ঢাকা ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
ভয়ভীতি দেখিয়ে নারী-শিশুদের বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে বিএসএফ: ভারতের মানবাধিকার সংগঠন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত ভারত আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করে পুশইন করছে: জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল আবারও এশিয়ার শীর্ষ ধনী গৌতম আদানি হবিগঞ্জে বজ্রপাতে ৩ জনের মৃত্যু, আহত ৩ নিয়মের তোয়াক্কা নেই, সড়কে বেপরোয়া ডিএসসিসির ডাম্পট্রাক চার দিনের সফরে বেইজিং গেছেন তথ্যমন্ত্রী কক্সবাজারে মানবপাচার চক্রের মূলহোতা ছৈয়দুল হক আটক ডিক্যাব ও বাংলাদেশ চীন আপন মিডিয়া ক্লাবের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই শরীয়তপুরে মব করে প্রধান শিক্ষকের ওপর হামলা এনসিটিবিসহ চার শিক্ষা বোর্ডে নতুন নেতৃত্ব স্বপ্নে গান শোনা আসলে কীসের ইঙ্গিত? ব্যস্ত সড়কে প্রকাশ্যে ছিনতাই, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জেট ফুয়েলের দাম লিটারে কমল ১৫ টাকা চমেক হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স চালক-এনসিপি কর্মীদের মারামারি গ্রীন চট্টগ্রাম গড়তে লাগানো হচ্ছে ১০ লাখ গাছ চসিকের সড়ক ও ফুটপাত থেকে দেড় শতাধিক ভাসমান দোকান উচ্ছেদ মনপুরায় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান লেখা নিয়ে উত্তেজনা জ্বালানির মজুদ সম্প্রসারণ, আমদানির উৎস বহুমুখীকরণসহ ১২ দফা সুপারিশ সংসদীয় কমিটির ঢামেক ও চমেকে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি, ৬ দফা দাবি ভোলায় মিতু হত্যাকাণ্ডে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক, ওসিকে তলব বিসিবির সভাপতি তামিম ইকবাল কুমিল্লায়  ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল থেকে ৪৫ জন আটক; ৫ বাস-মাইক্রো জব্দ গোয়েন্দারা কেন প্রকাশ্যে আসছেন? শিশুদের নাটক ‘ডাকাত হালুম চিৎপটাং’ মেট্রো স্টেশনগুলোর নিচে দুরবস্থা জন্মদিনে এল লাকী আখান্দের অপ্রকাশিত গান নূরজাহান ট্র্যাজেডির সমাজতাত্ত্বিক পাঠ কিয়ামতের ময়দানে রাসুল (সা.)-এর পাশে থাকার উপায় সরকারের প্রথম ১০০ দিনে ৬০৫ খুন: টিআইবি
Nagad desktop

ক্ষমতার অপব্যবহার করে কর ফাঁকি দেন ড. ইউনূস

প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:১০ এএম
আপডেট: ১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:২০ এএম
ক্ষমতার অপব্যবহার করে কর ফাঁকি দেন ড. ইউনূস
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

রাজস্ব ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি। রাজস্ব খাতে ধস নেমেছে। অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এ খাতের ভয়াবহ বিপর্যয়ের জন্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্টরা। 

তিনি দেশের প্রথম সরকারপ্রধান যিনি প্রভাব খাটিয়ে আইনে নতুন ধারা যোগ করে রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন। ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে গ্রামীণ টেলিকমের ৬০০ কোটি টাকার বেশি কর ফাঁকির অভিযোগ প্রমাণিত হয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এক টাকাও কর পরিশোধ না করে এই অভিযোগ নিষ্পত্তি করে নিয়েছেন, যা সরাসরি ক্ষমতার অপব্যবহার বলা হচ্ছে। 

তার শাসনামলে রাজস্ব ঘাটতি ও ফাঁকি–দুই-ই বেড়েছে। সংস্কারের অজুহাতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এবং শিল্প খাতে করের বোঝা বাড়িয়েছেন। অথচ রাজস্ব সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বিবেচনা করেননি। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের পরামর্শও আমলে নেননি। 

অন্যদিকে এনবিআরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই এনবিআরকে বিভক্ত করতে গিয়ে সমগ্র রাজস্ব খাতে অস্থিরতা সৃষ্টি করেন। এনবিআর কর্মকর্তারা প্রতিবাদ করায় হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়। আন্দোলনের কারণে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ ছিল, ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ে। শুধু আন্দোলনের কারণে সরকার প্রায় এক লাখ কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। বকেয়া আদায় কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়ে। রাজস্ব ফাঁকি বেড়ে এক লাখ কোটি টাকা হয়। 

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে ৭২ হাজার কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি হয়েছে। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আহরণ ২২ শতাংশ কম। এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, রাজস্ব ঘাটতি মার্চে আরও বেড়েছে। গতকাল পর্যন্ত রাজস্ব ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি। এত বড় অঙ্কের ঘাটতি এর আগে কখনও হয়নি। 

সম্প্রতি সাংবাদিকদের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি এখন নতুন সরকারের কাঁধে। রাজস্ব ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এনবিআরের বাধ্যতামূলক অবসারপ্রাপ্ত সদস্য ড. মো. আবদুর রউফ বলেন, ‘অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে টেকসই সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করতে বলেছিলাম। কিন্তু আইএমএফ-এর দোহাই দিয়ে, অপরিণামদর্শী সংস্কার করতে গিয়ে লেজেগোবরে অবস্থা সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বারবার সাক্ষাৎ করতে চাইলেও তিনি সাক্ষাৎ দেননি। আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠলে, অজ্ঞাত কারণে প্রধান উপদেষ্টা একজন সচিবকে তার পদে বহাল রাখার জন্য পুলিশ, আর্মি, বিজিবি, গোয়েন্দা, দুদকসহ রাষ্ট্রের সকল শক্তি নিয়োজিত করেন। একটা সহজ বিষয়কে অদূরদর্শিতার সঙ্গে হ্যান্ডলিং করে জটিল করা হয়েছে। নির্বাচিত সরকার বিষয়টি সঠিকভাবে অনুধাবন করেছে। আমরা যা চেয়েছিলাম নির্বাচিত সরকার ঠিক সে দিকেই এগুচ্ছে। এখন ওই ধরনের হঠকারিমূলক সংস্কার কর্মসূচি বাদ দিয়ে, দেশীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে অংশীজনদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে সমঝোতামূলক সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ ছাড়া রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো আরেক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, ‘ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচার, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে রাজস্ব খাতে ধস নামে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে অনুরোধ জানাই। অন্যদিকে ড. ইউনূস প্রভাব খাটিয়ে নোবেল পুরস্কারের আয় করমুক্ত করেছেন। গ্রামীণ টেলিকমের ৬০০ কোটি টাকা আয়কর মওকুফ করে নিয়েছেন।’

রাজস্ব আইনে নতুন করে যোগ করা হয়, ‘কোনো ব্যক্তি কর্তৃক গৃহীত নোবেল, র‌্যামন ম্যাগসাইসাই, বুকার, পুলিৎজার, সিমন বলিভার, অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস, গ্র্যামি, এমি, গোল্ডেন গ্লোব, কান চলচ্চিত্র উৎসবের পুরস্কারসহ বিভিন্ন ধরনের পুরস্কার থেকে অর্জিত আয় করমুক্ত সুবিধা পাবে।’ 

