ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মেক্সিকান ভোটাররা প্রায় দুই হাজার ৬০০ জন বিচারক এবং ম্যাজিস্ট্রেট নির্বাচন করবেন, যার মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট এবং শত শত অন্যান্য ফেডারেল, রাজ্য এবং স্থানীয় ট্রাইব্যুনালে বিচারকরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
রবিবার (১ জুন) মেক্সিকান ভোটাররা এই কঠিন কাজের মুখোমুখি হবেন। এর মাধ্যমে দুই দফায় দেশের প্রায় সাত হাজার বিচারক সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন।
এই নির্বাচন দেশটির বিচার বিভাগকে নিয়োগ-ভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে এমন একটি ব্যবস্থায় নিয়ে যাবে, যেখানে ভোটাররা সরাসরি তাদের বিচারকদের নির্বাচন করবেন।
বিগত শতাব্দীর রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারপন্থিরা বলছেন, এই ব্যবস্থা রাষ্ট্রকে আরও গণতান্ত্রিক করে তুলবে। এক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির মতো সমস্যাগুলো সহজেই মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে, সমালোচকরা বলছেন, এটি শাসকদলকে আরও ক্ষমতা দেওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ একটি উদ্যেগ। এছাড়া এই ব্যবস্থা আদালতগুলোকে যাদের অভিজ্ঞতা এবং যোগ্যতার অভাব রয়েছে, অথবা অপরাধী গোষ্ঠী দ্বারা প্রভাবিত এমন প্রার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেবে।
তবে পরীক্ষামূলক এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পর আসলে এটি কীভাবে কাজ় করবে, তা আগেই বলা কঠিন।
মেক্সিকোর বিচারক নির্বাচন সম্পর্কে আপনার যা জানা উচিত, এটি কীভাবে কাজ করে এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
মেক্সিকোর ক্ষমতাসীন দল মোরেনা বলছে, দেশটির বর্তমান বিচারব্যবস্থায় বিচারকেরা দুর্নীতিগ্রস্ত। তাই সরাসরি জনগণের ভোটে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক থেকে শুরু করে আপিল আদালতের সদস্য এবং সব স্তরের বিচারক নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটি। এ বিষয়ে একটি আইনও পাস করেছে দেশটির পার্লামেন্ট।
মেক্সিকানরা কেন বিচারকদের নির্বাচনে ভোট দিচ্ছে?
এই নির্বাচন একটি বিতর্কিত প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পরিণতি যেখানে ক্ষমতাসীন দল মোরেনা এবং তার মিত্ররা গত বছর আদালত ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য সংবিধান সংশোধন করেছে।
জনসাধারণের ভোটে বিচারক নির্বাচনের ধারণাটি আসে সাবেক প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস ম্যানুয়েল লোপেজ ওব্রাডোর কাছ থেকে। যা তার উত্তরসূরী বর্তমান প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেইনবাউম সেটি সমর্থন করেছিলেন।
দেশটির ফেডারেল বিচারকরা সেই সরকারের কিছু পরিকল্পনা - যেমন মেক্সিকোর নির্বাচনী নজরদারি সংস্থাকে দুর্বল করা এবং ন্যাশনাল গার্ডকে সামরিক নিয়ন্ত্রণে আনা ও বাধাগ্রস্ত করার উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে তার কিছু প্রকল্প স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়ার পর লোপেজ ওব্রাডর এই পরিকল্পনাটি এগিয়ে নেন।
এই রায়গুলো আসার পর লোপেজ ওব্রাডর ক্ষুব্ধ হয়ে এগুলো রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেন। এর পরই গত বছরের সাধারণ নির্বাচনে দলটি বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে জয়ী হয়ে আদালত ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর জন্য সাংবিধানিক পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, বিশ্বের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র দেশ হিসেবে সরাসরি জনগণের ভোটে সব স্তরের আদালতের বিচারক নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মেক্সিকো। তবে এর আগে ২০০৯ সালে বলিভিয়া কিছু বিচারকের জন্য এ ধরণের নির্বাচনব্যবস্থা চালু করেছিল। কিন্তু এই নির্বাচনে অনেক ভোটারই খালি ব্যালট জমা দিয়েছিলেন। ফলে প্রক্রিয়াটি তখন থেকে আপাতত স্থগিত আছে।
এছাড়া সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো কিছু দেশেও স্থানীয় বা পরোক্ষভাবে বিচারকদের নির্বাচন করা হয়। কিন্তু জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে পুরো বিচারব্যবস্থায় বিচারক নির্বাচন করা একমাত্র দেশ হতে যাচ্ছে মেক্সিকো।
চলুন, এই সংস্কারের কিছু বড় দিক জেনে নিই-
বিচারকদের নির্বাচন যেভাবে হবে
সংস্কারের প্রস্তাব অনুযায়ী, বিচারক পদে দাঁড়ানোর জন্য একজন ব্যক্তির শুধু আইনের ডিগ্রি, ভালো ফল এবং বিচারিক ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা (যা স্পষ্ট করে বলা হয়নি) থাকতে হবে। এ ছাড়া যেকোনো ব্যক্তির কাছ থেকে একটি সুপারিশপত্রও লাগবে।
প্রার্থীদের আবেদন একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি দ্বারা যাচাই-বাছাই করা হবে। কিছু ক্ষেত্রে চূড়ান্ত প্রার্থীদের নাম লটারি করে বেছে নেওয়া হবে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের জন্য ১০ বছরের অভিজ্ঞতা দরকার হবে।
কিন্তু এই নির্বাচন ঘিরে অনেক প্রশ্নের ঘুরপাক খাচ্ছে। যেমন ব্যালটে কতজনের নাম থাকবে? শত শত, এমনকি হাজার হাজার অপরিচিত ব্যক্তি এসব পদের জন্য লড়তে পারেন। ভোটাররা কি এত প্রার্থীর জীবনবৃত্তান্ত যাচাই করবেন, নাকি রাজনৈতিক দলগুলো শুধু তাদের পছন্দের প্রার্থীদের তালিকা সমর্থকদের হাতে তুলে দেবে?
