রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে বছরজুড়েই চলে খোঁড়াখুঁড়ি। সেই সড়কগুলো দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না করেই ফেলে রাখা হয়। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। উন্নয়নের নামে সড়ক ‘ক্ষতবিক্ষত’ করে রাখা হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। প্রতিদিনই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ, বাড়ছে যানজট, পাশাপাশি সৃষ্টি হচ্ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও।
- রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে উন্নয়নকাজের নামে দীর্ঘদিন ধরে খোঁড়াখুঁড়ি চললেও নির্ধারিত সময়ে সংস্কারকাজ শেষ না হওয়ায় জনদুর্ভোগ, যানজট, দুর্ঘটনা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
- ওয়ান স্টপ সেল নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও সিটি করপোরেশন, ওয়াসা ও অন্যান্য সংস্থার সমন্বয়হীনতার কারণে একই সড়ক বারবার খোঁড়া হচ্ছে এবং কাজ শেষে দ্রুত রাস্তা মেরামত করা হচ্ছে না।
- বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষাকালে খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ রাখা, দ্রুত সংস্কারকাজ শেষ করা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর সমন্বয় ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে নাগরিক দুর্ভোগ কমানো সম্ভব নয়।
রাজধানীতে এমনও সড়ক আছে যেগুলো খোঁড়াখুঁড়ির ছয় মাস থেকে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে একই অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে। কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা বা সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড ছাড়াই সড়ক খোঁড়া হচ্ছে। রাস্তা যত দ্রুত খোঁড়া হয়, তত দ্রুত তা সংস্কার না হওয়ায় জনদুর্ভোগ যেন শেষই হচ্ছে না। এমন অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জনদুর্ভোগ কমাতে সড়ক খোঁড়াখুঁড়িতে মন্ত্রণালয় থেকে ‘ওয়ান স্টপ সেল’ নীতিমালা গঠন করা হয়েছে। এই নীতিমালার আওতায় কোনো সড়ক খোঁড়ার আগে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে অবহিত করা এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করে দ্রুত সড়ক সংস্কারের নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই নীতিমালার খুব একটা তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। বরং এক সংস্থা অন্য সংস্থার ওপর দায় চাপাচ্ছে।
রাজধানীর একাধিক এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন সংস্থার উন্নয়ন কাজের নামে সড়ক খুঁড়ে ফেলে রাখা হয়েছে। কোথাও পানির লাইন বসানো হচ্ছে, কোথাও ড্রেনেজ উন্নয়ন, আবার কোথাও গ্যাস বা বিদ্যুৎ সংযোগের কাজ চলছে। এসব কাজ করছে সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, বিদ্যুৎ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থা। তবে কাজ শেষ হওয়ার পরও অনেক জায়গায় রাস্তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়নি। ফলে সড়কের মাঝখানে বা একপাশে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে, যা প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। খোঁড়া অংশে পানি জমে গর্তগুলো আরও গভীর ও বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। অনেক জায়গায় পানির নিচে গর্ত থাকায় চালকরা তা বুঝতে না পেরে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। মোটরসাইকেল আরোহী থেকে শুরু করে রিকশাচালক, প্রাইভেট কার থেকে বাসচালক, সবাই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। বিশেষ করে ছোট যানবাহন গর্তে পড়ে বিকল হয়ে সড়কের মাঝখানেই আটকে থাকছে, যার ফলে দ্রুতই দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।
দুই দিন বিরতির পর গতকাল বুধবার রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হয়েছে। ফলে নতুন করে দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। রোদ উঠলে খোঁড়া রাস্তার মাটি শুকিয়ে ধুলাবালিতে পরিণত হচ্ছে, যা বাতাসে উড়ে পুরো সড়কজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে পথচারী, দোকানদার এবং যানবাহনের চালকরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।
রাজধানীর গাবতলী, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, পরীবাগ, বাংলামোটর, সেগুনবাগিচা, ধানমন্ডিসহ অনেক এলাকার সড়কের বেহাল চিত্র চোখে পড়েছে।
রাজধানীর কাকরাইল এলাকায় প্রধান বিচারপতির বাসভবনের সামনের সড়ক খুঁড়ে রাখা হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। ফলে চরম দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটির একপাশে এতটাই বেহাল যে, সেখানে স্বাভাবিকভাবে যানবাহন চলাচল তো দূরের কথা, সাধারণ মানুষের হাঁটাচলাও প্রায় অসম্ভব। পাইপলাইন, রাস্তা ও ফুটপাত সংস্কারের লক্ষ্যে উন্নয়নকাজের অংশ হিসেবে প্রায় ১৫ দিন আগে সড়কটি খোঁড়া হয়। কিন্তু কাজের অগ্রগতি খুবই ধীর হওয়ায় এখনো তা সম্পন্ন হয়নি। ফলে পুরো সড়কজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে খানাখন্দ ও উঁচুনিচু অবস্থা, যা চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ধানমন্ডি লেকের পাড়ে তাকওয়া মসজিদের সামনে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সড়ক খোঁড়া অবস্থায় পড়ে আছে। বৃষ্টি হলে কাদাপানি মসজিদের ভেতরে ঢুকে পড়ছে, আর রোদ উঠলে ধুলাবালিতে পুরো এলাকা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। দিনের বেলায় সেখানে লেগে থাকে দীর্ঘ যানজট। আশপাশের আরও কয়েকটি সড়ক দীর্ঘদিন ধরে একইভাবে খোঁড়া অবস্থায় পড়ে আছে।
