আজ ১৪ জুন, বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘ইন্টারন্যাশনাল বাথ ডে’ বা আন্তর্জাতিক গোসল দিবস।
প্রতিদিনের কর্মব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি ভুলে একটুখানি মানসিক প্রশান্তি, আত্মযত্ন এবং শরীর-মনকে সতেজ করার তাগিদ থেকেই প্রতি বছর এই বিশেষ দিনটি পালন করা হয়।
ইতিহাসের সেই বিখ্যাত গোসল ও ‘ইউরেকা’
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এই দিনটির পেছনে রয়েছে এক যুগান্তকারী বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে গ্রিক গণিতবিদ ও বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসকে সাইরাকিউসের রাজা হিয়েরো একটি মুকুটের বিশুদ্ধতা পরীক্ষা করার দায়িত্ব দেন। মুকুটটি না ভেঙে এর সমাধান খুঁজছিলেন তিনি।
বলা হয়ে থাকে, গ্রীষ্মকালীন অয়নকালের ঠিক এক সপ্তাহ আগে, অর্থাৎ ১৪ জুনের এমনই এক দিনে আর্কিমিডিস যখন গোসলের টাবে নামেন, তখন তিনি লক্ষ্য করেন তার শরীরের ওজনের কারণে টাবের জল উপচে পড়ছে। মুহূর্তেই তিনি বুঝতে পারেন, বস্তুর আয়তন ও ঘনত্ব মাপার সূত্র তিনি পেয়ে গেছেন। এই আবিষ্কারের উত্তেজনায় তিনি বাথটব থেকে নগ্নাবস্থায় রাস্তায় ছুটে বেরিয়েছিলেন এবং চিৎকার করে বলেন- ‘ইউরেকা! ইউরেকা!’ (আমি পেয়ে গেছি!)। বিজ্ঞান ইতিহাসের এই বিখ্যাত ঘটনাকে স্মরণ করেই প্রতি বছর ১৪ জুন এই দিবসটি পালন করা হয়।
গোসল ও সৃজনশীলতার সম্পর্ক
গবেষণায় দেখা গেছে, গোসল বা শাওয়ার নেওয়ার সময় মানুষের মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যায়, যা মানুষকে আরও সৃজনশীল করে তোলে। কগনিটিভ সাইকোলজিস্ট স্কট ব্যারি কাউফম্যানের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৭২ শতাংশ মানুষের মাথায় চমৎকার সব নতুন আইডিয়া আসে গোসল করার সময়।
আদি ইতিহাস থেকে আধুনিক বাথটব
মানব সভ্যতায় গোসলের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০০ অব্দে সিন্ধু উপত্যকার সভ্যতায় প্রথম উন্নত প্লাম্বিং বা স্নানাগারের প্রমাণ মেলে। আর খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দে প্রাচীন রোমে প্রথম বাথটবের ব্যবহার শুরু হয়। অথচ ১৯ শতকেও ইংল্যান্ডে গোসল করা বেশ কষ্টসাধ্য ছিল; তখন কোনো প্লাম্বিং ব্যবস্থা না থাকায় ফায়ারপ্লেসের সামনে বড় ধাতব পাত্রে ঠান্ডা জল রেখে গোসল করতে হতো। নদী বা পুকুরে গোসল করতে গিয়ে অনেকেই ঠান্ডাজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তেন। পরবর্তীতে ১৮৮৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আধুনিক বাথটব আবিষ্কারের পর ১৯৩০-এর দশকে এটি বিশ্বব্যাপী সহজলভ্য হয়।
যেভাবে উদযাপন করবেন এই দিনটি
শিশুদের বিজ্ঞান শিক্ষা: আর্কিমিডিসের গল্প শুনিয়ে বাথ টয় (খেলনা) দিয়ে শিশুদের জলের প্লবতা বা বিজ্ঞানের প্রাথমিক পাঠ দেওয়ার চমৎকার সুযোগ এটি।
স্পা বা বিলাসী গোসল: এসেনশিয়াল অয়েল, বাথ সল্ট বা সুগন্ধি বাথ বোম্ব ব্যবহার করে আজ একটু দীর্ঘ সময় নিয়ে উষ্ণ জলে গোসল করতে পারেন। হালকা গান বা মোমবাতি জ্বালিয়ে স্নানাগারকে বানিয়ে তুলতে পারেন এক টুকরো শান্তির নীড়।
ভেষজ সাবান তৈরি: ঘরে বসেই সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে নিজের পছন্দের সুগন্ধি সাবান তৈরির মাধ্যমে দিনটি পালন করা যায়।
পানির অপচয় রোধ ও সচেতনতার বার্তা
আন্তর্জাতিক গোসল দিবস কেবল নিজের আরাম-আয়েশের দিন নয়, এটি বিশ্বজুড়ে পানি সচেতনতারও একটি বড় মাধ্যম। আমরা যখন সুনিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রার আধুনিক বাথটবে বিলাসী গোসল উপভোগ করছি, তখনো পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের ন্যূনতম পরিষ্কার ও সুপেয় পানির অধিকার নেই। তাই এই বিশেষ দিনে নিজে সুস্থ থাকার পাশাপাশি জল অপচয় না করার এবং সবার জন্য নিরাপদ পানির অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান বিশেষজ্ঞরা।
তামান্না রুপা/