নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাণিজ্যে তৈরি হয়েছে নতুন ধরনের অস্থিরতা। যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে। ফলে বিনিয়োগে স্থবিরতা কাটছেই না। এর প্রভাবে গত মার্চ মাসে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে, যার পরিমাণ ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস গত বছরের জুলাইয়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ। আর নবম মাসে তা নেমে গেছে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে। অর্থাৎ আট মাসের ব্যবধানে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমেছে প্রায় ২ শতাংশ।
জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৩ সাল থেকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির তথ্য প্রকাশ করে আসছে। সেই তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত ২৩ বছরের মধ্যে চলতি বছরের মার্চ মাসে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছুটা কমলেও বিনিয়োগ ও নতুন ব্যবসা কার্যক্রম নিরুৎসাহিত করার গভীর সমস্যাগুলোর এখনো সমাধান হয়নি। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় জ্বালানিসংকট আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা দেয়, যার ফলে আগের তুলনায় ব্যাংক ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। তাদের মতে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ সুদহার এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন ঋণ নিতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত কার্যত ধীরগতিতে চলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজারে অর্থপ্রবাহ কমিয়ে রাখার যে নীতি ঠিক করেছে, ঋণ প্রবাহের এই প্রবৃদ্ধি তারও অনেক নিচে নেমে গেল। সংকোচনমূলক নীতি বজায় রাখার ধারাবাহিকতায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, দেশে বিনিয়োগ বাড়ার অন্যতম নিয়ামক হচ্ছে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি। ফলে এই সূচক বাড়লে বিনিয়োগ বাড়ে আর কমলে বিনিয়োগ কমে। বিদায়ী অর্থবছরজুড়েই এই সূচকটি কমতে থাকায় আগামী দিনে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে মারাত্মক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ সুদহার ঋণ সংকোচনের অন্যতম প্রধান কারণ। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে ঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৭ শতাংশে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে নীতি সুদহার বাড়ানো হয়েছে, যার প্রভাব সরাসরি পড়েছে ঋণের খরচে। ফলে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এছাড়া ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট এবং খেলাপি ঋণের উচ্চ হার ঋণ বিতরণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকি নিতে নিরুৎসাহিত করছে। এতে প্রকৃত উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, বর্তমানে ঋণের সুদহার ১৬ থেকে ১৭ শতাংশে পৌঁছানোয় নতুন বিনিয়োগ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঋণের উচ্চ সুদহার, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আইনশৃঙ্খলার নাজুক পরিস্থিতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ঘাটতিসহ নানা কারণে বিনিয়োগে নিম্নমুখী প্রবণতা প্রকাশ পাচ্ছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। এ অবস্থায় আসন্ন বাজেটে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে জানান তারা।
প্রথমত, বিনিয়োগবান্ধব বাজেট প্রণয়ন করতে হবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, ডলারের দাম স্থিতিশীল রাখতে হবে এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্প সুদে অর্থায়নের জন্য বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করতে হবে। বিশেষ করে সিএমএসএমই, রপ্তানিমুখী ও আমদানি-বিকল্প শিল্পের জন্য।
তৃতীয়ত, কর কাঠামোকে ডিজিটালাইজেশন করতে হবে। বারবার করহার পরিবর্তনের পরিবর্তে নীতিগত ধারাবাহিকতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর নামে অতিরিক্ত করচাপ সৃষ্টি না করে করভিত্তি সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
চতুর্থত, অবকাঠামো, বন্দর, কাস্টমস ও লজিস্টিক ব্যয় কমাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ব্যবসার ব্যয় কম হয়। বাজেটে সব সরকারি পরিচালন ব্যয় যৌক্তিক হারে কমাতে হবে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য বরাদ্দ বাড়াতে হবে। ঢাকা চেম্বার বিশ্বাস করে, শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়, অর্থনৈতিক আস্থা ও ব্যবসাবান্ধব নীতিই এখন বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের মূল চাবিকাঠি।