অনেক দিন ধরে বিনিয়োগে খরা চলছে। ফলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আদায়ে। ঘাটতি বেড়ে ৭০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। যদিও বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরই ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগের ছক কষতে শুরু করেন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ তা থামিয়ে দিয়েছে। জ্বালানিসংকট বাড়ছে। আমদানি-রপ্তানিতে টানাপোড়েন চলছে। এরই মধ্যে ব্যবসার খরচ বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বিনিয়োগ-ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি না আসায় রাজস্ব ঘাটতি আরও বাড়বে। আর এর প্রভাব পড়বে সমগ্র অর্থনীতিতে।
বাংলাদেশের নিট পোশাকশিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের দেশের অর্থনীতি আমদানিনির্ভর। শিল্প খাতের বেশির ভাগ কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। যুদ্ধের কারণে কাঁচামাল চাহিদামতো আমদানি করা যাচ্ছে না। সময়মতো রপ্তানিও করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে যুদ্ধের কারণে দেশে ভয়াবহ জ্বালানিসংকট দেখা দিয়েছে। দেশের ছোট-বড় সব ধরনের শিল্প খাত কঠিন সংকটের মধ্যে পড়েছে।’
ব্যবসায়ী এই নেতা আরও বলেন, ‘নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই বিনিয়োগ বাড়াতে বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। আমরা সরকারের এসব উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। পুরোনো বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন করে বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করতে থাকি। কিন্তু যুদ্ধ সব উল্টাপাল্টা করে দিয়েছে।’
বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, ‘পুঁজি বিনিয়োগ করার আগে একজন ব্যবসায়ী তা ফেরতের নিশ্চয়তা চাইবেন। কিন্তু যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগের অর্থ ফেরত আসার নিশ্চয়তা নেই, বরং লোকসানের আশঙ্কা বেশি। ব্যবসা করতে না পারলে রাজস্ব পরিশোধ করব কীভাবে? এ ছাড়া আমদানি-রপ্তানিতে গতি না এলে শুল্ক আদায়ের ধস নামবে। আয়কর ও ভ্যাট খাতেও নেতিবাচক ধারা থাকবে। এসবের প্রভাব পড়বে সমগ্র অর্থনীতিতে।’
একই মত জানিয়ে রাজস্ব খাতের বিশ্লেষক এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, দেশে ১৭ থেকে ১৮ বছর ধরে বিনিয়োগ নেই। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিনিয়োগ বাড়াতে অনেক পদক্ষেপ নিলেও কাজে আসেনি। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অনেক উদ্যোক্তা নতুন করে বিনিয়োগের ঘোষণা দিলেও যুদ্ধের কারণে তা থমকে আছে।
তিনি আরও বলেন, এরই মধ্যে রাজস্ব ঘাটতি ৭০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বিনিয়োগের জন্য অপরিহার্য জ্বালানি। যুদ্ধের কারণে তার সংকট বেড়েছে। কেউ এই পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ আসবেন না। এ ছাড়া পুরোনো শিল্পকারখানাগুলো কাঁচামালের সংকটে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক–কোনোটিই লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আদায় করা সম্ভব হবে না। অর্থনীতির সূত্রে এটা নিশ্চিত করে বলা যায়, এমন পরিস্থিতিতে রাজস্ব ঘাটতি বাড়বে। সরকারের বিকল্প কোনো উপায়ে আয় বাড়ানোর চিন্তা করতে হবে। না হলে সরকারের অনেক প্রয়োজনীয় খরচ চালিয়ে নেওয়া কঠিন হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পরিসংখ্যান বিভাগের সর্বশেষ তথ্যানুসারে, চলতি অর্থবছরের গত আট মাসের (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) কোনো মাসেই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। রাজস্ব আদায়ের তিন খাত আমদানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) ও আয়কর–প্রতিটিতে রাজস্ব ঘাটতি বেড়েছে।
চলতি অর্থবছরের গত আট মাসে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। গত আট মাসে রাজস্ব ঘাটতি ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা।
এ সময়ে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি হয়েছে আয়কর খাতে, ৩৩ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। এ খাতে আদায়ের লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা। এ সময়ে আদায় হয়েছে ৮৫ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা।
আমদানি খাতে ১৭ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা ঘাটতি হয়। এ সময়ে এই খাতে ৮৯ হাজার ৭৮ কোটি টাকার লক্ষ্যের বিপরীতে আদায় হয়েছে ৭১ হাজার ৯১২ কোটি টাকা।
গত জুলাই-ফেব্রুয়ারিতে ভ্যাট বা মূসক আদায় হয়েছে ৯৭ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। এ সময়ে এ খাতের লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার ২১৪ কোটি টাকা।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের অন্যতম সম্মাননীয় ফেলো এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, নতুন সরকারকে মার্চ থেকে জুন মাসের মধ্যে প্রায় তিন লাখ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে। প্রতি মাসে গড়ে ৭৫ হাজার কোটি টাকার বেশি আদায় করতে হবে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে রাজস্ব ঘাটতি বাড়বে।
সম্প্রতি এক বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘আমরা দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত অর্থনীতি খুবই খারাপ অবস্থায় ছিল। ব্যাংক খাত খুবই খারাপ অবস্থায় আছে, শেয়ারবাজারও দুর্বল, কর-জিডিপি অনুপাতও কঠিন অবস্থায় রয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। যুদ্ধ হচ্ছে অন্য জায়গায়, এর প্রভাব আমরা ভোগ করছি।’
এনবিআর চেয়ারম্যান ড. আবদুর রহমান খান খবরের কাগজকে বলেন, এনবিআর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চেষ্টা করছে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে। তবে অস্বীকার করার উপায়ন নেই যে যুদ্ধকালীন প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতে।
সম্প্রতি এক বেঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘পতিত সরকার অর্থনীতিকে একটি দুর্বল অবস্থায় রেখে গেছে। এখন অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিনিয়োগ বাড়লে উৎপাদন বাড়বে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে।’
তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অনেক হিসাব পাল্টে দিয়েছে। সরকার বিকল্প উপায়ে জ্বালানি সংগ্রহ করার চেষ্টা করছে। বিনিয়োগের পরিবেশ বজায় রাখতেও কাজ করছে।’