সূত্র জানায়, বাংলাদেশের একমাত্র ব্যক্তি অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি ২০২৫ সালে রাজা তৃতীয় চার্লস হারমনি পুরস্কার, ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম, ১৯৮৪ সালে র‌্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার এবং ১৯৮৭ সালে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারসহ ১৪৫টির বেশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেন। 

প্রতিবছর নোবেল পুরস্কার হিসেবে পুরস্কারপ্রাপ্তদের প্রত্যেককে একটি স্বর্ণ পদক, একটি সনদ এবং নোবেল ফাউন্ডেশন কর্তৃক উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ দেওয়া হয়। ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এই পুরস্কারের অর্থমূল্য ১০ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার। বাংলাদেশি টাকায় এর পরিমাণ সেই সময়ে প্রায় ১০ কোটি টাকার (১.৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) সমান ছিল। অন্যদিকে র‌্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার বিজয়ী ব্যক্তি বা সংস্থাকে পুরস্কার হিসেবে একটি মেডেল, সনদপত্র এবং ৫০ হাজার মার্কিন ডলার নগদ অর্থ দেওয়া হয়। 

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহম্মদ আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, চলতি বাজেটে অনেক ধরনের পুরস্কারে কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এসব সাধারণ মানুষের পুরস্কার না। এসব একটি দেশের খুব কম মানুষ পেয়ে থাকেন। হঠাৎ করে চলতি বাজেটে বিশেষ কাউকে ছাড় দিতে কর মওকুফ দেওয়া হয়ে থাকলে অবশ্যই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একটি দেশের জাতীয় বাজেটে কোনো ব্যক্তিবিশেষকে সুবিধা দিতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া ঠিক না।
 
তিনি আরও বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ টেলিকমের ৬০০ কোটি টাকা আয়কর মওকুফের প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আয়কর আইনে আয়কর মওকুফের যেসব পরিধি ও ক্ষেত্র রয়েছে তা উপেক্ষা করে ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই বিরাট অঙ্কের আয়কর মওকুফ করিয়ে নেন। এ ধরনের আয়কর মওকুফের ঘটনা বিরল। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থমন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান দুই বছর আইসিএমএবি-এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে এনবিআরের বাজেট প্রস্তুতিতে অংশগ্রহণ করেন। সে সময়ে তিনি নোবেল পুরস্কার করমুক্ত করার সুপারিশ করেননি। ২০২৪-২৫ সালে এসে সরকার প্রধান হিসেবে ড. ইউনূস প্রভাব খাটিয়ে আবদুর রহমানকে দিয়ে নোবেল পুরস্কার করমুক্ত করেন। 

এনবিআরের সাবেক সদস্য (অন্তর্বর্তী সরকার বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠান) আলমগীর হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, আন্দোলন চলাকালে এনবিআর কর্মকর্তা কর্মচারীরা সাবেক সরকার প্রধান ড. ইউনূসের হস্তক্ষেপ চেয়েছিল। তিনি সহযোগিতা করেননি। বরং উল্টো কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। এতে এনবিআরে চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। রাজস্ব আহরণে ধস নামার এটা প্রধান কারণ।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরই রাজস্ব খাতের সংস্কারে চার সদস্যের কমিটি গঠন করে। এই কমিটির সদস্য এনবিআরের সাবেক সদস্য ফরিদ উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, সংস্কার কমিটির বেশির ভাগ সুপারিশ আমলে না নিয়ে আইএমএফের সুপারিশের অজুহাত দেখিয়ে রাজস্ব খাতে সংস্কারের কথা বলে এনবিআর বিভক্তি করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। কারও সঙ্গে কোন আলোচনা ছাড়াই এ উদ্যোগ নেওয়ায় সমগ্র রাজস্ব খাতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর আগে কখনো কোনো সরকারপ্রধান নিজের জন্য আইন করে রাজস্ব পরিশোধ করে নেয়নি। 

অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ১২ মে ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ-২০২৫’ জারি করে। বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গঠিত জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি অন্তর্বর্তী সরকারের যেসব অধ্যাদেশ এখনই সংসদে বিল আকারে না তোলার সুপারিশ করেছে, তার মধ্যে রয়েছে ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ-২০২৫’। সংসদে না তুললে এটি কার্যকারিতা হারাবে। ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারিকে কেন্দ্র করে প্রশাসনে তীব্র আইনি ও সাংবিধানিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। প্রক্রিয়ায় বাধ্যতামূলক প্রশাসনিক ধাপ এড়িয়ে যাওয়া, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আপত্তি উপেক্ষা, সচিব কমিটির সুপারিশ ছাড়াই অনুমোদন নেওয়া এবং জনপ্রশাসন ও অর্থ বিভাগকে বাইপাস করার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। 

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্র জানায়, ড ইউনূসের মালিকানাধীন গ্রামীণ টেলিকমের বিরুদ্ধে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা অবৈধভাবে সহযোগী প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর, শ্রমিক-কর্মচারীদের লভ্যাংশের টাকা লোপাট, কল্যাণ তহবিলের অর্থ বরাদ্দ না করে আত্মসাতের মতো অভিযোগ ছিল। 

ড. মুহাম্মদ ইউনূস দারিদ্র্য দূর করার জন্য বিদেশ থেকে পাওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রামীণ ব্যাংকের তহবিল থেকে নিজের তহবিলে সরিয়ে নিয়েছেন এমন অভিযোগ করে নরওয়ের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন। সেই টেলিভিশনে প্রচারিত একটি প্রামাণ্যচিত্রে তথ্য-উপাত্তসহ বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, দারিদ্র্য দূর করার জন্য ভর্তুকি হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংককে ইউরোপের দেওয়া কোটি কোটি ডলার নিজের অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের তহবিলে সরিয়ে নিয়েছেন ড. ইউনূস। 

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরই শতাধিক পণ্য ও সেবার ওপর নতুন করে ভ্যাট আরোপ করে। এর পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ করের প্রভাবে বাজারে অনেক জিনিসপত্রের দাম আরও বেড়ে যায়। আর এতে বিপাকে পড়েন সাধারণ মানুষ। সাবেক সরকারের এই পদক্ষেপের কারণে ব্যবসার খরচও বাড়ে। 

তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান (বাবু) খবরের কাগজকে বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা ড. ইউনূসের কাছে সমস্যার কথা বলার জন্য বারবার সময় চেয়ে আবেদন করলেও তিনি সময় দেননি। আজকে বিনিয়োগে ধস নামার অন্যতম কারণ সরকারপ্রধান আমাদের সঙ্গে আলোচনা না করে বিভিন্ন স্বেচ্ছাচারমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বাস্তবায়ন করেছেন। রাজস্ব খাতে ধ্বংস হয়েছে। আমরা এর বিচার চাই।’