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনিয়োগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হলেও এটি একমাত্র শর্ত নয়। বর্তমানে দেশে মূলত উদ্যোক্তাদের আস্থাহীনতা, উচ্চ সুদের হার, ডলার সংকট, জ্বালানি অনিশ্চয়তা, আমদানি সীমাবদ্ধতা এবং নীতিগত অসামঞ্জস্যের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমে এসেছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে টিকে থাকার কৌশলে মনোযোগ দিচ্ছে। অন্যদিকে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ও তারল্যচাপের কারণে ব্যাংকগুলোও ঝুঁকি নিতে অনাগ্রহী। ফলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলেও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এখনো পুরোপুরি আসেনি। সেই সঙ্গে বর্তমান সরকার ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে কী ধরনের নীতি গ্রহণ করবে, সেটাও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। এই অবস্থায় অনেক উদ্যোক্তা চাইলেও নতুন বিনিয়োগ বাড়াতে পারছেন না। তাই পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যবসাবান্ধব বাজেট প্রণয়নের দাবি জানান তিনি।
একই বিষয়ে ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তারা ব্যবসা সম্প্রসারণ নয়, বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, আমরা যারা ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত আছি, তারা বিদ্যমান ব্যবসা কীভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায়, সে চেষ্টা করছি। ব্যবসা সম্প্রসারণ বা নতুন কোনো প্রকল্প নেওয়ার কথা কেউ ভাবছে বলে আমরা জানা নেই। তিনি আরও বলেন, এত উচ্চ সুদের ব্যাংকঋণ নিয়ে আর ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে নতুন ব্যবসা করাও অনেক কঠিন।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদনশীলতা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস হলো বেসরকারি খাত। শিল্পের উৎপাদন, বিপণন কিংবা সেবা খাতের সিংহভাগই বেসরকারি খাতনির্ভর। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে খাতটিকে ঋণবঞ্চিত করা হচ্ছে। যদিও মূল্যস্ফীতি না কমে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখন আরও বাড়ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামীতে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। খেলাপি ঋণ বেড়ে ব্যবসায়ীরা আরও নাজুক পরিস্থিতিতে পড়বেন।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমার কারণ জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি এখনো সন্তোষজনক না হওয়ায় বিনিয়োগ হচ্ছে না। ফলে ঋণের চাহিদাও বাড়ছে না। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ অনেকদিন ধরেই জিডিপির আনুপাতিক হারে একই পর্যায়ে অর্থাৎ ২২-২৩ শতাংশই রয়ে গেছে। বর্তমান সরকার এসব বিষয়ে সচেতন থাকলেও দৃশ্যমান তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে বিনিয়োগ স্থবিরতা আরও বাড়বে। বিনিয়োগ না হলে উৎপাদন হবে না, সেই সঙ্গে কর্মসংস্থানও হবে না। ফলে সরকারের যে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, সেটাও অর্জন হবে না।
এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা সরকারের কাছে সুদহার কমানো, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, খেলাপি ঋণ কমানো এবং জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার ওপর জোর দাবি জানিয়েছেন।
ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, সামগ্রিকভাবে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ এর আগে এতটা মন্থর হয়ে আসতে দেখা যায়নি। ঋণ চাহিদা কমার কারণ হিসেবে তারা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, আর যেগুলো চালু আছে সেগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে না। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত দিক নির্দেশনা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তারা বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত অবস্থান সম্পর্কে তারা এখনো স্পষ্ট ধারণা পাননি। গভর্নর ঋণের সুদের হার কমানোর কথা বলেছেন, তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে এটি কতটা বাস্তবসম্মত–তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা কাজ করছে। তারা বিনিয়োগের প্রস্তুতি নিলেও বিনিয়োগে হাত দিচ্ছেন না। যে কারণে ব্যাংক থেকে খুব বেশি ঋণ নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। তবে তারা যদি ঋণ চান তাহলে আমরা তা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছি।
এদিকে, বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো আয় বাড়াতে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের দিকে বেশি ঝুঁকছে। এই প্রসঙ্গে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগের কারণে ব্যাংকগুলো নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিজের দিকে ঝুঁকছে। একই সময়ে সরকার ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে অনেক বেশি ঋণ নিচ্ছে। এতে ব্যাংকগুলোর আয়ের বড় অংশ এখন এই খাত থেকেই আসছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাসে সরকার ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ৩৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এপ্রিলে তা বেড়ে হয়েছে ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা আগে ইস্যু করা ট্রেজারি বিলের দায় পরিশোধে ব্যবহৃত হয়। ফলে এপ্রিলে ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা।