টেরেসা বারবোসা ছিলেন শুরু থেকেই সঙ্গে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে নিজ শহর গন্দোমার ছেড়ে পাকোস দে ফেরেইরার ডরমিটরিতে এসে প্রথম যাকে দেখেছিলেন দিয়োগো জোতা, তিনি ছিলেন বারবোসা। রান্না থেকে শুরু করে কাপড় ধোয়া, ঘর পরিষ্কার, সবকিছুই করতেন তিনি। যারা পর্তুগালের বিভিন্ন শহর বা বিদেশ থেকে পাকোসের যুবদলে যোগ দিতে আসতেন, তাদের দেখাশোনা করাই ছিল তার দায়িত্ব।
সাধারণত খেলোয়াড়েরা যুবদল থেকে সিনিয়র দলে উঠলে ডরমিটরি ছাড়ত। কিন্তু জোতা সেখানে ছিলেন তিন বছর। একসময় তিনি একাই ডরমিটরিতে থাকতেন, যদিও ক্লাব তাকে অ্যাপার্টমেন্ট অফার করেছিল। রাইট-ব্যাক ফ্রেড মার্টিনসের সঙ্গে যে ঘর ভাগাভাগি করে থাকতেন, সেই ঘরেই শেষ দিন পর্যন্ত ছিলেন। যতদিন না ২০১৬ সালে আতলেতিকো মাদ্রিদে যোগ দিতে পাকোস ছাড়েন।
বারবোসাকে তিনি পরিবারের সদস্যের মতো ভাবতেন। এক সাক্ষাৎকারে জোতা বলেছিলেন, ‘অনেকেই হয়তো ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিত, কিন্তু সবার পথ আলাদা। আমি যেমন তা হয়তো এখান থেকেই বোঝা যায়।’
কিছুদিন আগে স্পেনে সড়ক দুর্ঘটনায় ছোট ভাই আন্দ্রে সিলভাকে নিয়ে মারা যান এই লিভারপুল তারকা। সারা জীবন জোতার মধ্যে ছিল সেই সরলতা ও বিনয়। যেমনটা বলেছেন সিএনএনের বিশ্লেষক সার্জিও পিরেস, ‘সে ছিল এক সাধারণ ছেলে, বাস করত তারকাদের জগতে।’
লিভারপুলের সমর্থকরা প্রতিজ্ঞা করেছেন, তাদের ২০ নম্বরকে কখনো ভুলবেন না। যেমন জোতা কখনো ভোলেননি তাকে সাহায্য করা মানুষদের। জুনে যখন স্কুলজীবনের প্রেমিকা রুতে কারদোসোকে বিয়ে করেন, বারবোসাকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন। এমনকি পরিবারের সঙ্গেই বসিয়েছিলেন।
বারবোসা জানালেন, ‘নাচের ফাঁকে সে আমার কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে চুমু দিয়েছিল। ইংল্যান্ডে চলে গিয়েও আমাকে ভুলে যায়নি।’
নিজ শহরের সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ রেখেছিলেন জোতা। বিয়েতে কোনো উপহার চাননি বরং অতিথিদের বলেছিলেন স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস ও প্রাণিকল্যাণ সংগঠনকে অনুদান দিতে। তার প্রাক্তন কোচ ভাস্কো সিয়াব্রা বললেন, ‘জোতা সব সময় হাসিমুখে থাকত, আর সেই হাসি চারপাশে আনন্দ ছড়িয়ে দিত। খুব বিনয়ী ছিল, মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখত।’
পাকোসে থাকার সময়ই জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৯ দলে ডাক পাওয়ার জন্য কোচ সিয়াব্রা নিজে ই-মেইল করেছিলেন জাতীয় দলের কোচকে। সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল জোতার বড় পথচলা। প্রিমিয়ার লিগ জেতা, লিভারপুলের হয়ে ১৮২ ম্যাচে ৬৫ গোল। সব অর্জনের মাঝেও শিকড় ভুলে যাননি। নিয়মিত পাকোসের যুব খেলোয়াড়দের জন্য নিজের স্পন্সরকৃত বুট পাঠাতেন।
জোতার বাবা জোয়াকিম সিলভা বললেন, ‘আমরা ন্যূনতম মজুরির কারখানার শ্রমিক ছিলাম। কখনো ব্র্যান্ডের বুট কিনে দিতে পারিনি। কিন্তু সে কোনোদিন চায়নি, জানত আমাদের সীমাবদ্ধতা।’
পাকোসের সাবেক সভাপতি পাওলো মেনেসেস জানালেন, ‘জোতা কখনো ফোন নম্বর বদলায়নি। সব সময় কল ধরত। নম্রতা আর কৃতজ্ঞতা, এই দুই গুণ তার মধ্যে ছিল পূর্ণভাবে।’
লিভারপুলের সতীর্থ অ্যান্ডি রবার্টসনের ভাষায়, ‘সে ছিল সবচেয়ে ব্রিটিশ মানসিকতার বিদেশি খেলোয়াড়। আমরা মজা করে তাকে ‘দিয়োগো ম্যাকজোটা’ বলতাম। ডার্টস দেখতাম, ঘোড়দৌড় দেখতে চেল্টেনহামেও গিয়েছিলাম।’
সব সাফল্যের মাঝেও তিনি থেকে গিয়েছিলেন সেই একই মানুষ। যিনি বুঝতেন, তার যাত্রা সম্ভব হয়েছে অসংখ্য ‘তেরেসা’দের জন্যই। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নম্রতা, উদাদরতা আর কৃতজ্ঞতা, এই তিনটি শব্দ দিয়োগো জোতার পরিচয়ের মূলে ছিল।
চঞ্চল/নিলয়/