিন্নভাবে তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা না হলে আগামীকাল (সোমবার) থেকে রাজশাহী জেলার সব ফিলিং স্টেশন ডিপো থেকে তেল উত্তোলন বন্ধ রাখবে। নগরীর পদ্মা গার্ডেনের কফিবার রেস্তোরাঁয় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটরস অ্যান্ড পেট্রলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের রাজশাহী জেলা শাখার এক সভায় এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়। সভায় সংগঠনের প্রধান উপদেষ্টা মো. আবদুল আওয়াল খান জোতি, সভাপতি মো. মনিমুল হক, কোষাধ্যক্ষ মো. আমিনুল ইসলাম, সহসাধারণ সম্পাদক মো. মোখলেসুর রহমানসহ জেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনের মালিকরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় বক্তারা বলেন, রাজশাহী একটি বিভাগীয় শহর হলেও প্রয়োজন অনুযায়ী তেল উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। আবার পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না থাকায় কিছু কিছু পাম্পে মব হামলার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। তাই পাম্পগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। তা না হলে ১৬ মার্চ থেকে ডিপো থেকে তেল উত্তোলন বন্ধ রাখার পাশাপাশি প্রয়োজনে পাম্পও বন্ধ রাখা হবে।
বরগুনায় পাম্পে ঝুলছে ‘তেল নেই সাইনবোর্ড’
জ্বালানি তেল না থাকায় সদর উপজেলার একমাত্র ফিলিং স্টেশন এস অ্যান্ড বি ফিলিং স্টেশনে ‘অকটেন নেই, পেট্রল নেই’ লিখে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তীব্র ভোগান্তিতে পড়েছেন।
গতকাল শনিবার সকালে দেখা যায়, শহরের বিভিন্ন দোকানে পেট্রল বা অকটেন না পেয়ে মোটরসাইকেলসহ ছোট বড় যানবাহন নিয়ে অনেকেই ফিলিং স্টেশনটিতে ভিড় করছেন। কিন্তু সেখানে ‘অকটেন নেই, পেট্রল নেই’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছে পাম্প কর্তৃপক্ষ। ফলে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করতে এসে খালি হাতেই ফিরে যাচ্ছেন অনেকে।
মোটরসাইকেল চালক মো. মামুন বলেন, ‘আমরা গাড়ি চালিয়ে সংসার চালাই। প্রতিদিন অন্তত ৫০০ টাকার তেল লাগে। কিন্তু গত এক সপ্তাহ যাবৎ কোনোদিন ১০০ টাকার, কোনো দিন ২০০ টাকার বেশি তেল পাইনি। আজ কোথাও তেলই পাচ্ছি না।’
এস অ্যান্ড বি ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক রিপন কুমার ব্যাপারী বলেন, ‘আমাদের পাম্পে পেট্রোল ও অকটেন শেষ হয়ে গেছে। শুক্রবার ও শনিবার ডিপো বন্ধ থাকায় তেল পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে বরগুনার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সজল চন্দ্র শীল বলেন, ‘বরিশালের ডিপো থেকে জানতে পেরেছি, তেলের কোনো সংকট নেই। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মনিটরিং টিম কাজ করছে।’
[প্রতিবেদনটি তৈরি করতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন খবরের কাগজের খুলনা প্রতিনিধি মাকসুদ রহমান, রাজশাহী ব্যুরোর এনায়েত করিম ও বরগুনা প্রতিনিধি মহিউদ্দিন অপু।]