দক্ষিণ সিরিয়ায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৫৯৪ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে পর্যবেক্ষণ সংস্থা সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস (SOHR)। যুক্তরাজ্যভিত্তিক এই মানবাধিকার সংস্থাটি জানায়, রবিবার (১৩ জুলাই) থেকে সুইদা প্রদেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ সহিংসতায় নিহতদের মধ্যে রয়েছে সংখ্যালঘু দ্রুজ সম্প্রদায়ের ৩০০ জন, যার মধ্যে ১৪৬ জন যোদ্ধা এবং ১৫৪ জন সাধারণ নাগরিক। এই ১৫৪ জনের মধ্যে ৮৩ জনকে সিরিয়ার সরকারি বাহিনী সরাসরি গুলি করে হত্যা করেছে বলে দাবি সংস্থাটির।
এ ছাড়া সরকারপন্থী বাহিনীর ২৫৭ সদস্য এবং ১৮ জন বেদুইন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন বলে জানানো হয়। দ্রুজ যোদ্ধাদের হাতে নিহত হয়েছেন আরও তিনজন বেদুইন বেসামরিক নাগরিক।
দ্রুজ ও সুন্নী বেদুইন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ থেকেই মূলত এই সংঘর্ষের সূচনা হয়। এর মধ্যেই দ্রুজদের পক্ষ হয়ে সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর ওপর ইসরায়েলি বিমান হামলায় আরও ১৫ সেনা নিহত হয় বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। ইসরায়েল জানায়, দ্রুজ সম্প্রদায়কে রক্ষা এবং সরকারি বাহিনীকে সুইদা থেকে সরিয়ে দিতেই তারা এ হামলা চালায়।
তবে সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস এর দেওয়া এই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। একাধিক নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, সংঘর্ষে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ৩০০। আরেক পর্যবেক্ষক সংস্থা সিরিয়ান নেটওয়ার্ক ফর হিউম্যান রাইটস (SNHR) জানায়, তারা অন্তত ১৬৯ জন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ জুলাই) দিনভর সরকারি বাহিনীর সুইদা শহর থেকে সরে যাওয়ার পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়ে আসে। তবে স্থানীয়রা জানায়, শহরের বিভিন্ন স্থানে এখনো ক্ষয়ক্ষতি, লুটপাটের চিহ্ন এবং রাস্তায় পড়ে থাকা মরদেহ দেখা যাচ্ছে।
সংঘর্ষের পর গত সোমবার (১৪ জুলাই) থেকে শহরে ঢুকতে শুরু করে সিরিয়ার ইসলামপন্থি নেতৃত্বাধীন সরকারের যোদ্ধারা। সরকার দাবি করে, সহিংসতা থামাতেই তারা সেখানে গেছে। তবে এতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় এবং দ্রুজ সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরেই বিভাজন দেখা দেয়।
দ্রুজরা শিয়া ইসলামের একটি উপধারা হলেও তাদের রয়েছে স্বতন্ত্র ধর্মীয় বিশ্বাস ও পরিচয়।
বুধবার (১৬ জুলাই) সন্ধ্যায় সিরিয়ার সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয় এবং বাহিনী প্রত্যাহার শুরু করে। তবে দ্রুজ সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী নেতা শেখ হিকমত আল-হাজরি এই যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘আমাদের প্রদেশকে সরকার-সমর্থিত গ্যাংদের কবল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত না করা পর্যন্ত যুদ্ধ চলবে।’ তিনি আরও জানান, তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করছেন। যদিও দ্রুজদের অন্য একটি অংশ নতুন ইসলামপন্থি সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার পক্ষে রয়েছে।
উল্লেখ্য, ইসরায়েল ও অধিকৃত গোলান মালভূমিতেও একটি বড় দ্রুজ জনগোষ্ঠী রয়েছে।
বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের স্বার্থ বজায় রাখতে ভবিষ্যতেও তারা শক্তি প্রয়োগ করবে। দ্রুজদের রক্ষা এবং সিরীয় সেনাদের দক্ষিণাঞ্চলে মোতায়েন ঠেকাতেই আমরা হস্তক্ষেপ করেছি। আমাদের নীতিও তাই, দক্ষিণ দামেস্কে সিরীয় বাহিনী ঢুকতে দেওয়া হবে না এবং দ্রুজদের কোনো ক্ষতি সহ্য করা হবে না।’
বুধবার সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে ইসরায়েলি বিমান হামলায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বোমার আঘাত লাগে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের কাছাকাছিও - যা গত ডিসেম্বর বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর থেকে ইসরায়েলি হামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
বুধবার রাতে টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে সিরিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা বলেন, ‘আমরা আমাদের ভূখণ্ডের ঐক্য, জাতির সম্মান এবং জনগণের দৃঢ়তা রক্ষার এক কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। ইসরায়েল বরাবরের মতোই আমাদের স্থিতিশীলতাকে টার্গেট করেছে এবং এখন আবার আমাদের পবিত্র ভূমিকে বিশৃঙ্খলার মঞ্চে পরিণত করতে চাইছে।’
তিনি দ্রুজ সম্প্রদায়ের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনাদের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষা করা আমাদের শীর্ষ অগ্রাধিকার। আমরা দেশি বা বিদেশি - কারও পক্ষ থেকে বিভাজনের কোনো চেষ্টাই বরদাশত করব না।’
এদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান জানিয়েছেন, দক্ষিণ সিরিয়ার সুইদা শহরের সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনায় তার দপ্তর বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পেয়েছে—যা ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনের প্রমাণ বহন করে, যার মধ্যে তাৎক্ষণিক মৃত্যুদণ্ড ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডও রয়েছে।
ভলকার টুর্ক এক বিবৃতিতে বলেন, অভিযুক্তদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং স্থানীয় দ্রুজ ও বেদুইন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরাও রয়েছেন।
তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘এই রক্তপাত ও সহিংসতা বন্ধ হতেই হবে। যারা এর জন্য দায়ী, তাদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’ সূত্র: বিবিসি
মাহফুজ/