লোহিত সাগরের তীরবর্তী ও আফ্রিকার উত্তরের দেশ সুদানে ২০২৩ সালের এপ্রিল মাস থেকে যে সর্বাত্মক সংঘাত শুরু হয়েছে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো তাকে আধুনিক বিশ্বের অন্যতম জটিল ও ভয়াবহ মানবিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এই সংঘাত কেবল সুদানিজ আর্মড ফোর্সেস (সুদানের সামরিক বাহিনী) এবং আধা-সামরিক র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ-RSF)-এর মধ্যে ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি মূলত বহু দশকের জমে থাকা সামরিক শাসনের সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাত এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ফল। এই গৃহযুদ্ধ দেশটির গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে গলা টিপে হত্যা করেছে, যার ফলে পুরো অঞ্চলটিই এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
ক্ষমতার দ্বন্দ্ব: যুদ্ধের মূল কারণ
সুদানে রক্তপাতের মূল কারণ খুঁজতে গেলে ঘটনার একটি ক্রমিক বিন্যাস অনুসরণ করা জরুরি, যা আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা তুলে ধরেছেন।
১. সামরিক অভ্যুত্থান ও ভঙ্গুর অংশীদারত্ব (২০২১)
২০১৯ সালে দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক ওমর আল-বশিরকে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করার পর সুদানে একটি বেসামরিক-সামরিক যৌথ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। এই সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার একটা ক্ষীণ আশা দেখা যায়।
কিন্তু ২০২১ সালের অক্টোবরে সেনাপ্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান এবং RSF প্রধান জেনারেল মোহাম্মদ হামদান দাগালো (হেমদতি) সেই বেসামরিক সরকারকে উৎখাত করে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটান।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো তখনই সতর্ক করেছিল যে, এই অভ্যুত্থান সামরিক নেতাদের মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে আরও গভীর ফাটল তৈরি করবে।
২. আরএসএফ-কে সেনাবাহিনীতে একীভূত করার ব্যর্থতা
সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো আধা-সামরিক RSF কে সুদানিজ আর্মড ফোর্সেস বা সুদানের মূল সামরিক বাহিনীর সঙ্গে পুরোপুরি একীভূত করার প্রক্রিয়া নিয়ে বুরহান এবং হেমদতির মধ্যে মতপার্থক্য।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপে একটি চুক্তির অধীনে এই একীভূতকরণের কথা ছিল। বিবিসি নিউজ সহ একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, হেমদতি তার বিশাল এবং সম্পদশালী বাহিনীকে বুরহানের কমান্ডের অধীনে বিলীন করতে রাজি ছিলেন না। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সময়কাল নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। হেমদতি সামরিক বাহিনীর ভেতরে নিজের প্রভাব ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা হারানোর ভয় পাচ্ছিলেন, যা সংঘাতকে অনিবার্য করে তোলে।
৩. অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও স্বর্ণের রাজনীতি
RSF এর ক্ষমতা ও অর্থের প্রধান উৎস হলো সুদানের সোনার খনিগুলোর ওপর হেমদতির ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর মতো পত্রিকাগুলো প্রতিবেদন করেছে, হেমদতির পরিবার ও তার ঘনিষ্ঠজনরা এই সোনার ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জন করেছে, যা RSF এর জন্য অস্ত্র ও রসদ সরবরাহের মূল ভিত্তি।
এই অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য নিয়ে RSF এর সঙ্গে হেমদতির দীর্ঘদিন ধরে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছিল। সামরিক ক্ষমতা দখলের পাশাপাশি এই মূল্যবান সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাও ছিল হেমদতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
৪. ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসের বিস্ফোরণ
২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল, রাজধানী কার্তুমসহ দেশের বিভিন্ন শহরে সেনাবাহিনী এবং RSF এর মধ্যে তীব্র লড়াই শুরু হয়। দুই পক্ষই প্রথম গুলি ছোড়ার জন্য একে অপরের ওপর দোষ চাপায়। এই সামরিক সংঘাত মুহূর্তের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়, যা দেশের অবকাঠামো ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়।
আন্তর্জাতিক সমর্থন: ছায়াযুদ্ধের মঞ্চ
সুদানের এই সংঘাতকে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর এক ‘ছায়াযুদ্ধের মঞ্চ’ হিসেবে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক। বিবদমান পক্ষগুলো আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কাছ থেকে সামরিক, আর্থিক ও কূটনৈতিক সহায়তা পাচ্ছে।
আরএসএফ-আমিরাতের সম্পর্ক: আরএসএফ এর সবচেয়ে বড় বিদেশি সমর্থক হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)-এর নাম বারবার উঠে এসেছে।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আরব আমিরাত সুদানের প্রতিবেশি দেশ চাদের আমদজারাসে একটি ঘাঁটি তৈরি করেছে, যা আরএসএফ এর কাছে গোপনে অস্ত্র ও ড্রোন সরবরাহের রুট হিসেবে কাজ করছে।
ইউএই আনুষ্ঠানিকভাবে মানবিক সহায়তার কথা বললেও, পশ্চিমা এবং জাতিসংঘ কর্মকর্তারা আরব আমিরাতের গোপন সামরিক সরবরাহের বিষয়ে নিশ্চিত বলে জানা যায়।
আরএসএফ-কে সমর্থন করার পেছনে আরব আমিরাতের আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধি এবং ইয়েমেন যুদ্ধে আরএসএফ-এর ভাড়াটে সৈন্য সরবরাহের মতো পুরনো ঋণ শোধের কারণও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুদানিজ সেনাবাহিনীর সমর্থকরা