কষ্টকর হবে জীবন, সব জিনিসের দাম বাড়বে

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ১২:৪৬ পিএম
কষ্টকর হবে জীবন, সব জিনিসের দাম বাড়বে
ছবি: এআই

আগামী অর্থবছরের বাজেটে শুল্ক-কর-ভ্যাটের মারপ্যাঁচে চাল, ডালসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্য থেকে পাউরুটি, চিপস, বিস্কুট ও জুসের মতো খাবারের দাম বাড়বে। চিকিৎসা ও যাতায়াতের খরচ বাড়বে। শিক্ষা উপকরণের দাম বাড়বে। আমদানি করা মোবাইল, ল্যাপটপ ও কম্পিউটার এবং এসব পণ্যের যন্ত্রাংশের দাম বাড়বে। দেশি পোশাকের দাম বাড়বে। ঠিকাদার ব্যবসায়ের লাইসেন্স ফি বাড়বে। জোরালো আবেদন সত্ত্বেও আগামীবারও কমবে না মোবাইল ফোন ব্যবহারের খরচ।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এসব জানা যায়। 

সূত্র আরও জানায়, বাজেটে চাল, ডাল, চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি পর্যায়ে উৎসে কর কিছুটা কমিয়ে বহাল থাকছে। আমদানিকারকরা এই বহাল থাকা করের অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়িয়ে রাখার সুযোগ পেতে পারেন।

আগামী বাজেটে তামাক পণ্যের দাম বাড়বে। কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক বাড়ানোয় দেশে উৎপাদিত ঘড়ি ও চশমার দাম বাড়বে। অন্যদিকে সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোয় বিদেশি ঘড়ি ও চশমার দামও বাড়বে। বিদেশি ব্র্যান্ড ও নন ব্র্যান্ড সব ধরনের প্রসাধনীর দাম বাড়বে। আমদানি করা গুঁড়া দুধ, মাছ ও শুকনা ফলের দাম বাড়বে। 

ব্যবসায়ীরা দাম কমানোর জোরালো আবেদন করলেও কমছে না মাছ ও পোলট্রি ফিডের দাম। মানবিক বিবেচনায় কিডনি ডায়ালাইসিসের খরচ কমানোর পরামর্শ দিলেও আমলে আনা হচ্ছে না। কাঁচামাল আমদানিতে ছাড় না দেওয়ায় কমছে না ওষুধের দাম। জমি রেজিস্ট্রির খরচ কমানো হচ্ছে না।  

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অর্থ সংকটে নিয়মিত খরচ চালিয়ে যাওয়াও সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় মিটাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ আগামী বাজেটে খরচ কমানোর প্রত্যাশা করলেও তা বাস্তবায়ন হবে না। বরং বাজেটে সরকার আয় বাড়াতে গিয়ে আগামী অর্থবছরের বাজেটে অনেক জিনিসপত্রের দাম বাড়াচ্ছে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প খাতে খরচ বাড়বে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, এরই মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে বাড়বে মূল্যস্ফীতি। অন্যদিকে নতুন অর্থবছরে এক লাখ কোটি টাকার বেশি  ভ্যাটের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। অন্য সব বাদ দিয়ে শুধু এই দুই কারণেই  অনেক কিছুর দাম ও খরচ বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এ সব কিছুই জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে ফেলবে। 

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, আওতা বাড়িয়ে সরকার আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। অনেক নতুন খাত অর্থনীতির মূল ধারায় যুক্ত করা হচ্ছে। এতে সরকারের আয় বাড়বে বলে আশা করছি।  

বাজেট প্রণয়নকালেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে দেশি কম্পিউটার শিল্পের বাজার সম্প্রসারণে দেশে কম্পিউটার সংযোজন ও খুচরা যন্ত্রাংশ উৎপাদনে রাজস্ব ছাড়ের সর্বোচ্চ সুবিধা দেওয়ার জন্য আবেদন করে। আগামী বাজেটে কম্পিউটার সংযোজনকারী শিল্প এবং কম্পিউটার আমদানি নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। বাজেট প্রস্তাব চূড়ান্ত হলে আমদানিকৃত কম্পিউটার ও ল্যাপটপের দাম বাড়বে। 

সূত্র জানায়, মোটরসাইকেল উৎপাদনে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিদ্যমান রাজস্ব বহাল থাকলেও উচ্চ সিসির সম্পূর্ণ মোটরসাইকেল আমদানিতে শুল্ক হার বাড়বে। এতে আমদানি করা বেশি সিসির মোটরসাইকেলের দাম বাড়বে। অন্যদিকে আসন্ন বাজেটে আমদানিকৃত প্লাস্টিক পণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। পার্লারের খরচ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহনে চলাচল খরচও আসন্ন বাজেটে বেশি থাকবে। 

সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর ফলে আসন্ন বাজেটে অটোরিকশার যন্ত্রাংশ আমদানিতে খরচ বাড়বে। এতে অটোরিকশা বানাতে খরচ বাড়বে। ফলে অটোরিকশার দাম বাড়বে।  

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সদস্য প্রায় ৩০ লাখ। এনবিআর থেকে এসব দোকানের তালিকা নিয়ে ভ্যাটের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব দোকানের মধ্যে লক্ষাধিক হস্ত ও কুটির শিল্পের দোকান আছে। এসব দোকানের বেশির ভাগই এসএমই খাতের (ক্ষুদ্র ও মাঝারি। আগামী বাজেটে ছোট দোকানের ওপর বছরে এক হাজার টাকা করে ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।  

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ছোট ছোট দোকান সাধারণত পাড়া-মহল্লা ও গ্রামে থাকে। এসব দোকানের আয় দিয়ে দোকান-মালিক সংসারের খরচ চালান। এসব লোকের বেশির ভাগই অল্প আয়ের মানুষ। এখান থেকে যারা কেনাকাটা করেন তারাও ধনী ব্যক্তি না। এসব দোকানকে ভ্যাটের আওতায় আনা হলে দোকান-মালিকের ওপর চাপ হয়ে যাবে। অনেক দোকান জিনিসপত্রের দামও বাড়াবে।

আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণের বদলে আরও উসকে দেবে বলে মনে করছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, গণমাধ্যমে দেখেছি আগামী বাজেটের আকার ৯ লাখ কোটি টাকার বেশি হবে। এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের আয় বাড়াতে হবে। এনবিআরের রাজস্বের আওতা ও লক্ষ্যমাত্রা বাড়াতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে নতুন করে শুল্ক-কর-ভ্যাট আরোপ করতে হবে। এতে অনেক পণ্যের দাম বাড়বে। সেবা খাতের  খরচ বাড়বে। যা জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াবে। এখনই সাধারণ মানুষ খরচের চাপে আছে। আরও খরচ বাড়লে বিপাকে পড়বে।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে স্টেডিয়ামের খেলা ও থিয়েটারে নাটক দেখতে হলে এখনকার চেয়ে বেশি দাম দিয়ে টিকিট কাটতে হবে।

