শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন হত্যাকাণ্ডের পর দেশের অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ বা তৎপরতা নিয়ে নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। কে তাকে খুন করেছে, বা নেপথ্যের কারণ কী- এমন প্রশ্নের বিভিন্ন রকম তথ্য প্রকাশ হচ্ছে গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বিশেষ করে টিটন হত্যার পর থেকেই খুনের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ তুলে অন্তত অন্য তিনজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর (যোসেফ, ইমন ও পিচ্চি হেলাল) নাম সামনে আনা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, টিটন হত্যার পর একপক্ষ আরেক পক্ষকে নানা রকম যোগসূত্র তুলে ধরে বিভিন্নভাবে দায়ী করছে। অথচ, চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডে প্রকৃতপক্ষে কে বা কোন গ্রুপ জড়িত সে বিষয়ে গতকাল শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত স্পষ্ট কোনো তথ্য জানাতে পারেননি দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। এ অবস্থায় গতকাল বিকেলে রাজধানীর নিউমার্কেট থানা থেকে টিটন হত্যা মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের কাছে স্থানান্তর করা হয়েছে।
এর মাঝে গতকাল ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বলেছেন, শীর্ষ সন্ত্রাসী এখন তেমন নেই। যারা রয়েছেন তারা সহযোগী। অন্যদিকে র্যাবের মুখপাত্র উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন, জামিনে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
অপরদিকে গতকাল ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে পিচ্চি হেলালের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন নিহতের বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন। এতে অপর শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও দাবি করা হয়েছে।
যদিও পিচ্চি হেলালও এর আগেই টিটন হত্যার ঘটনায় তার কোনো রকম সম্পৃক্ততা নেই দাবি করে একটি অডিও রেকর্ড প্রকাশ করেন। এছাড়া গত মঙ্গলবার রাতে টিটন হত্যার পরপরই অপর শীর্ষ সন্ত্রাসী তোফায়েল আহমেদ জোসেফকে দায়ী করেও কেউ কেউ নানা তথ্য প্রকাশ করেন।
কেউ কেউ আবার বলেন, যোসেফ বা পিচ্চি হান্নান নন, বরং ভগ্নিপতি শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন ওরফে ক্যাপ্টেন ইমনই তার বড় শ্যালক টিটনকে খুন করিয়েছেন। কিন্তু আপন দুলাভাই হয়ে বড় শ্যালককে কেন এমন নৃশংসভাবে হত্যা করবেন—সে প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে বিশ্লেষকদের মাঝে।
যদিও বলা হচ্ছে, টিটন ও ইমনের মধ্যে আত্মীয়তা থাকলেও পারিবারিক বিরোধ ছিল। কিন্তু এই অভিযোগও গতকাল মিথ্যা বলে দাবি করেন টিটনের বড় ভাই ও ইমনের বড় শ্যালক রিপন।
এ প্রসঙ্গে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, আধিপত্য ধরে রাখা বা বিস্তার করার জন্য অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রকরা (শীর্ষ সন্ত্রাসীরা) বিভিন্ন সময় নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি করে থাকে। অনেক সময় নিজেদের লোকদের হত্যা করে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতেও তারা দ্বিধাবোধ করেন না। এসব করতে গিয়ে তারা প্রায় সময় ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডে ব্লেম গেম’ ধরনের কৌশল প্রয়োগ করে থাকেন। টিটন হত্যার পর সেরকম ‘ব্লেম গেম’ এর (মিথ্যা দায় দিয়ে অন্যকে ফাঁসানোর খেলা) কৌশলগত তৎপরতা চালানো হচ্ছে কি না—তা তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভালোভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।’
গতকাল সন্ধ্যায় ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও ডিবি প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘টিটন হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের তথ্য আমরা পাচ্ছি। গণমাধ্যমসহ অন্য মাধ্যমেও নানা রকম তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে। সবকিছুই খতিয়ে দেখা হবে। কিন্তু এখনো নিশ্চিত করে বলার মতো কোনো তথ্য আমরা পাইনি। যেহেতু হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে এবং কেউ না কেউ এতে জড়িত রয়েছে— সেটাই তদন্ত করে বের করা হবে। তবে অল্প সময় আগেই (গতকাল বিকেলে) যেহেতু ডিবি পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে টিটন হত্যা মামলার তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে, সে ক্ষেত্রে চাঞ্চল্যকর এই মামলার গভীরের তথ্য পেতে একটু সময় লাগবে। এ বিষয়ে আমরা নিবিড়ভাবে কাজ করব।’
