ভারতের পূর্বাঞ্চলের অন্যতম কৌশলগত এলাকা শিলিগুড়ি করিডরে রাফাল যুদ্ধবিমান ও রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করেছে ভারত। মাত্র ২০-২২ কিলোমিটার প্রশস্ত এই করিডর ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টারস) সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের একমাত্র স্থল যোগাযোগের পথ। চীন ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক গতিবিধির পরিপ্রেক্ষিতে নয়াদিল্লি এই করিডরে নিরাপত্তা জোরদার করেছে বলে বৃহস্পতিবার (২৯ মে) ভারতের সংবাদমাধ্যম জি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
রাফাল ও এস-৪০০ মোতায়েন ভারতের কৌশলগত বার্তা
প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডর বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও চীনের সংযোগস্থলে অবস্থিত। গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ‘চিকেনস নেক’ নামে খ্যাত এই করিডর ঘিরে নয়াদিল্লি প্রতিরক্ষা বলয় গড়ছে। তারই অংশ হিসেবে শিলিগুড়ি করিডরে এবার রাফাল যুদ্ধবিমান এবং এস-৪০০ বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করল ভারত। পাকিস্তান ইতোমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে বিচলিত হয়ে পড়েছে। নয়াদিল্লি এখন তার কৌশলগত দৃষ্টি পূর্ব দিকে ঘুরিয়ে নিতে শুরু করেছে। পাকিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়ে এলেও ভারতের দৃষ্টি এখন বেইজিং এবং ঢাকার দিকে।
এর আগে দ্য এশিয়া লাইভের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত-ভুটান সীমান্তের কাছে সম্প্রতি চীনা সামরিক মহড়া এবং বাংলাদেশে দ্রুত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে নয়াদিল্লি উদ্বিগ্ন রয়েছে। উদ্বেগের কারণ হলো ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার চীন ও পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এ বিষয়টি ভারতকে পূর্ব দিকে কৌশলগত ভারসাম্য পুনর্গঠনের প্রস্তুতি নিতে বাধ্য করেছে। এরই অংশ হিসেবে দেশটি ইতোমধ্যে তার আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে ড্রোন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে এবং সমগ্র পূর্ব সীমান্তজুড়ে আকাশপথে নজরদারি জোরদার করেছে।
ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির এই পদক্ষেপ শুধু সামরিক শক্তি প্রদর্শন নয়, বরং একটি কৌশলগত বার্তা যে, চীন বা বাংলাদেশ থেকে যেকোনো ধরনের হুমকি বা দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ড পূর্ণ শক্তিতে প্রতিহত করা হবে।
বাংলাদেশের জেএফ-১৭ কেনা নিয়ে উদ্বেগ
চীন ও পাকিস্তানের যৌথভাবে তৈরি ৩২টি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান বাংলাদেশ কেনার পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে। এই বিমানগুলো আধুনিক রাডার, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার পড এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রসহ সজ্জিত। ভারতের আশঙ্কা, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে এই বিমানগুলো মোতায়েন করা হলে তা ভারতের বিমানঘাঁটি ও সীমান্তবর্তী অবকাঠামোর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এ ছাড়া সম্প্রতি একটি পাকিস্তানি প্রতিনিধিদল ঢাকায় গিয়েছিল গোয়েন্দা তথ্য ও সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করতে। এই সফরও ভারতের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে।
শিলিগুড়ি করিডর ভারতের কৌশলগত ভিত্তি
এদিকে গত বৃহস্পতিবার টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শিলিগুড়ি করিডর ভারতের জন্য শুধু একটি রাস্তা নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও সংহতির মূল ভিত্তি। এই অঞ্চলটি ভারতের প্রায় ৮ শতাংশ ভূমি এবং ৪ কোটিরও বেশি মানুষকে সংযুক্ত করে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রায় ৯৫ শতাংশ রপ্তানি এই করিডর দিয়েই হয়ে থাকে। ফলে এই রুটে যেকোনো ধরনের অবরোধ, যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিরতা ভারতকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে।
শিলিগুড়ি করিডরের খুব কাছেই অবস্থিত চীনের চুম্বি উপত্যকা, যেখানে চীন ইতোমধ্যেই সামরিক অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। যেকোনো সংঘর্ষের পরিস্থিতিতে চীন সহজেই করিডরটি বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। ২০১৭ সালের ডোকলাম অচলাবস্থা এই আশঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও মায়ানমারে চীনের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে, যা ভারতের কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের লালমনিরহাটে অবস্থিত একটি পুরোনো বিমানঘাঁটি পুনরায় চালুর পরিকল্পনা ভারতীয় গোয়েন্দাদের চিন্তিত করেছে। এই ঘাঁটি শিলিগুড়ি করিডর থেকে মাত্র ১৩৫ কিমি দূরে এবং ধারণা করা হচ্ছে, এতে চীনের সহায়তা থাকতে পারে। যদিও এটি অর্থনৈতিক প্রকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তবুও এটি গোয়েন্দা ও নজরদারি কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।
বিকল্প করিডর তৈরির পরিকল্পনা
এসব পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ভারত এখন বিকল্প করিডর তৈরির ওপর জোর দিচ্ছে। এর একটি প্রস্তাব হলো হিলি (পশ্চিমবঙ্গ) থেকে মাহেন্দ্রগঞ্জ (মেঘালয়) পর্যন্ত একটি করিডর, যা বাংলাদেশ হয়ে যাবে এবং শিলিগুড়িকে এড়িয়ে চলাচলের সুযোগ করে দেবে। অন্যদিকে তারাপোখর (উত্তর দিনাজপুর) থেকে শকাতি (জলপাইগুড়ি) পর্যন্ত একটি সংক্ষিপ্ত করিডরের প্রস্তাবও রয়েছে, যা দূরত্ব কমিয়ে আনবে এবং সুরক্ষা বাড়াবে।
এ ছাড়া শিলিগুড়ির ভেতর দিয়েও ভূগর্ভস্থ টানেল তৈরি করে চলাচলের একটি নিরাপদব্যবস্থা গড়ে তোলার কথাও ভাবা হচ্ছে। টোকিও ও চীনের মতো দেশগুলোর টানেল নির্মাণের অভিজ্ঞতা থেকে ভারত এই প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারে।
পাশাপাশি ভারত এখন মায়ানমার হয়ে বিকল্প রুট তৈরি করতে ‘কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট প্রকল্প’ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে কলকাতা থেকে মিজোরাম পর্যন্ত নদী ও সড়কপথের সংযোগ তৈরি হবে। কালাদান হলো ভারতের পূর্ব মিজোরাম রাজ্য এবং মায়ানমারের চিন ও রাখাইন রাজ্যের মধ্যে প্রবাহিত একটি নদী। প্রকল্পটি কলকাতা সমুদ্রবন্দরকে মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সিত্তওয়ে সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত করবে।