আসন্ন অর্থবছরের বাজেটে ভারতসহ অনেক দেশ থেকে তুলা আমদানিতে খরচ বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানিতে বিশেষ ছাড় থাকবে। তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা কম দামে তুলা আমদানির পক্ষে। তাদের বেশির ভাগই ভারত থেকে কম দামে তুলা আমদানি করতে চায়। অন্যদিকে টেক্সটাইল খাতের ব্যবসায়ীরা ভারত থেকে তুলা আনার বিপক্ষে। তারা দেশে উৎপাদিত তুলা ব্যবহারের পক্ষে। তবে সরকার পড়েছে খানিকটা বেকায়দায়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি বাড়ানোর শর্ত রয়েছে। তাই আগামী বাজেটে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানিতে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে।

শুল্ককরের মারপ্যাঁচে আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার পরই মোবাইল ফোনের সামগ্রী বেশি দামে আমদানি করতে হবে। মোবাইল ফোন মেরামতে খরচ বাড়বে। একই সঙ্গে আমদানি করা মোবাইলের দামও বাড়বে। একইভাবে কম্পিউটার যন্ত্রাংশ আমদানিতে খরচ বাড়বে। এতে কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের গুনতে হবে বাড়তি টাকা।

আগামী বাজেটে দেশে শিল্প খাতে ব্যবহৃত অনেক কাঁচামালের আমদানি নিরুৎসাহিত করা হবে। বিশেষভাবে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি, লোহার রড, স্ক্র্যাব, টেক্সটাইল, চামড়া খাত, পাটশিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হবে। দেশি গরুর দুধ, মসলা ও দেশি শিল্পে বানানো খেলনার দাম বাড়বে না।

অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আগামী অর্থবছরের বাজেটে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, সফটওয়্যার বা অ্যাপ্লিকেশন কাস্টমাইজেশন, এনটিটিএন, ডিজিটাল কনটেন্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট, ডিজিটাল অ্যানিমেশন ডেভেলপমেন্ট, ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্ট, ওয়েবসাইট সার্ভিস, ওয়েব লিস্টিং, আইটি প্রসেস আউটসোর্সিং, ওয়েবসাইট হোস্টিং, ডিজিটাল গ্রাফিক্স ডিজাইন, ডিজিটাল ডেটা এন্ট্রি অ্যান্ড প্রসেসিং, ডিজিটাল ডেটা অ্যানালেটিক্স, জিওগ্রাফিক্স ইনফরমেশন সার্ভিসেস, আইটি সাপোর্ট অ্যান্ড সফটওয়্যার মেইনটেন্যান্স সার্ভিস, সফটওয়্যার ল্যাব টেস্ট সার্ভিস, কল সেন্টার সার্ভিস খাতে খরচ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হবে। একইভাবে ওভারসিজ মেডিকেল ট্রান্সক্রিপশন্স সার্ভিস, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন সার্ভিস, ডকুমেন্ট কনভারশন, রোবোটিক্স প্রসেস আউটসোর্সিং এবং সাইবার সিকিউরিটি সার্ভিস খাতেও খরচ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হবে। সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থমন্ত্রীসহ এনবিআর বাজেট প্রস্তুত কমিটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এসব খাতের ওপর কোনো ধরনের রাজস্ব আরোপ না করার নির্দেশ দেন। ফলে আগামী বাজেটে বাড়ছে না এসব খাতের খরচ।  

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্ষমতা বাড়াতে সুপরিকল্পিত বাজেটের তাগিদ

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ০৯:২৯ এএম
আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬, ০৯:৩০ এএম
সক্ষমতা বাড়াতে সুপরিকল্পিত বাজেটের তাগিদ
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের অধিকাংশ দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পেশাগত দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের মাধ্যমে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও ক্রমবর্ধমান সেই উন্নয়নের গতিতে এগিয়ে চলেছে। যদিও চব্বিশের অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক সহিংস ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবকাঠামোগত যে বিপর্যয় ঘটেছে, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে মারাত্মক বেগ পেতে হচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। 

তবু যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার স্বার্থে বাংলাদেশ পুলিশ, বিজিবি, কোস্টগার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট খাতের আরও আধুনিকায়ন জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। এ জন্য তারা আগামী জাতীয় বাজেটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা ও উন্নয়নে সময়োপযোগী ও সুপরিকল্পিতভাবে অর্থ বরাদ্দেরও তাগিদ দিচ্ছেন। 

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুটি বিভাগের (জননিরাপত্তা ও সুরক্ষা সেবা) জন্য ৩১ হাজার ৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই দুটি বিভাগের জন্য উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা, যার মধ্যে জননিরাপত্তায় ১ হাজার ২২৪ কোটি টাকা ও সুরক্ষা সেবায় ১ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকা। যদিও ওই দুটি বিভাগ পরে একীভূত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিচালিত হয়ে আসছে। তার আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জননিরাপত্তা ও সুরক্ষা সেবা বিভাগের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট ছিল ৩১ হাজার ১২ কোটি টাকা, যা সংশোধিত বাজেটে দাঁড়িয়েছিল ২৯ হাজার ৩৩১ কোটি টাকায়।

এ প্রসঙ্গে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক মুহাম্মদ নুরুল হুদা গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘দেশের পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে আইনশৃঙ্খলা খাতের জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। যদিও বাস্তবতায় আমাদের দেশের রাজস্ব কম, সম্পদের স্বল্পতা রয়েছে–তার পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে বাজেটে বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ানো উচিত। কারণ জনগণের জানমালের বা সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই সঙ্গে চাহিদা বৃদ্ধির বিষয়টিও ক্রমবর্ধমান। সব মিলিয়ে আগামী বাজেটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য সরকার বিশেষ নজর দেবে–এমনটাই প্রত্যাশা করি।’

গত ৩০ মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদ অধিবেশনে এক বক্তব্যে পুলিশের জন্য তথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রস্তাব করে কিছু আলোচনা তুলে ধরেন। এতে বাস্তবতা, সীমাবদ্ধতা এবং সরকারের সদিচ্ছার বিষয়টি সংসদে উপস্থাপন করেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

আইনশৃঙ্খলা খাতের সংশ্লিষ্টরা বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা খাতের সবচেয়ে বড় অংশীজন হচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ, যারা দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখাসহ সামাজিক শৃঙ্খলা-নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালন করে থাকে। প্রায় সোয়া দুই লাখ সদস্যের বাংলাদেশ পুলিশের দায়িত্ব পালন এবং অবকাঠামোগত বিষয়ে এখনো মারাত্মক সংকট রয়ে গেছে। বিশেষ করে পুলিশের কনস্টেবল থেকে শুরু করে উপ-পরিদর্শক (এসআই) পর্যায়ে সুযোগ-সুবিধা, যানবাহন, বাসস্থান, প্রশিক্ষণ ও আধুনিক সুবিধাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। এর বাইরে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি, র‌্যাব, আনসার ভিডিপি, কোস্টগার্ড ছাড়াও কারাগার, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ এই খাতের সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক খবরের কাগজকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা খাত একটি রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ খাতের আধুনিকায়ন, প্রশিক্ষণসহ কাজের ধারাগুলো চলমান বা গতিশীল প্রক্রিয়া। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য সব সময় সময়োপযোগী আর্থিক বাজেট হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি কোন কোন বিষয়ে কেমন অর্থ লাগবে, সেটিও সুনির্দিষ্টকরণের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা উচিত। যেহেতু আধুনিক দেশগুলো নানা প্রযুক্তি-সরঞ্জামের মাধ্যমে এই ধরনের বাহিনীগুলোকে এগিয়ে নিচ্ছে, সে ক্ষেত্রে আমাদেরও উচিত সে রকম বাস্তবসম্মত বাজেট প্রণয়ন করা।’

