দাম বাড়ার ‘সম্ভাবনা’য় পাম্পমালিকরা জ্বালানি তেল মজুত করে রাখছেন বলে অভিযোগ অনেক গ্রাহকের। আর এ কারণেই তেল থাকা সত্ত্বেও ‘তেল নেই’ লেখা ঝুলতে দেখা গেছে এসব পাম্পে। তেলের এই ধারাবাহিক সংকটের কারণে গতকাল শুক্রবার সাতক্ষীরায় সড়কে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেছেন গ্রাহকরা। অন্যদিকে পাম্প কর্তৃপক্ষ বলছে ভিন্ন কথা। মোটরসাইকেলচালকসহ জ্বালানি তেলের গ্রাহকরা সংকটের ‘শঙ্কা’য় ঘরে ঘরে তেল মজুত করছেন বলে অভিযোগ করেছেন বিভিন্ন পাম্প স্টেশনে কর্মরতরা।
এদিকে জ্বালানি তেলের সরবরাহ তদারকিতে দেশের সব জেলায় যে ‘ভিজিলেন্স টিম’ গঠন করা হয়েছে, তাদের মাধ্যমে অবৈধ মজুদদারির তথ্য সংগ্রহে নামছে সরকার। তথ্যদাতাদের জন্য পুরস্কার দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
তেলসংকটের এই ‘শঙ্কা’-‘সম্ভাবনা’র দোষারোপের মধ্যে গতকাল সাপ্তাহিক বন্ধের দিনেও পাম্পগুলোতে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। আবার কোনো কোনো পাম্প তেল না থাকার কারণে দিনভর কোনো তেলই বিক্রি করতে পারেনি। এসব পাম্প কর্তৃপক্ষ জানায়, গত ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের ছুটির মধ্যে তেল বরাদ্দের ধারাবাহিকতা স্বাভাবিক ছিল না।
পরস্পর দোষারোপের মধ্যে পাম্পমালিকরা বলছেন, এখন ছুটির মধ্যেও তেলের জন্য লাইন পড়ছে আগের মতো। তাদের দৃষ্টিতে এর কারণ হচ্ছে, রাইডশেয়ারিং মোটরসাইকেলসহ পরিবহনগুলোর এখন যাত্রী কম। কিন্তু আগামীকাল রবিবার থেকে পুরোদমে স্কুল, অফিস-আদালত খুলে গেলে তাদেরও যাত্রী বাড়বে। তাই এখন অলস সময়ে তারা বারবার এসে তেল নিয়ে মজুত করছেন। একই দিনে একজন চালক দু-তিনবারও তেল নিয়ে যাচ্ছেন।
গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন পাম্প ঘুরে দেখা যায়, সবচেয়ে দীর্ঘ লাইন প্রধানমন্ত্রীর কাযালয়সংলগ্ন ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে। বিজয় সরণি মোড়ের কাছে অবস্থিত এই স্টেশনের তেল নিতে আসা যানবাহনের সারি কখনো কখনো উত্তর দিকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের জাহাঙ্গীর গেটের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে মোটরসাইকেলের জন্য তেল নেন তারেক হাসান। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন বলে জানান তিনি।
লাইনে অবস্থান করা অবস্থায় জানতে চাইলে তিনি জানান, গতকাল ভোর ৪টায় এসে তিনি তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। আশা ছিল তেল বিতরণ শুরু হলে শুরুর দিকেই যেন তিনি পেয়ে যান। কিন্তু সকাল সাড়ে ৭টার দিকে জানলেন যে তেল পাওয়া যাবে না। তাই বাসায় ফিরে যান। আবার বেলা ১১টার দিকে এসে লাইন ধরেন। এই যাত্রায় তিনি সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় তেল পান।
তিনি বলেন, অন্য পাম্পে চেষ্টা করিনি, কারণ এখানে দেরিতে হলেও চাহিদা অনুসারে তেল পাওয়া যায়। কষ্ট করে একবার নিতে পারলে অফিস খোলার পর কয়েক দিন নিশ্চিন্তে থাকা যাবে। ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের দায়িত্বরত কর্মী মেহেদী হাসান গতকাল সন্ধ্যায় খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা যখন যা বরাদ্দ পাই তা গ্রাহকদের চাহিদা অনুসারে দিতে থাকি। শেষ হয়ে গেলে আর দিতে পারি না।’
তবে অন্য স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, মোটরসাইকেলপ্রতি ৫ লিটার, প্রাইভেট কার ১০ লিটার ও জিপ ২৫ লিটার করে তেল পাচ্ছে।
গতকাল দিনভর বন্ধ ছিল রাজধানীর পরীবাগে অবস্থিত পাম্প ‘পূর্বাচল ট্রেডার্স’।
বিকেলে কথা হয় পাম্পের ম্যানেজার ওয়াহিদুজ্জামানের সঙ্গে।
তিনি বলেন, ‘গত বছর এই সময়ে আমরা যেমন তেলের বরাদ্দ পেতাম, এবার এই সময়ে একই বরাদ্দ পাচ্ছি। তার মানে বরাদ্দ তো একই আছে। কিন্তু আগে ওই বরাদ্দের তেল বিক্রি করতাম সারা দিনে। এখন চার-ছয় ঘণ্টায়ই তা শেষ হয়ে যায়। শেষ হয়ে গেলে তো আমাদের পাম্প বন্ধ করে দিতে হয়।’
