ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশটির ইতিহাসে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করলেন। তিনি এখন স্বাধীন ভারতের দ্বিতীয় দীর্ঘতম সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী। এই অর্জনের পথে তিনি ১৯৬৬ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা ইন্দিরা গান্ধীর রেকর্ডকে পেছনে ফেলেছেন।
ইন্দিরা গান্ধী দুই মেয়াদে মোট ৫ হাজার8২৯ দিন দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নরেন্দ্র মোদি ২০২৫ সালের ২৫ জুলাইতে সেই সংখ্যা অতিক্রম করেছেন। এখন তার দায়িত্ব পালন পর্ব দাঁড়াল ৫ হাজার ৮৩১ দিন।
এই মাইলফলকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী মোদি দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর পরে ভারতের ইতিহাসে দ্বিতীয় দীর্ঘতম টানা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী।
নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ২০০১ গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে। থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত একটানা গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার পর, তিনি ২০১৪ সালের ২৬ মে দেশের ১৫তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
তার নেতৃত্বে বিজেপি প্রথমবার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রে সরকার গঠন করে। তারপর ২০১৯ সালে আরও বড় ম্যান্ডেট নিয়ে তিনি আবার ক্ষমতায় ফেরেন। ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এই নেতা অ-কংগ্রেসি দলগুলোর মধ্যেও সবচেয়ে দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
মোদির সামনে এখন আরেকটি বড় রেকর্ড ভাঙার অপেক্ষা। ভারতে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জওহরলাল নেহরু মেয়াদ অতিক্রম করা। নেহরু প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ৬ হাজার ১৩০ দিন প্রধানমন্ত্রী। সেই সংখ্যা ছুঁতে মোদিকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকতে হবে ২০২৯ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃতীয়বার জয়ী হয়ে মোদি সেই লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছেন।
২০১৪ সালে ‘আচ্ছে দিন’ ও ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’-এর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা নরেন্দ্র মোদি ভারতীয় রাজনীতিতে এক নতুন ধারার সূচনা করেন। তার নেতৃত্বে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে এক বিশাল রূপান্তর প্রত্যক্ষ করছে ভারত।
নরেন্দ্র মোদির শাসনকালকে ভারতের অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের যুগ বলে অভিহিত করছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। কোভিড মহামারির ধাক্কা সামলে ২০২১-২২ অর্থবছরে বৃদ্ধি হয় ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতি। বর্তমানে ভারতের নামমাত্র জিডিপি ৩.৯ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং ২০২৭-এর মধ্যে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
মোদির ডিজিটাল পুশে ইউপিআই-এর মাধ্যমে দৈনিক ৬৫০ মিলিয়নের বেশি লেনদেন হচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম হিসেবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) প্রশংসা করেছে।
এছাড়া, ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। অ্যাপল, স্যামসাং ও টেসলার মতো কোম্পানিগুলো ভারতে উৎপাদন ইউনিট খুলেছে। এমএসএমই খাতে প্রায় ৭ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে মোদি জমানায়।
প্রতি বছর ১০০ কিমি’র বেশি এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী গতি শক্তি যোজনায় রেল, রাস্তা, বন্দর ও বিমানবন্দর উন্নয়নে বিপুল বরাদ্দ। সড়ক মন্ত্রণালয়ের মতে, ২০২৫-এর মধ্যে ভারতের জাতীয় সড়কের দৈর্ঘ্য ২ লাখ কিমি ছাড়াবে।
মোদি শাসনে কিছু ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ভারতকে এক নতুন পথে পরিচালিত করেছে। জম্মু-কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা রদ, তিন তালাক নিষিদ্ধকরণ, রাম মন্দির নির্মাণের কাজের অগ্রগতি, সিএএ, ইউনিফর্ম সিভিল কোড-এর মতো দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত নীতিগত প্রশ্নে দৃষ্টান্তমূলক অবস্থান।
রাজনৈতিক মহলের মতে, বিরোধীদের অভিযোগ থাকলেও মোদি তার তৃণমূল জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছেন। কৃষক আন্দোলন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোর প্রশ্নে আন্তর্জাতিক স্তরেও বিতর্ক হয়েছে। তবে তার সুশাসনের মডেল ও প্রশাসনিক দক্ষতা সাধারণ মানুষের আস্থায় ভরসা জুগিয়েছে।
নরেন্দ্র মোদি এখন কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নন— বরং একটি যুগের প্রতিনিধি। তিনি ভারতের সমকালীন ইতিহাসে এক ‘প্যারাডাইম শিফট’ নিয়ে এসেছেন, যেখানে উন্নয়ন, জাতীয়তাবাদ, কৌশলগত সাহসিকতা ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি একসঙ্গে হাত ধরে চলছে।
এ নিয়ে এখন আর কোনো সন্দেহ নেই যে, হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপি বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল যারা বর্তমানে কোনো চ্যালেঞ্জ ছাড়াই ভারত শাসন করছে।
অন্যদিকে, ভারতের স্বাধীনতার নেতৃত্ব দেওয়া কংগ্রেস ক্রমান্বয়ে কিছুটা দুর্বল হচ্ছে। এক সময়কার মহা-প্রতাপশালী এই দলটি প্রধান বিরোধী দল হিসেবে যেন তাদের রাজনৈতিক শক্তি এবং সম্ভাবনা অনেকটাই নি:শেষ করে ফেলছে।
সুলতানা দিনা/