গ্রাহকের ব্যানারে আন্দোলনে ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তারা

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ০৮:৫৭ এএম
আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬, ০৯:১২ এএম
গ্রাহকের ব্যানারে আন্দোলনে ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তারা
‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে গ্রাহক পরিচয়ে আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তারা। (বাঁ থেকে) ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে আঙুল উঁচিয়ে কথা বলছেন এক কর্মকর্তা, ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে আন্দোলন করছেন ব্যাংকটির কর্মকর্তা মো. আকমাম হোসাইন এবং কর্মকর্তা আবুল আজাদ। ছবি: খবরের কাগজ

বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তারা ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে গ্রাহক পরিচয়ে আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে কেউ প্রকাশ্য কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন, আবার কেউ আন্দোলনকারীদের গোপনে সমর্থন দিচ্ছেন। এর মধ্য দিয়ে তারা ব্যাংকের চাকরিবিধি, মানবসম্পদ নীতিমালা এবং পেশাগত আচরণবিষয়ক নির্দেশনা লঙ্ঘন করছেন। ইসলামী ব্যাংকের সর্বশেষ সার্কুলারে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব বজায় রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়। তা না মানলে উপযুক্ত শাস্তির আওতায় আনার বিষয়েও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

ব্যাংকটির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, সচেতন গ্রাহকের ফোরামের সঙ্গে ব্যাংকটির অনেক কর্মকর্তাও আন্দোলনে নেমেছেন। কেউ কেউ আন্দোলনকারীদের গোপনে সমর্থন দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ প্রকাশ্যে এসেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ ধরনের কিছু ভিডিও ভাসছে। প্রকাশ্যে আন্দোলনে নেমেছেন ব্যাংকটির কর্মকর্তা আবুল আজাদ, মোহাম্মদ আকমাম হোসাইন, সিবিএ নেতা আনিসুর  রহমানসহ অনেকেই। একটি ছবিতে দেখা যায়, ‘ইসলামী ব্যাংকের আঙিনায় খুরশীদের ঠাঁই নাই।’ এ রকম একটি ফেস্টুন নিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সড়কে দাঁড়িয়েছেন চকমোগলটুলি শাখার সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার আবুল আজাদ। 

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। তার নিয়োগ বাতিলের দাবিতে সচেতন গ্রাহক ফোরাম আন্দোলনে নেমেছে। আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড রুমে তালা দিয়েছেন কিছু কর্মকর্তা। আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে তালা দেওয়ার কথা উল্লেখ করে শরীরে একবিন্দু রক্ত থাকা পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় যত শক্তি ব্যবহার করুক না কেন? জীবনবাজি রেখে তা পাহারা দেওয়ার ঘোষণা দেন। 

ব্যাংকটির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে খবরের কাগজকে জানান, তালা দেওয়ার ঘটনাটি ঘটিয়েছেন আবুল আজাদ এবং ব্যাংকটির সিবিএ নেতা ও ইলেকট্রিশিয়ান আনিসুর রহমান।

অপরদিকে সচেতন গ্রাহক ফোরামের সঙ্গে সরাসরি আন্দোলনে দেখা গেছে, ইসলামী ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ করপোরেট শাখার সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মো. আকমাম হোসাইনকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া আরেক ছবিতে দেখা যায়, ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসেনের সঙ্গে আঙুল উঁচিয়ে কথা বলছেন ব্যাংকটির কর্মকর্তা কামরুল হাসান বাবলু। তার পাশে রয়েছেন বিএম আনোয়ারসহ কয়েকজন কর্মকর্তা।

খবরের কাগজের পক্ষ থেকে ফোন করা হলে অভিযোগের বিষয়ে মো. আকমাম হোসাইন কথা বলতে রাজি হননি। আবুল আজাদ এবং আনিসুর রহমানকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

একাধিক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানান, ইসলামী ব্যাংকের ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বরের সার্কুলার লেটার নং: এইচ আর ডব্লিউ/৩০৪৬-তে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব বজায় রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়, এ বিষয়ে ইতোপূর্বে ইস্যুকৃত ইনস্ট্রাকশন সার্কুলার নং এইচ আর ডি/১৩০২, তারিখ ১৯-০২-২০১৩, ইনস্ট্রাকশন সার্কুলার নং এইচ আর ডব্লিউ/১৫৯৬, তারিখ ১০-০৪-২০১৮, ইনস্ট্রাকশন সার্কুলার নং এইচ আর ডি/৮৯৯৭, তারিখ ২৪-০৫-২০১৮, সার্কুলার নং এইচ আর ডি/২০১৪/৫৪৯৭, তারিখ ০৬-০২-২০১৪, সার্কুলার নং এইচ আর ডি/২০১৬/৬৯৮৩, তারিখ ১২-০৫-২০১৬, সার্কুলার নং এইচ আর ডব্লিউ/৮১৫৩, তারিখ ০৫-০৯-২০১৭-এ জারিকৃত সার্কুলারসমূহে ব্যাংকের সব স্তরের নির্বাহী কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সর্বাবস্থায় সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব বজায় রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন–ফেসবুক/টুইটার/ই-মেইল ইত্যাদিতে কোনো প্রকার দলীয় পক্ষপাতমূলক বা বিতর্কিত মন্তব্য প্রদান বা প্রচার করা থেকে বিরত থাকার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। 

এ বিষয়ে ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতিমালার অধ্যায় ৬-এ অন্তর্ভুক্ত ‘জেনারেল কনডাক্ট অ্যান্ড ডিসিপ্লিন পলিসি’র ৩ নং ধারা, শিরোনাম ‘রাজনীতি, নির্বাচন ইত্যাদিতে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা’-এর প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। যাতে বলা হয়, কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী সরাসরি কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করবেন না। তবে ভোট দিতে পারবেন। কোনো উপদলীয় মতবাদ প্রচার করবেন না অথবা এ রকম কোনো উপদলীয় বিতর্কে অংশ নেবেন না অথবা উপদলীয় কোনো স্বজনপ্রীতিতে আসক্ত হবেন না, যেটা দায়িত্ব পালনে তার নিষ্ঠাকে ব্যাহত করবে অথবা ব্যাংকের প্রশাসনকে অস্বস্তিতে ফেলে দেবে অথবা ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাধারণ মানুষের ভেতরে অসন্তোষ ও ক্ষোভ সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকবে। সংকীর্ণতা, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ এবং ইচ্ছাকৃতভাবে অফিসের অপব্যবহার করা যাবে না। ব্যাংকের সর্বস্তরের নির্বাহী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যেকোনো পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়া বা সাম্প্রদায়িক বিরোধে অংশগ্রহণ করা থেকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। নির্দেশনার কোনো ব্যত্যয় ঘটলে তা ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতিমালা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে বলে উল্লেখ করা হয়। সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট এ কে এম কাওছার আলম এবং অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. এম কামাল উদ্দীন জসিম স্বাক্ষরিত সার্কুলারে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়। 