এ ছাড়া প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণার খরচ কে বহন করেছে, তা পরিষ্কার নয়। যদিও প্রস্তাবে প্রচারণার খরচ ও সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, তবে যারা বিচারক প্রার্থীদের অর্থায়ন করতে রাজি হন, তাদের হয়তো আদালতের মামলায় বিশেষ স্বার্থ থাকতে পারে।
এছাড়া ভোটারদের জন্য একটি প্রধান উদ্বেগের বিষয় হলো, ভোট প্রদানের জটিলতা। যেমন মেক্সিকো সিটির জনগণকে স্থানীয় ও ফেডারেল বিচারকদের জন্য ৯টি ব্যালট দেওয়া হবে। কিন্তু প্রথম পর্যায়ে সাত হাজার বিচারকের মধ্যে দুই হাজার ৬০০ জন নির্বাচিত হবেন। বাকিরা ২০২৭ সালে দ্বিতীয় পর্যায়ের আরেকটি নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন।
নির্বাচনের পরেই সুপ্রিম কোর্টের বিচারকের সংখ্যা ১১ জন থেকে কমিয়ে ৯ জন করা হবে এবং তাদের মেয়াদ ১৫ বছর থেকে কমিয়ে ১২ বছর করা হবে।
মেক্সিকোর স্থানীয় এল ইউনিভার্সাল ও এল পাইস সংবাদপত্রের জরিপ অনুসারে, মাত্র অর্ধেক ভোটার এই নির্বাচনের তারিখ জানেন এবং ১০ জনের মধ্যে মাত্র চারজন নিশ্চিত করেছেন, তারা ভোট দিতে যাবেন (শতকরা ৪০ শতাংশ)।
তবে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেইনবাউম ভোটাররা কম অংশগ্রহণ করবেন এমন আশঙ্কাকে গুরুত্ব দেননি। এই অভিজ্ঞ বামপন্থি নেত্রী বলেন, ‘মানুষ খুব বুদ্ধিমান এবং তারা জানে, কাকে ভোট দেবেন।’
বর্তমানে মেক্সিকোতে বিচারক যেভাবে হন
বর্তমানে বিচারক ও আদালতের সচিবরা (সহকারী বিচারকদের মতো) নিয়মিত পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন কমিটির মাধ্যমে উচ্চ পদে উন্নীত হন।
বর্তমান ব্যবস্থায় স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ রয়েছে এবং এতে দুর্নীতিগ্রস্ত বিচারকদের শাস্তির আওতায় পড়ে না। তাছাড়া, কিছু বিচারক আইনসভা বা নির্বাহী শাখা দ্বারা মনোনীত বা নির্বাচিত হন।
মেক্সিকোর ক্ষমতাসীন দল মোরেনা বলছে, ভোটাররা বিচারক নির্বাচন করলে তারা দায়িত্বশীল হবেন এবং খারাপ বিচারকদের শাস্তি দেওয়াও সহজ হবে। তবে দুর্নীতিগ্রস্ত বিচারকরাই যে মেক্সিকোর একমাত্র সমস্যা, তা নয়। অভিযোগ আছে, মেক্সিকোর পুলিশ এবং আইনজীবীরা এতটাই অদক্ষ ও রাজনৈতিক চাপে থাকেন যে ৯০ শতাংশের বেশি অপরাধের বিচার আদালতেই আসে না।
ফলাফল কখন জানা যাবে?
মেক্সিকোতে কাগজের ব্যালট ব্যবহার করে ভোট দেওয়া হয় এবং সেগুলো সব হাতে গণনা করতে হয়। চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণ করতে দেশব্যাপী ১৫ জুন ভোট গণনা করা হবে। সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এবং দ্য ইকোনমিস্ট
সুলতানা দিনা/অমিয়/