তবে একই সময় পাশের ‘মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টারে’ ছিল যানবাহনের দীর্ঘ সারি। তেল বিতরণও চলছিল। এই পাম্পের হিসাবরক্ষক মো. মীর আজীম বলেন, এটি মেঘনা পেট্রোলিয়ামের একমাত্র আউটলেট। সরকারি পাম্প। সরকারি নিয়মে চলে। রাত ৮টায় বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু বন্ধ হওয়ার সময়ও দীর্ঘ লাইন থাকে। একই চালক এক দিনে দু-তিনবারও তেল নিতে আসেন। এই কারণেও লাইন দীর্ঘ হয়।
অবৈধ মজুতের তথ্যদাতাদের পুরস্কারের ঘোষণা আসছে
এদিকে অবৈধ তেলের কারবার ঠেকাতে জেলায় জেলায় ‘ভিজিল্যান্স টিম’ গঠন করা হয়েছে। তাদের মাধ্যমে অবৈধ মজুতদারির তথ্য সংগ্রহে নামছে সরকার। তথ্যদাতাদের জন্য পুরস্কার দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধের কারণ দেখিয়ে যেন কেউ অবৈধভাবে তেলের কারবার করতে না পারে, সে জন্য প্রতিটি জেলায় এই ভিজিল্যান্স টিম গঠন করা হয়েছে।
গতকাল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে দেশের বিভিন্ন জেলার জন্য পৃথক ভিজিল্যান্স টিম ও যোগাযোগ নম্বরও প্রকাশ করা হয়েছে। অধিকাংশ জেলায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) এসব টিমের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন। কয়েকটি জেলায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সাধারণ) এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) দায়িত্ব পালন করছেন।
এর মধ্যে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, খুলনা, কক্সবাজার, খুলনা, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে তেলসংকট নিয়ে নানা খবর পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রামে কোথাও জ্বালানি বিক্রি বন্ধ, কোথাও দীর্ঘ লাইন
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রাম নগরীর কিছু ফিলিং স্টেশন জ্বালানি বিক্রি বন্ধ রেখেছে। আবার কিছু ফিলিং স্টেশন সচল থাকলেও দেখা গেছে দীর্ঘ লাইন। জ্বালানি পেতে দীর্ঘ এক ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় অপেক্ষায় থেকে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন চালকরা।
গতকাল দুপুরে নগরীর বেশ কিছু ফিলিং স্টেশনে ঘুরে দেখেছে খবরের কাগজ। নগরীর পাহাড়তলী এলাকার হাক্কানী পেট্রল পাম্প দুপুর দেড়টা থেকে জ্বালানি বিক্রি শুরু করেছে। সেখানে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। নগরীর গণি বেকারি এলাকায় কিউসি ট্রেডিং লিমিটেড নামক পেট্রলপাম্পটি সচল রয়েছে। সেখানেও তেল পেতে দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষায় আছেন মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কারসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালকরা।
তবে নগরীর ওয়াসা এলাকায় এসএইচ খান অ্যান্ড সন্স নামক ফিলিং স্টেশনটিতে দুপুরে গিয়ে বন্ধ পাওয়া যায়। একই চিত্র দেখা গেছে নগরীর হালিশহর ঈদগাঁহ, টাইগারপাস ও কদমতলী এলাকার কিছু পেট্রলপাম্পে।
কিউসি ট্রেডিং লিমিটেড পেট্রলপাম্পে অকটেন নিতে দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষা করছেন বেসরকারি চাকরিজীবী মো. ফাহিম। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আগামীকাল অফিস খোলা। তাই আজকে ছুটির দিনে এসেছি মোটরসাইকেলে অকটেন নিতে। বেশ কিছু জায়গা ঘুরে পেট্রলপাম্প বন্ধ পেয়েছি। শেষে এখানে এসে দেখি তেল দিচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘ লাইন। এক ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছি। তেল পেতে আরও ঘণ্টাখানেক লাগবে। এই ভোগান্তি কবে শেষ হবে জানি না।’
এদিকে আজ শনিবার থেকেই জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছে পেট্রলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। পাশাপাশি দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। গতকাল সংগঠনটির আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল এক জরুরি বিবৃতিতে এ আশা প্রকাশ করেন।