একাধিক ব্যাংকার খবরের কাগজকে জানান, দেশের প্রাইভেট ব্যাংকগুলো যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত এবং নির্দেশনা মেনে চলছে, সেখানে ইসলামী ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা গ্রাহক সেজে আন্দোলনে নেমেছেন–এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও ব্যাংক তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ব্যাংকটির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. কামাল উদ্দিন জসিমের মোবাইলে ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসেনও ফোন রিসিভ করেননি।

যত আক্রোশ মুক্তিযুদ্ধে

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ০৮:০৯ এএম
যত আক্রোশ মুক্তিযুদ্ধে
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের স্বাধীনতার অন্যতম স্মারক, ঐতিহাসিক স্বাধীনতা জাদুঘর এখন এক পরিত্যক্ত ধ্বংসস্তূপ। যে ভূগর্ভস্থ জাদুঘরে একসময়ে ৭ মার্চের ভাষণ, মুক্তিযুদ্ধের ২৬ হাজার ঘটনার আলোকচিত্র, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের রেপ্লিকা, ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত বাঙালি জাতির সংগ্রামের ইতিহাস সাজানো ছিল–সেই জাদুঘর এখন পোড়া গন্ধ, ভাঙা কাচ আর অন্ধকারে ডুবে থাকা এক নীরব ধ্বংসাবশেষ। জাদুঘরটির পোড়া দেয়াল আর ভাঙা কাচের নিচে চাপা পড়ে আছে একটি জাতির স্মৃতি, ইতিহাস, গর্ব, আভিজাত্য-অহংকার।

  • ৪৭ মাস ধরে তালাবদ্ধ স্বাধীনতা জাদুঘর, সংস্কারে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা
  • এই জাদুঘরটি বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ও পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক স্থানের নিচেই ধ্বংসস্তূপ; ৬৭ একর জায়গায় প্রকল্পটিতে রাষ্ট্রের ব্যয় ছিল প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা 
  • রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি ৫-১০ কোটি টাকা, পূর্ণাঙ্গ সংস্কারে সম্ভাব্য ব্যয় ২০ কোটি টাকারও বেশি
  • ‘জুলাই আন্দোলনকে সমর্থন করেছি, কিন্তু ইতিহাসের ওপর এ ধরনের ধ্বংস মেনে নিতে পারিনি। মনে হয়েছে হামলাকারীদের যত রাগ মুক্তিযুদ্ধের ওপর’: দর্শনার্থী

২০২৪ সালের ৫ আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নজিরবিহীন হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এই জাদুঘরের কোনো ছবি, ভাস্কর্য কিংবা নিদর্শন অক্ষত নেই বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অথচ ঘটনার ৪৭ মাস পেরিয়ে গেলেও জাদুঘরটি সংস্কারের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই, একটিমাত্র মামলার অগ্রগতিও থমকে আছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি বরাদ্দ ও সিদ্ধান্ত ছাড়া জাদুঘরটি পুনরায় সংস্কার ও চালু করা সম্ভব নয়। ফলে বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস ধারণ করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনার ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে–এই স্মৃতিস্মারক রক্ষায় বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সিদ্ধান্তের ওপর।

রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের যে স্থানটিতে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ জাতির উদ্দেশে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ১৬ ডিসেম্বর যেখানে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল, ঠিক সেই ইতিহাসের কেন্দ্রস্থলেই নির্মিত হয়েছিল স্বাধীনতা জাদুঘর।

২০১৫ সালের ২৫ মার্চ উদ্বোধন হওয়া এই জাদুঘর ছিল দেশের প্রথম ভূগর্ভস্থ জাদুঘর। প্রায় ৬৭ একর এলাকাজুড়ে নির্মিত পুরো প্রকল্পের ব্যয় ছিল প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা। জাদুঘরটিকে অনেকেই বলতেন বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস জানার ‘ওয়ান স্টপ সেন্টার’। কারণ এখানে মুঘল আমল থেকে ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, ৭ মার্চের ভাষণ, গণহত্যা, শরণার্থী জীবন, সেক্টর কমান্ডারদের যুদ্ধ, আত্মসমর্পণ–সবকিছুর ধারাবাহিক উপস্থাপন করা ছিল।

এই জাদুঘরে ছিল ‘স্বাধীনতা স্তম্ভ’, ‘শিখা চিরন্তন’, জলাধার, ম্যুরাল, মিলনায়তন এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রদর্শনী গ্যালারি। এসব গ্যালারিতে একাত্তরের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের প্রায় ২৬ হাজার ঘটনার আলোকচিত্র প্রদর্শিত ছিল। এর মধ্যে ১৪৪টি কাচের প্যানেলে ছিল তিন শতাধিক ঐতিহাসিক আলোকচিত্র। আরও ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিদেশি সংবাদপত্রের কাটিং, পোস্টার, টেরাকোটা ম্যুরাল, যুদ্ধের নিদর্শন এবং আত্মসমর্পণের টেবিলের প্রতিকৃতি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেই গ্যালারিগুলো অন্ধকারাচ্ছন্ন, জাদুঘরটির পরতে পরতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ৫ আগস্টের ধ্বংসযজ্ঞের ভাঙা পোড়া স্মৃতিচিহ্ন।

৫ আগস্ট ২০২৪: হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ

জাদুঘর কর্তৃপক্ষ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের দিন বিকেলে স্বাধীনতা জাদুঘরে সংঘবদ্ধভাবে পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়। গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। 

এ বিষয়ে স্বাধীনতা জাদুঘরের পরিচালক মো. গোলাম কাউছার খবরের কাগজকে বলেন, ‘এখানকার গ্যালারিগুলোতে থাকা কোনো নিদর্শনই অক্ষত নেই। প্রদর্শিত আলোকচিত্রগুলোর ডিসপ্লে, টিভি মনিটর, সাউন্ড সিস্টেম, চেয়ার, ফ্যান, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, এমনকি পানির পাম্প, বিদ্যুতের তার পর্যন্ত খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জাদুঘরের ভেতর একটি নিদর্শনও আগের জায়গায় নেই। জাদুঘরটির বাইরে থাকা প্রাচীরে স্থাপিত ঐতিহাসিক ভাস্কর্যগুলোও ভেঙে ফেলা হয়েছে। এ ছাড়া ভাঙচুর করা অনেক জিনিসে ভেতর ও বাইরে আগুনে দেওয়া হয়। 

স্বাধীনতা জাদুঘর এলাকায় গিয়ে কথা হয় সেই দিনের ঘটনার সাক্ষী পিডব্লিউডির এক কার্য সহকারীর (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘হামলাকারীরা শুধু ভাঙচুরই করেনি, বরং জাদুঘরের ভেতরে থাকা বিভিন্ন সামগ্রী টেনে বের করে এনে আগুনে পুড়িয়ে দেয়। সেই আগুন জাদুঘরের বিভিন্ন অংশে টানা দুদিন পর্যন্ত জ্বলেছে। তিনি আরও জানান, হামলার সময় তাকে মারধরের চেষ্টাও করা হয়। পরে নিজেকে স্থানীয় লোক পরিচয় দেওয়ার পর রক্ষা পান। সেই সময়ের ভিডিও ফুটেজ রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেছেন।