একই চিত্র দেখা গেছে বাংলামোটর থেকে পরীবাগ ও হাতিরপুল সড়কেও। সড়কের ওপর খোঁড়া অংশগুলোতে টানা বৃষ্টিতে পানি জমে থাকায় যানবাহনের চাকা পড়ে দুর্ঘটনা ঘটছে। বৃষ্টির মধ্যেই অনেক জায়গায় সড়ক ঢালাই না দিয়ে শুধু বালি দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। পরে রোদ উঠলে সেই বালি শুকিয়ে ধুলা হয়ে পুরো সড়কে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে যানজটের পাশাপাশি জনদুর্ভোগও বেড়েই চলেছে।
লালবাগের মাজার এলাকা থেকে মদিনা মিষ্টান্ন ভান্ডার পর্যন্ত সড়ক খুঁড়ে পাইপলাইন বসানোর কাজ করা হয়েছে। তবে কাজ শেষে রাস্তার সংস্কার না করে গর্তে বালু ফেলে রাখা হয়েছে। গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে ওই অংশে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে, ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
রাজধানীর প্রবেশদ্বার গাবতলী এলাকাতেও একই অবস্থা দেখা গেছে। এ ছাড়া মোহাম্মদপুর, উত্তরা, বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকার অলিগলির সড়ক খুঁড়ে ফেলে রাখা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের চলাচলকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।
ফুটপাতের হালিম বিক্রেতা বলেন, ধুলাবালির কারণে দোকানে বসা দায় হয়ে পড়েছে, ক্রেতাও কমে গেছে। আরেক রিকশাচালক বলেন, এই রাস্তায় রিকশা চালানো খুব ঝুঁকিপূর্ণ।
সিটি করপোরেশন বরাবরই দ্রুত কাজ শেষ করে সড়ক সংস্কারের আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে। বাস্তবতার সঙ্গে এই আশ্বাসের খুব একটা মিল নেই। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উন্নয়নকাজ অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তা পরিকল্পনাহীনভাবে পরিচালিত হলে জনদুর্ভোগ বাড়ে। কাজ শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করার বাধ্যবাধকতা থাকা জরুরি। একই সঙ্গে খোঁড়াখুঁড়ির পর দ্রুত সড়ক সংস্কার নিশ্চিত না করলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
উত্তর সিটি করপোরেশনের বক্তব্য
উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান খবরের কাগজকে বলেন, ‘ওয়ান স্টপ সেল’ নীতিমালা মন্ত্রণালয় থেকে গঠন করা হয়েছে, যেখানে সড়ক খোঁড়ার আগে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে জানানো এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশনা রয়েছে। তবে বাস্তবে অনেক সময় তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।
তিনি জানান, ওয়াসার একাধিক প্রকল্প ভিন্ন সময়ে বাস্তবায়ন হওয়ায় একই সড়ক বারবার খোঁড়া হচ্ছে। এ ছাড়া অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয় না, ফলে জনদুর্ভোগ বাড়ছে। আবার কাজ চলাকালে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পরিবর্তন হওয়ায় নতুন কর্মকর্তার দায়িত্ব বুঝে নিতে সময় লাগে, যা কাজের গতি আরও কমিয়ে দেয়।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বক্তব্য
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, যারা সড়ক কাটে, তাদেরই উচিত সেই সড়ক মেরামত বা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সংশ্লিষ্ট অনেক সংস্থাই সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে না। ফলে খোঁড়া সড়ক দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিত অবস্থায় পড়ে থাকছে এবং জনদুর্ভোগ বাড়ছে।
তিনি বলেন, ওয়াসাসহ সব সংস্থাকে বর্ষা বা বৃষ্টির মৌসুমে সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি না করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশ অনেক ক্ষেত্রেই মানা হচ্ছে না। বিভিন্ন সংস্থা নিজেদের সুবিধাজনক সময় অনুযায়ী সড়ক খুঁড়ে কাজ শুরু করছে, যার ফলে একই সড়কে বারবার খোঁড়াখুঁড়ির ঘটনা ঘটছে এবং নাগরিক দুর্ভোগ বাড়ছে।
এ অবস্থার স্থানীয় সমাধান কী? এমন প্রশ্নের জবাবে এই প্রকৌশলী বলেন, মূল সমস্যা হচ্ছে সমন্বয়হীনতা। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকলে কোনো সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। তাই জনদুর্ভোগ কমাতে হলে সবার আগে সমন্বিত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
উন্নয়নকাজ অবশ্যই প্রয়োজন, তবে সমন্বয়ের অভাব থাকলে জনদুর্ভোগ বাড়ে বলে মনে করছেন নগরপরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, রাজধানীর সড়কে দীর্ঘমেয়াদি খোঁড়াখুঁড়ি এবং বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট গর্ত এখন ঢাকাবাসীর জন্য চরম আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর বর্ষা এলেই সেবামূলক সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা প্রকট হয়ে ওঠে। খুঁড়ে রাখা গর্তগুলো বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গিয়ে একেকটি মরণফাঁদে রূপ নিয়েছে, যার ফলে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। উন্নয়নের দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর জনজীবনকে এভাবে জিম্মি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, জনভোগান্তি লাঘবে দ্রুততম সময়ে সংস্কারকাজ শেষ করা এবং বৃষ্টির মৌসুমে খোঁড়াখুড়ি বন্ধ রাখা দরকার। উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর সরেজমিন পরিদর্শন ও সরকারি কর্মকর্তাদের কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে এই ‘নরকযন্ত্রণা’ থেকে সাধারণ জনগণের এই মুক্তি মিলবে না।