সীমান্তে দুই দেশের ব্যাপক সংঘর্ষের পর বর্তমানে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের সামরিক বাহিনী। গত শনিবার রাতের সংঘর্ষে আফগানিস্তান ৫৮ পাকিস্তানি সেনাকে হত্যার দাবি করেছে। বিপরীতে ইসলামাবাদের দাবি, সংঘর্ষে তালেবান সেনা, অন্যান্য অস্ত্রধারীসহ ২০০ নিহত হয়েছেন।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা বলছে, গত শনিবার রাত ১০টার দিকে আফগান বাহিনী পাকিস্তানের সীমান্তচৌকিতে হামলা চালায়। সংঘর্ষের স্থানগুলোর মধ্যে ছিল আঙুর আদা, বাজৌর, খুররম, দির, চিত্রাল (খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশ) ও বাহরাম চাহ (বেলুচিস্তান) অঞ্চল।
তালেবান মুখপাত্র মুজাহিদ জানান, আফগান বাহিনী ৫৮ জন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করেছে। ২৫টি সেনা ফাঁড়ি দখল করেছে এবং ৩০ জন সেনাকে আহত করেছে। কাবুলে এক সংবাদ সম্মেলনে মুজাহিদ জানান, আফগানিস্তানের সব সীমান্ত ও ডি ফ্যাক্টো লাইনের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অবৈধ কার্যক্রম বহুলাংশে প্রতিরোধ করা হয়েছে।
গত রবিবার আফগানিস্তানের টোলোনিউজ চ্যানেল জানায়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কুনার প্রদেশের ২ হাজার ৬৪০ কিলোমিটার (১,৬৪০ মাইল) সীমান্তে (যা ঔপনিবেশিক আমলের ডুরান্ড লাইন নামেও পরিচিত) বেশ কয়েকটি এলাকায় ট্যাংক ও ভারী অস্ত্র মোতায়েন করছে।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের ইন্টার সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস (আইএসপিআর) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা আত্মরক্ষার স্বার্থে পাল্টা হামলা চালায়। এতে বেশ কয়েকটি তালেবান ঘাঁটি ধ্বংস হয়। এর পাশাপাশি তারা আফগান সীমান্তের অন্তত ২১টি সেনাচৌকি অস্থায়ীভাবে দখল করেছে। এ সংঘর্ষে ২৯ জন পাকিস্তানি সেনা আহত হন।
এক সময়ের মিত্র দুই পক্ষের মধ্যে যেভাবে সংঘর্ষের সূচনা হলো এবং পরবর্তী পরিস্থিতি যেদিকে যেতে পারে
গত বৃহস্পতিবার দুটি বিস্ফোরণে থরথর করে কেঁপে ওঠে রাজধানী কাবুল ও সীমান্তবর্তী পাকতিকা প্রদেশ। পরদিন শুক্রবার তালেবান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পাকিস্তানকে আফগানিস্তানের সার্বভৌম লঙ্ঘনের জন্য অভিযুক্ত করে। তালেবান সরকার বলছে, গত বৃহস্পতিবার পাকিস্তান বিমান হামলা চালিয়েছে। এরপর গত শনিবার রাতে সেটির জবাব দিয়েছেন তালেবান সেনারা। তাদের পক্ষ থেকে এই আক্রমণকে প্রতিশোধমূলক বলে আখ্যা দেওয়া হয়।
আলজাজিরা জানায়, আফগানিস্তান বিমান হামলার জন্য পাকিস্তানকে দোষারোপ করার পর পাকিস্তান এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পাকিস্তানের অভিযোগ, তালেবান প্রশাসন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি যোদ্ধাদের প্রশ্রয় দিচ্ছে। তবে কাবুল এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। যদিও বিমান হামলার অভিযোগ নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেয়নি ইসলামাবাদ।
জানা গেছে, আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কুনার প্রদেশের দুই হাজার ৬৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় ট্যাঙ্ক ও ভারী অস্ত্র মোতায়েন করেছে। এই সীমান্তেই ঔপনিবেশিক যুগের ডুরান্ড লাইন অবস্থিত।
একজন পাকিস্তানি নিরাপত্তা কর্মকর্তা সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে জানান, কাবুলে বিমান হামলা চালানো হয়েছে এবং তাদের লক্ষ্য ছিল টিটিপি নেতা নূর ওয়ালি মেহসুদ। একটি গাড়িতে থাকা অবস্থায় মেহসুদকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়।
পাকিস্তান ও আফগান তালেবান সরকার এক সময় যৌথ নিরাপত্তা স্বার্থের কারণে মিত্র ছিল। তবে এখন ইসলামাবাদের অভিযোগের কারণে দুই পক্ষ শত্রুভাবাপন্ন হয়ে উঠেছে।
ইসলামাবাদভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দুই দেশের সংঘাতে অন্তত দুই হাজার ৪১৪ জন নিহত হয়েছে। গত বছর সীমান্ত সংঘাতে উভয় পক্ষের দুই হাজার ৫৪৬ জন নিহত হয়।
তাছাড়া পাকিস্তান আফগান শরণার্থীদের বিতাড়িত করার পর থেকে টিটিপি আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। কয়েক দশকের সংঘাত থেকে পালিয়ে অন্তত ৩০ লাখ আফগান শরণার্থী এখন পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, টিটিপির সাম্প্রতিক হামলার প্রতিশোধ নিতেই পাকিস্তান আফগান ভূখণ্ডে হামলা চালিয়েছে।
তালেবান যদি টিটিপিকে নিয়ন্ত্রণে না রাখে, তাহলে পাকিস্তান সরাসরি তাদের ভূখণ্ডে হামলা চালাবে—এ ধরনের গুঞ্জন আগে শোনা গিয়েছিল। কিন্তু টিটিপির প্রতি তালেবানের সহানুভূতি থাকায় কাবুল প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি পদক্ষেপ নেবে না বলেই মনে করা হচ্ছে।
এমন প্রেক্ষাপটেও অনুমান করা যায়, সংঘাত আরও বড় আকারে গড়ানোর সম্ভাবনা খুব কম। কারণ, আফগানিস্তানের প্রচলিত যুদ্ধক্ষমতা পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনীয় নয়।
কাবুলভিত্তিক বিশ্লেষক ইব্রাহিম বাহিস জানান, দুই দেশই এখন উত্তেজনা কমাতে আগ্রহী। পাকিস্তান ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় ব্যস্ত আর আফগান সরকারও অভ্যন্তরীণ সমর্থন ধরে রাখতে চাইছে।
সুলতানা দিনা/