যত আক্রোশ যেন মুক্তিযুদ্ধের ওপর

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা জাদুঘরের বর্তমান ধ্বংসস্তূপের নীরব সাক্ষী মুক্তিযোদ্ধা মনসুর ঘরামি (৭৫)। একাত্তরে ৯ নম্বর সেক্টরের হেমায়েত বাহিনীর এই যোদ্ধার সার্টিফিকেট নেই। তিনি উদ্যান এলাকায় ভাঙারি কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে জাদুঘরের বর্তমান অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘৭ মার্চের ভাষণ থেইকা মুক্তিযুদ্ধের ছবি, যা কিছু আছিল সব লুট কইরা নিয়া গেছে। সেই দিনের পর থাইকা এটা বন্ধ। আর খোলে নাই।’ কথা বলতে বলতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এই মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ করছি দেশ বাঁচাইতে, টাকার জন্য না। এই রকম বাংলাদেশ তো চাই নাই।’

তার মতো অনেকেই মনে করছেন, হামলাটি শুধু একটি স্থাপনার ওপর ছিল না; এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, ইতিহাস ও প্রতীকগুলোর ওপর আঘাত। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মৌটুসী ইসলাম বলেন, ‘এই জাদুঘরে আমি একবার গিয়েছি। এ দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের সার্বিক চিত্র এর ভেতরে সাজানো ছিল; যা আমাদের জন্য লেসন। অথচ বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস-ঐতিহ্যের ওপর সারা দেশে যে আঘাত ২৪-এ আমরা ঘটতে দেখেছি সেটা অপ্রত্যাশিত। জুলাইকে আমিও সমর্থন করেছি। কিন্তু এ ধরনের ধ্বংস মেনে নিতে পারিনি। আমি আশা করি, বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার স্বাধীনতা জাদুঘরসহ ধ্বংসের শিকার জাদুঘরগুলো সংস্কার করে আবার চালু করার উদ্যোগ নেবে।’

স্বাধীনতা জাদুঘর এলাকায় দীর্ঘদিন যাতায়াতকারী বেসরকারি চাকরিজীবী মোবাশ্বের আলম (৫৬) বলেন, ‘বিগত দিনে কত আন্দোলন-সংগ্রাম দেখেছি। সরকার বদল হতেও দেখেছি। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে এ দেশের জন্মের ইতিহাস-ঐতিহ্যের ওপর যে ধরনের আঘাত ও ধ্বংসলীলা চালানো হয়েছে; সে ধরনের ঘটনা আগে আমরা দেখিনি। মনে হয়েছে হামলাকারীদের যত রাগ মুক্তিযুদ্ধের ওপর! এ ধরনের সন্ত্রাসী সব কর্মকাণ্ড দমনে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ মনে করছি। বর্তমান সরকারের কাছে আমার আবেদন, অনেক রক্তের বিনিময়ে জয় করা এ দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের ওপর আর কোনো আঘাত যেন না আসে।’

সংস্কার ও মামলার অগ্রগতি নেই

স্বাধীনতা জাদুঘরের পরিচালক গোলাম কাউছার বলেন, ‘এটি কোনো ব্যক্তির জাদুঘর নয়, এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জাদুঘর। তাই নতুন করে গবেষণা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে আবার দাঁড় করাতে হবে। ফলে এটি শুধু সংস্কারের বিষয় নয়; পুরো উপস্থাপনাই নতুনভাবে ভাবতে হবে। কারণ আগের ডিসপ্লেগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় নতুন করে আলোকচিত্র, দলিল, কিউরেশন এবং প্রদর্শনী পরিকল্পনা করতে হবে।’ তিনি জানান, এতে সময় ও বড় অঙ্কের অর্থ লাগবে। সরাসরি ক্ষতির পরিমাণ ৫ থেকে ১০ কোটি টাকা হলেও পূর্ণাঙ্গ পুনর্নির্মাণে ২০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে।

মামলা প্রসঙ্গে গোলাম কাউছার জানান, স্বাধীনতা জাদুঘরের চারটি মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্ত্রও লুট হয়ে যায়। পরে লুট হওয়া অস্ত্র ও ভাঙচুরের ঘটনায় শাহবাগ থানায় মামলা করা হয়। বিভিন্ন স্থানে অস্ত্র উদ্ধারের খবর পাওয়া গেলেও সেগুলোর সঙ্গে জাদুঘরের অস্ত্রের মিল পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন তিনি। এদিকে সংশ্লিষ্ট থানায় খোঁজ নিয়ে মামলার কোনো অগ্রগতি জানা যায়নি। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ঘটনার পর একটি মামলা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো উল্লেখযোগ্য তদন্ত অগ্রগতি, চার্জশিট বা গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশ হয়নি। এ নিয়ে সমালোচনা রয়েছে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন– বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসবাহী একটি রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় এমন হামলার পরও কেন তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই? 

৪৭ মাসেও নেই সংস্কারের উদ্যোগ

ঘটনার পর ৪৭ মাস পেরিয়ে গেলেও জাদুঘরটি এখনো বন্ধ। ভেতরে নেই বিদ্যুৎ সংযোগ। পোড়া দেয়াল, ভাঙা কাচ, ক্ষতিগ্রস্ত ম্যুরাল, গ্যালারিগুলোসহ জাদুঘরের গোটা এলাকা অন্ধকারাচ্ছন্ন। 

জাদুঘরটি নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাইলে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব খবরের কাগজকে বলেন, ‘জাদুঘরের ভেতরে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। সব ভাঙা হয়েছে। তবে ১৯৭১-কে বাদ দিয়ে আমরা কিছুই করতে পারব না। খুবই যত্ন করে নতুন আঙ্গিকে স্বাধীনতা জাদুঘর আবার তুলে ধরা হবে। নতুনভাবে ডিসপ্লে, কিউরেশন এবং দর্শনার্থীদের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ পাওয়া গেলে সংস্কারকাজ শুরু করা সম্ভব হতে পারে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাদুঘরটি সংস্কারের কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। পিডব্লিউডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তারা এখনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পাননি।

স্বাধীনতা জাদুঘরের বর্তমান ভগ্নদশা শুধু একটি রাষ্ট্রীয় স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি নয়; এটি রাষ্ট্রের স্মৃতি সংরক্ষণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার রক্ষার প্রশ্নও সামনে এনেছে। প্রশ্ন উঠেছে–দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য রক্ষার দায় কি এড়াতে পারে রাষ্ট্র? এ প্রসঙ্গে লেখক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক সালেক খোকন বলেছেন, ‘ইতিহাস কখনো মুছে ফেলা যায় না। পরবর্তী প্রজন্ম প্রকৃত ইতিহাস খুঁজে বের করবেই। কারণ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ রাষ্ট্রের একটি মীমাংসিত সত্য। সেটিতে কারও হাত দেওয়া উচিত নয়।’

