চীনের জনসংখ্যা ২০২৫ সালে টানা চতুর্থ বছরের মতো কমেছে। জন্মহার রেকর্ড সর্বনিম্নে নেমে যাওয়ায় দেশটির বার্ধক্যজনিত সংকট, শ্রমশক্তি হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। চীনের ন্যাশনাল ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের (এনবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির মোট জনসংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪০ কোটি ৫০ লাখে। এক বছরে জনসংখ্যা কমেছে ৩৩ লাখ ৯০ হাজার, যা আগের বছরের তুলনায় দ্রুত পতন।
২০২৫ সালে চীনে জন্ম হয়েছে মাত্র ৭৯ লাখ ২০ হাজার শিশুর। এটি প্রতি এক হাজার জনে ৫ দশমিক ৬৩ জন, যা ১৯৪৯ সালে রেকর্ড শুরু হওয়ার পর সর্বনিম্ন। আগের বছর ২০২৪ সালে জন্ম হয়েছিল ৯৫ লাখ ৪০ হাজার শিশু। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জন্মহার কমেছে ১৭ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞ ই ফুক্সিয়ান বলেন, ২০২৫ সালের জন্মসংখ্যা ১৭৩৮ সালের সমান, যখন চীনের মোট জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১৫ কোটি।
একই সময়ে চীনে মৃত্যুহার বেড়েছে। ২০২৫ সালে মারা গেছেন ১ কোটি ১৩ লাখ ১০ হাজার মানুষ, যেখানে ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৯৩ হাজার। প্রতি এক হাজার জনে মৃত্যুহার দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক শূন্য ৪, যা ১৯৬৮ সালের পর সর্বোচ্চ। ফলে দেশটির জনসংখ্যা সংকোচন আরও তীব্র হয়েছে।
জন্মহার বাড়াতে সরকার নানা নীতি গ্রহণ করলেও তা কার্যকর হয়নি। ২০২৫ সালে সরকার প্রথমবারের মতো জাতীয় পর্যায়ে শিশু যত্ন ভর্তুকি কর্মসূচি চালু করে এবং এর জন্য ৯ হাজার কোটি ইউয়ান বরাদ্দ দেয়। তিন বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য এই ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি জাতীয় স্বাস্থ্যবিমার আওতায় সব ধরনের প্রসব ব্যয়, এমনকি আইভিএফ চিকিৎসা অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। তবু তরুণদের বড় অংশ সন্তান নিতে আগ্রহী নয়। উচ্চ বেকারত্ব, অর্থনৈতিক ধীরগতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিকে তারা প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন।
একটি শিশুকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত বড় করতে চীনে গড়ে ৫ লাখ ৩৮ হাজার ইউয়ান খরচ হয়, যা মাথাপিছু জিডিপির প্রায় ৬ দশমিক ৩ গুণ। শহরাঞ্চলে এই ব্যয় আরও বেশি। দীর্ঘদিনের ‘এক সন্তান’ নীতির কারণে সমাজে এক সন্তানেই সীমাবদ্ধ থাকার মানসিকতা তৈরি হয়েছে। যদিও এই নীতি ২০১৭ সালে তুলে নেওয়া হয়, তবুও এর প্রভাব এখনো রয়ে গেছে।
চীন দ্রুত বার্ধক্যজনিত সমাজে পরিণত হচ্ছে। বর্তমানে দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৩ শতাংশের বয়স ৬০ বছরের বেশি। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৪০ কোটিতে পৌঁছাবে। এতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমবে এবং পেনশন-ব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়বে। এই বাস্তবতায় চীন ইতোমধ্যেই অবসর বয়স বাড়িয়েছে। তবুও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে চীনের জনসংখ্যা ও অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব আরও গভীর হবে। সূত্র: গার্ডিয়ান