এখন শীর্ষ সন্ত্রাসী তেমন নেই, যারা রয়েছেন তারা সহযোগী
গতকাল কারওয়ান বাজারে পুলিশ ক্যাম্প উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে টিটন হত্যাকাণ্ড নিয়ে কথা বলেন ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার।
এ সময় তিনি বলেন, ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী এখন তেমন নেই। যারা রয়েছেন, তারা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সহযোগী বা ওরকম সাজতে চাইছেন।’ তিনি বলেন, ‘সব সময় সন্ত্রাসীদের তালিকা হালনাগাদ হচ্ছে। এ বিষয়ে আমাদের নজরদারি ও পর্যবেক্ষণসহ সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। যারা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ভাঙাচ্ছে বা যারা মাথা চাড়া দিয়ে উঠার চেষ্টা করছে, আমরা আগেই তাদেরকে দমন করব।’
জামিনে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীরা নজরদারিতে রয়েছে
গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজার র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জামিনে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে জানান র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী।
তিনি বলেন, শুধু টিটনের সন্দেহভাজন খুনিরাই নয়, বরং যারা জামিনে বের হয়ে আবারও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ানোর চেষ্টা করছে, তাদের প্রত্যেককেই কঠোর নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসীদের তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে।
ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন হত্যার ঘটনার ছায়া তদন্ত চলছে। অপরাধীদের শনাক্ত করতে র্যাবের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। ওই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জড়িতদের শনাক্ত করার পাশাপাশি গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। এ হত্যাকাণ্ডের ‘মোটিভ’ এবং এর পেছনে কারা জড়িত তা খুঁজে বের করতে গুরুত্বের সঙ্গে ছায়া তদন্ত করা হচ্ছে।
নিজেকে বাঁচাতে পিচ্চি হেলাল বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছেন বলে দাবি
গতকাল দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনে (ক্র্যাব) সংবাদ সম্মেলন করেন টিটন হত্যা মামলার বাদী তার বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন। এসময় তিনি দাবি করেন, টিটন হত্যার ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে এবং নিজেকে বাঁচাতে শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে রিপন বলেন, গত ২৮ এপ্রিল রাতে আমার ছোট ভাই টিটনকে হত্যার পর প্রধান আসামি পিচ্চি হেলাল একটি অডিও রেকর্ড ছড়িয়ে দিয়ে নানা ধরনের মিথ্যাচার করছে। সে আমাদের পারিবারিক কলহের যে দাবি করেছে, তা সম্পূর্ণ বানোয়াট। মূলত তদন্ত কর্মকর্তাদের বিভ্রান্ত করতেই সে এই অপকৌশল নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ১১ ভাই-বোনের মধ্যে সুসম্পর্ক রয়েছে। আমার বোন ও ভগ্নিপতি সানজিদুল ইসলাম ইমনের সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধ নেই। ইমন একজন উচ্চশিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। পিচ্চি হেলাল নিজের অপরাধ ঢাকতে এসব আবোল-তাবোল বলছেন।’
রিপন জানান, পিচ্চি হেলাল রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও নিউমার্কেট এলাকায় প্রভাব বিস্তার এবং আসন্ন কোরবানির পশুর হাটের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে রাখতে টিটনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। এছাড়া জেলখানায় থাকাকালীনও টিটনের সঙ্গে তার বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল। টিটন হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং পিচ্চি হেলাল ও তার সহযোগীদের গ্রেপ্তার করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।