ইউরোপের একাধিক দেশ ও কানাডা অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের ১৯টি নতুন বসতি অনুমোদনের সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ব্রিটেন, কানাডা, ডেনমার্ক ও ফ্রান্সসহ মোট ১৪টি দেশ বলেছে, এই পদক্ষেপটি অবৈধ এবং এতে গাজায় যুদ্ধবিরতি ও পুরো অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
দেশগুলো বলেছে, ইসরায়েলের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে এবং গাজায় ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।
মধ্যস্থতাকারীরা যখন যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন, তখনই এই পদক্ষেপ নেওয়া হলো। গত দুই বছরে হামলায় ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে প্রায় ৭১ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, বেলজিয়াম, কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, জাপান, মাল্টা, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, স্পেন ও যুক্তরাজ্য—আমরা সবাই অধিকৃত পশ্চিম তীরে ১৯টি নতুন বসতি অনুমোদনের বিষয়ে ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের নিন্দা জানাচ্ছি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যেকোনো ধরনের সংযুক্তিকরণ এবং বসতি সম্প্রসারণ নীতির প্রতি আমাদের স্পষ্ট বিরোধিতার কথা আমরা আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। একই সঙ্গে দেশগুলো যোগ করে, তারা ইসরায়েলকে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার এবং বসতি সম্প্রসারণ বন্ধ করার আহ্বান জানায়।
বিবৃতিতে বলা হয়, ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি তাদের সমর্থন অটল। দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ওপর দাঁড়িয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ, ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী শান্তির প্রতি তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছে তারা।
এর জবাবে বৃহস্পতিবার ইসরায়েল সমালোচনাকে বৈষম্যমূলক বলে আখ্যা দেয়। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সা’আর বলেন, “বিদেশি সরকারগুলো ইসরায়েল ভূমিতে ইহুদিদের বসবাসের অধিকার সীমিত করতে পারবে না। এমন আহ্বান নৈতিকভাবে ভুল এবং ইহুদিদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক।”
গত রবিবার ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ ঘোষণা দেন, কর্তৃপক্ষ বসতি পরিকল্পনাটি অনুমোদন করেছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ভবিষ্যতে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ঠেকাতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের উদ্ধৃতি দিয়ে স্মোটরিচ বলেন, “আমরা বাস্তবে একটি ফিলিস্তিনি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বন্ধ করছি। আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের ভূমিতে উন্নয়ন, নির্মাণ ও বসতি স্থাপন অব্যাহত রাখব।”
স্মোটরিচ আরও জানান, ২০২২ সালের শেষ দিকে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে “নির্মাণের জন্য অনুমোদন দেওয়া বা পূর্ববর্তীভাবে বৈধতা দেওয়া হয়েছে এমন নতুন বসতির সংখ্যা ৬৯টি।”
এ মাসের শুরুতে জাতিসংঘ জানায়, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ, যেগুলোর সবই আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ, ২০১৭ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
জাতিসংঘের মতে, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের বসতি সম্প্রসারণ ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে শান্তি চুক্তির পথে বড় বাধা। কারণ, এসব অবৈধ নির্মাণের ফলে ফিলিস্তিনিদের জন্য ধারাবাহিক ভূখণ্ড অবশিষ্ট থাকে না, যা দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের আওতায় একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজন।
আল জাজিরার বরাতে জানা যায়, ইসরায়েলি সরকারের এই সিদ্ধান্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য বাস্তব পরিস্থিতি বদলে দিচ্ছে। কারণ, সর্বশেষ সিদ্ধান্তে যেসব বসতি আউটপোস্টকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর বড় অংশ পশ্চিম তীরের উত্তর–পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে ঐতিহাসিকভাবে বসতি কার্যক্রম খুবই কম ছিল।
ইসরায়েলের এসব সিদ্ধান্ত আরও আদর্শবাদী এবং অনেক ক্ষেত্রে আরও সহিংস বসতিস্থাপনকারীদের অবস্থান পাকাপোক্ত করে, তাদের আরও বেশি ফিলিস্তিনি জমি দখলের সুযোগ দেয় এবং ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে তাদের হামলাকে আরও নির্লজ্জ ও ব্যাপক করে তোলে, যার ব্যাপ্তি ও প্রভাব অভূতপূর্ব। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/