গতকাল রবিবার (১০ আগস্ট) গভীর রাতে গাজা সিটির আল-শিফা হাসপাতালের প্রধান ফটকের পাশে সাংবাদিকদের জন্য স্থাপিত একটি তাঁবুতে ইসরায়েলি হামলায় কেঁপে ওঠে এলাকা।
মানুষ সাহায্যে এগিয়ে গেলে দেখা যায়, আল জাজিরার পাঁচজন সংবাদকর্মী নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ছিলেন গাজার অন্যতম পরিচিত মুখ আনাস আল-শরীফ।
প্রশ্ন উঠেছে—কেন সাংবাদিকদের টার্গেট করল ইসরায়েল? কী ঘটেছিল সেদিন রাতে?
কারা নিহত হয়েছেন?
আল জাজিরার গাজা প্রতিনিধি আনাস আল-শরীফ (২৮) প্রায় ২২ মাস ধরে গাজার বাস্তবতা তুলে ধরে আসছিলেন। জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেওয়া এই সাংবাদিক আল-আকসা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। তিনি দুই সন্তানের জনক ছিলেন। গত ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ইসরায়েলি বিমান হামলায় তার বাবার মৃত্যু হয়।
গাজা সিটির শুজাইয়া পাড়ার বাসিন্দা আল জাজিরার আরেক প্রতিবেদক মোহাম্মদ কুরেইকেহ (৩৩) নিজের শেষ সরাসরি সম্প্রচার শেষ করার কিছুক্ষণের মধ্যেই নিহত হন। ১৯৯২ সালে জন্ম নেওয়া কুরেইকেহ ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব গাজা থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। চলতি বছরের মার্চে ইসরায়েলি হামলায় তার ভাই করিম নিহত হন।
জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরের আল জাজিরার ক্যামেরাম্যান ইব্রাহিম জাহের (২৫) এবং একই শিবিরের আরেক ফটোগ্রাফার মোহাম্মদ নুফাল (২৯) নিহতদের মধ্যে ছিলেন। নুফালের মা ও এক ভাই আগে আরেক ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন; তার আরেক ভাই ইব্রাহিমও আল জাজিরায় ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করেন।
নিহত সাংবাদিক আনাস আল-শরীফ। ছবি: সংগৃহীত
নিহত হওয়ার সময় কী করছিলেন তারা?
রবিবার রাত ১১টার দিকে আল-শিফা হাসপাতালের মূল ফটকের কাছে তাঁবুর ভেতর কাজ করছিলেন তারা। গাজার সাংবাদিকেরা বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সুবিধার জন্য হাসপাতালসংলগ্ন এলাকায় কাজ করে আসছিলেন—যা যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই সবারই জানা।
সাংবাদিক হানি মাহমুদ জানান, “আমি হাসপাতাল থেকে এক ব্লক দূরে ছিলাম। প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শুনে দেখি আকাশ আলোয় ভরে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই খবর আসে সাংবাদিকদের তাঁবুতেই আঘাত হেনেছে।”
প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিক আমের আল-সুলতান বলেন, “দৌড়ে গিয়ে দেখি ধ্বংসস্তূপে সহকর্মীরা পড়ে আছেন। আনাস আল-শরীফ মাটিতে, আর মোহাম্মদ কুরেইকেহ আগুনে জ্বলছেন। আমরা টেনে বের করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করি।” কিন্তু হাসপাতালে নেওয়ার আগেই কুরেইকেহ মারা যান।
আরেক সাংবাদিক মোহাম্মদ কুইতা বলেন, “আমরা জানতাম আনাসই টার্গেট… তিনি আমাদের কণ্ঠস্বর ছিলেন।”
হত্যার পর ইসরায়েলের ব্যাখ্যা কী?
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে যে তারা আনাস আল-শরীফকে টার্গেট করে হত্যা করেছে, দাবি করেছে তিনি সাংবাদিক নন, বরং হামাসের একজন সশস্ত্র কমান্ডার ছিলেন। তাদের অভিযোগ - আল-শরীফ ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিক ও সেনাদের বিরুদ্ধে রকেট হামলা পরিচালনা করতেন। তবে এর কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেনি ইসরায়েল।
ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর বিশ্লেষক মোহাম্মদ শেহাদা বলেন, “কোনো প্রমাণ নেই এই অভিযোগের পক্ষে। তার প্রতিদিনের কাজ ছিল সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবেদন করা।”
গত ২২ মাসে বহুবার ইসরায়েল সাংবাদিক হত্যার পক্ষে একই ধরনের দাবি করেছে, যা স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের অধিকার বিষয়ক সংগঠনগুলো বারবার খণ্ডন করেছে। এর আগে আল জাজিরার ব্যুরো প্রধান ওয়ায়েল দাহদুহের ছেলে হামজা দাহদুহ ও সাংবাদিক হুসাম শাবাতকেও হত্যা করে একই অভিযোগ তোলে ইসরায়েল।
আল জাজিরার প্রতিক্রিয়া
আল জাজিরা এই হত্যাকাণ্ডকে “টার্গেটেড হত্যাকাণ্ড এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আরেকটি সুস্পষ্ট ও পূর্বপরিকল্পিত হামলা” বলে নিন্দা জানিয়েছে।
তাদের বিবৃতিতে বলা হয়, নিহত সাংবাদিকরা গাজার ভেতরে থেকে বিশ্বের কাছে নিরপেক্ষ ও প্রত্যক্ষ চিত্র তুলে ধরছিলেন। ইসরায়েল অক্টোবর ২০২৩ থেকে বিদেশি সংবাদমাধ্যমকে গাজায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও আল জাজিরার সাংবাদিকেরা অবরুদ্ধ এলাকায় থেকে নিরন্তর বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন।
কেন আনাস আল-শরীফকে টার্গেট করা হলো?
আনাস আল-শরীফ ছিলেন গাজার অন্যতম প্রধান সংবাদমুখ, যিনি ইসরায়েলি নৃশংসতা অকপটে তুলে ধরতেন। মাসের পর মাস ইসরায়েলি কর্মকর্তারা তাকে হুমকি দিয়ে আসছিলেন, তবে তিনি উত্তর গাজা ছেড়ে যেতে অস্বীকার করেন।
জাতিসংঘের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক আইরিন খানসহ বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা আনাস আল-শরীফের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরায়েল তাকে নিয়ে অপপ্রচার চালায় ইসরায়েল এবং দখলদার সেনাবাহিনীর মুখপাত্র আভিখাই আদ্রেয়ি প্রকাশ্যে আনাস আল-শরীফের নাম উল্লেখ করে ভিডিও প্রকাশ করেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাবেক নির্বাহী পরিচালক কেন রথ বলেন, “এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটি স্পষ্টতই টার্গেটেড কিলিং”
গাজার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েল প্রায় ২৭০ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীকে হত্যা করেছে। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/