সুদানিজ আর্মড ফোর্সেস (এসএএফ)-এর প্রতি প্রধান সমর্থনকারী দেশ হিসেবে মিসরের নাম আসে। ঐতিহাসিকভাবেই মিসর ও সুদানের সেনাবাহিনীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান। সংঘাত শুরু হওয়ার পর সুদানে আটক হওয়া মিসরীয় সৈন্যদের উপস্থিতি এই সম্পর্কের গভীরতা প্রমাণ করে।
এছাড়াও, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস সহ অন্যান্য প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সৌদি আরব সুদানের সেনাবাহিনীকে ইরানি ড্রোন কেনার জন্য অর্থ সরবরাহ করছে। রাশিয়াও প্রথম দিকে আরএসএফ-এর প্রতি সমর্থন দিলেও, পরবর্তীতে তারা সেনাবাহিনীর দিকে ঝুঁকতে পারে বলে কিছু গোয়েন্দা রিপোর্টে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তুরস্কও ঐতিহাসিক এবং সামরিক চুক্তির মাধ্যমে সুদানের সামরিক সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
ইসরায়েলের কৌশলগত ভূমিকা
ইসরায়েল সরাসরি সামরিক সহায়তা না করলেও, তারা সুদানের সামরিক নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। ইসরায়েল কর্তৃক সংঘাতরত পক্ষগুলোকে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানানোর প্রস্তাবকে বিশ্লেষকরা এই অঞ্চলে ইসরায়েলের প্রভাব বিস্তারের একটি কৌশলগত প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেন। দেশটির দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল আরব দেশগুলোর ভেতরের অনারব গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিভাজন তৈরি করে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা দুর্বল করা। বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুট লোহিত সাগরের পাড়ে সুদানের অবস্থান হওয়ার বিশ্ব শক্তিদের আকর্ষণ রয়েছে পোর্ট সুদানের আশপাশে নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্য। এডেন সাগর ও লোহিত সাগরে হুথিদের শক্ত অবস্থান ও হামলা এবার ভুগিয়েছে ইসরায়েল ও পশ্চিমা জাহাজগুলোকে। তাই সুদানেও ইসরায়েলের আগ্রহ রয়েছে।
প্রাণহানি ও মানবিক বিপর্যয়: বিশ্বের বৃহত্তম বাস্তুচ্যুতি সংকট
সুদানের যুদ্ধকে জাতিসংঘ (ইউএন) ‘বিশ্বের বৃহত্তম বাস্তুচ্যুতি সংকট’ এবং ‘মানবতার জন্য এক দুঃস্বপ্ন’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
হতাহতের সংখ্যা
২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে চলমান সংঘাতের কারণে প্রাণহানির সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত করা কঠিন হলেও, যুদ্ধ ও এর সংশ্লিষ্ট কারণে মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে বলে ধারণা করা হয়।
সশস্ত্র সংঘর্ষের অবস্থান ও ইভেন্ট ডেটা প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মে মাস পর্যন্ত কেবল সংঘর্ষে ১৭ হাজার ৪৪ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। ইউএন ওএইচসিএ (OCHA)-এর প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৪ সালের প্রথমার্ধেই কমপক্ষে ৩ হাজার ৩৮৪ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে।
সম্প্রতি আরএসএফ কর্তৃক দারফুরের এল-ফাশের শহর দখলের পর সেখানে গণহারে বেসামরিক হত্যাকাণ্ড এবং জাতিগত নিধনের অভিযোগ উঠেছে, যেখানে ইয়েল হিউম্যানিটারিয়ান রিসার্চ ল্যাব স্যাটেলাইট ইমেজের মাধ্যমে এই নৃশংসতার প্রমাণ পেয়েছে। এল-ফাশেরের একটি হাসপাতালে ৪৬০ জনেরও বেশি রোগী ও সঙ্গীকে হত্যার খবর দিয়েছে ইউএন ওএইচসিএ।
মানবিক সঙ্কট
সংঘাতের তীব্রতায় সুদানের মানবিক পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয় (ইউএন ওএইচসিএ) জানিয়েছে, দেশটির দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ অর্থাৎ প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ মানুষের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন।
বাস্তুচ্যুতি: প্রায় ৯ মিলিয়ন মানুষ দেশের অভ্যন্তরে বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং আরও প্রায় ৪ মিলিয়ন মানুষ প্রতিবেশী দেশগুলোতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম) জানিয়েছে, এল-ফাশের থেকেও হাজার হাজার মানুষ পায়ে হেঁটে পালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
খাদ্য নিরাপত্তা ও দুর্ভিক্ষ: খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ঐতিহাসিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইউএন ওএইচসিএ নিশ্চিত করেছে, দেশের বিভিন্ন অংশে দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি বিরাজ করছে, যেখানে ২৪ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ চরম ক্ষুধার ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থা: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সংঘাত শুরুর পর থেকে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে ১৮৫টিরও বেশি হামলার ঘটনা যাচাই করেছে, যা স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজ করা অসম্ভব করে তুলেছে। হাসপাতালগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় অসংখ্য মানুষ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো এই সংঘাতের বিষয়ে বিশ্বের ‘উদাসীনতা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে অতি জরুরি আন্তর্জাতিক চাপ এবং সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়া সুদানের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।