রাজধানীবাসীকে ফেরাতে সিটি বাসও গেছে ঢাকার বাইরে

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ০৮:৩০ এএম
রাজধানীবাসীকে ফেরাতে সিটি বাসও গেছে ঢাকার বাইরে
এভাবেই গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন যাত্রীরা। ছবি: খবরের কাগজ

গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল সকাল থেকে। তা উপেক্ষা করেই শহরতলির উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন রাজধানীর হাতিরপুল এলাকার বাসিন্দা ফাতেমা কাউসার। কারওয়ান বাজার মোড়ে ঘণ্টা দেড়েক অপেক্ষার পরে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের উদ্দেশে বাসের দেখা পান। কিন্তু সেই বাসে ওঠার জো নেই, বাদুরঝোলা হয়ে গন্তব্যে ছুটছেন অনেক যাত্রী। সাভারের রেডিও কলোনি যেতে ফাতেমাকে আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়।

এই চিত্র গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টার। ফাতেমার মতো আরও অনেক যাত্রীকে গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন গন্তব্যে যেতে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। বিশেষ করে সাভার-নবীনগর, উত্তরা, টঙ্গী-কামারপাড়া, গাজীপুরসহ শহরতলির বিভিন্ন এলাকায় যেতে যাত্রীদের বেশ ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।

রাজধানীর কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, প্রগতি সরণি, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, মিরপুর রোড, বিমানবন্দর সড়ক ঘুরে খবরের কাগজের প্রতিনিধিরা দুর্ভোগের চিত্র দেখেছেন।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদুল আজহার পরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো বন্ধ থাকায় রাজধানীবাসীর ‘বড় অংশ’ রয়ে গেছে ঢাকার বাইরে। ৭ জুন থেকে সেই প্রতিষ্ঠানগুলো খুলবে। তাই আজ শনিবার রাজধানীমুখী যাত্রীদের ঢল দেখা যাবে। তাদের ঢাকায় ফিরিয়ে আনতে সিটি বাসগুলোও বিভিন্ন গন্তব্যে গেছে।

খবরের কাগজের একজন প্রতিবেদক বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর বাংলামোটর থেকে সাভারগামী ওয়েলকাম পরিবহনের বাসে উঠেন। সেই বাসে পা ফেলার জায়গাও ছিল না। পথে যেতে যেতে কথা হয় ষাটোর্ধ্ব একজন যাত্রীর সঙ্গে।

তিনি জানান, নোয়াখালীর সোনাপুর থেকে বেলা সাড়ে ৯টার দিকে তিনি গুলিস্তান এসে পৌঁছান। সাভারগামী বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে। আরেকজন নারী যাত্রী বলেন, ‘জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে অনেকটা জোর করে বাসে উঠেছি। বাসে সিট ছিল না বলে নারী যাত্রীদের উঠাতে চাইছিল না হেল্পার।’

ওই বাসে আসন না পেয়ে নারী যাত্রী দাঁড়িয়েই যাচ্ছিলেন হেমায়েতপুরে। বাসটির হেল্পার মিল্টন বলেন, ‘ঈদের পরে অনেক যাত্রীই তো রইয়া গেছে বাড়ি। তারা তো ফিরে নাই। আজকের (শুক্রবার) রাতের পরে তারা সবাই ফিরতে শুরু করবে। তাদের আনতে টাউন সার্ভিসের বাসগুলো বিভিন্ন গন্তব্যে গেছে।’

রাজশাহীর আলোকচিত্রী রায়হান বিশ্বাস গতকাল ঢাকায় এসেছেন জরুরি কাজে। তিনি জানান, সিরাজগঞ্জের এলেঙ্গার মোড়ে তিনি ঢাকার সিটি সার্ভিসের বেশ কয়েকটি মিনিবাসে ঢাকামুখী যাত্রী দেখেছেন। ঠাকুরগাঁও থেকে রাজধানীতে ফেরার পথে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে ঢাকার ‘টাউন সার্ভিস’ বাস দেখার কথা জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাসেল রহমান। পথে-পথে সেসব বাস বিকল হয়ে থাকার কথাও জানান তিনি।

তাদের কথার সত্যতা পাওয়া যায় শুক্রবার বেলা ২টার দিকে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কেও টাউন সার্ভিসগুলো গেটলক হয়ে রাজধানীর দিকে ফিরছিল। সাভার পরিবহন, সেলফি, মিরপুর লিঙ্ক, রাজধানী, নীলাচল নামের বেসরকারি বাসগুলো তো বটেই;  এমনকি শহরতলি রুটে চলাচল করা বিআরটিসির এসি বাসও দূরপাল্লায় যাত্রী পরিবহন করছে।

এসব বাসে ঢাকায় ফিরতে যাত্রীদের দ্বিগুণ ভাড়া গুনতে হচ্ছে। ঈদের ফিরতি যাত্রার দ্বিতীয় পর্বে এসব অনিয়ম দেখার জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) বা হাইওয়ে পুলিশের কোনো অভিযান নজরে পড়েনি বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) এবং ঢাকা যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটির (আরটিসি) সদস্য সচিব শহিদুল ইসলামকে ফোন করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বার্তা পেয়েও সাড়া দেননি হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি দেলোয়ার হোসেন মিঞা।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী জুবায়ের মাসুদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে এখনো যারা বাড়ি রয়ে গেছেন, তাদের ঢাকায় ফিরিয়ে আনতে দূরপাল্লার বাস পর্যাপ্ত নয়। তাই ঢাকার ভেতরে চলাচল করা অনেক বাস সুযোগ বুঝে দূরপাল্লার রুটে গেছে।

আরটিসির নিয়ম অনুযায়ী এসব বাস দূরপাল্লার রুটে চলাচলের অনুমতি পায় না। কিন্তু প্রশাসনের চোখে ধুলা দিয়ে অনেক মালিক বাস দূরের জেলায় পাঠিয়েছেন। এখন স্থানীয় প্রশাসনও নীরব। কারণ, বাসগুলো তো যাত্রী পরিষেবা দিচ্ছে। আমরাও সমিতিতে আলোচনা করেছি, এসব বাস দূরপাল্লার রুটের জন্য মোটেও উপযুক্ত নয়।’

রাজধানীর ভেতরে বা শহরতলিতে চলাচল করা অধিকাংশ বাসের ফিটনেস নেই, চালকদেরও ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায় না। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান জানান, ঈদযাত্রা বা ফিরতি যাত্রায় ঢাকার এসব টাউন বাসই দুর্ঘটনা ও যানজটের কারণ।

পরিবহন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক আসিফ রায়হান খবরের কাগজকে বলেন, ‘যদিও দুই চালকেরই ভারী যান পরিচালনার লাইসেন্স থাকে, কিন্তু ইন্টারসিটি চালক হুট করে মহাসড়কে নেমে এলে সেই সড়কের চরিত্র বুঝতে পারবেন না। দুই ধরনের সড়কের চরিত্র ভিন্ন। হুট করে চালকের যানবাহনের ধরন (ট্রান্সপোর্ট মুড) পরিবর্তন হলে বিপদের সমূহ শঙ্কা থাকে।’