ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তির যুদ্ধবিমানের জন্য ইঞ্জিন তৈরির প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকলেও এবার বিষয়টিতে কঠোর সময়সীমা বেঁধে দিলেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। তিনি বলেছেন, ভারতের হাতে এখন আর বেশি সময় নেই, দেশকে অবশ্যই আগামী ৫-৭ বছরের মধ্যে নিজস্ব আধুনিক যুদ্ধবিমান ইঞ্জিন তৈরিতে সক্ষম হতে হবে।
গত সোমবার বেঙ্গালুরুতে ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ডিআরডিও’র (DRDO) অ্যারো ইঞ্জিন ইউনিট গ্যাস টারবাইন রিসার্চ এস্টাবলিশমেন্ট (GTRE)-এর বিজ্ঞানীদের উদ্দেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে রাজনাথ সিং বলেন, বর্তমান বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতা এখন নিরাপত্তার প্রধান শর্ত হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, “বিশ্বের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে এবং নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠছে। যেসব দেশের হাতে নিজস্ব গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি থাকবে, তারাই নিরাপদ থাকবে।”
রাজনাথ সিং বলেন, অ্যারো ইঞ্জিন প্রযুক্তিতে ভারত অতীতে বহু চেষ্টা করলেও সেগুলোর বাস্তব ফল এখনও দেখা যায়নি। তিনি জানান, আধুনিক যুদ্ধবিমানের উপযোগী ইঞ্জিন তৈরি করতে উন্নত দেশগুলোরও ২৫-৩০ বছর সময় লাগে। তবে ভারতের ক্ষেত্রে অনেক সময় ইতোমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, “আমাদের ধরে নিতে হবে ২০ বছর ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে। এখন হাতে আর মাত্র ৫-৭ বছর সময় আছে।”
পঞ্চম নয়, ষষ্ঠ প্রজন্মের প্রযুক্তিতে এগোতে হবে
তিনি আরও বলেন, ভারত শুধু পঞ্চম প্রজন্মের ইঞ্জিন প্রযুক্তিতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। যত দ্রুত সম্ভব ষষ্ঠ প্রজন্মের উন্নত ইঞ্জিন প্রযুক্তির গবেষণা ও উন্নয়ন শুরু করতে হবে।
রাজনাথ সিং বলেন, অ্যারো ইঞ্জিন তৈরি অত্যন্ত জটিল কাজ, যেখানে থার্মোডাইনামিক্স, মেটেরিয়াল সায়েন্স, ফ্লুইড মেকানিক্স এবং উন্নত যান্ত্রিক প্রকৌশল একসঙ্গে প্রয়োজন।
ভারতের ভবিষ্যৎ যুদ্ধবিমান প্রকল্প অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফট (AMCA) প্রসঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, এর নকশা ও উন্নয়নে ভারত দ্রুত এগোচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), মেশিন লার্নিং এবং নতুন উপাদান ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তিনি বলেন, “আমাদের সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকতে হবে।”
‘কাভেরি’ প্রকল্পের ব্যর্থতা, নতুন করে চেষ্টা
ভারতের নিজস্ব অ্যারো ইঞ্জিন তৈরির উদ্যোগ ‘কাভেরি’ প্রকল্প দীর্ঘ বিলম্বের কারণে ২০০৮ সালে এলসিএ (LCA) যুদ্ধবিমান প্রকল্প থেকে আলাদা করা হয়েছিল। পরে ২০১৬ সালে ফরাসি প্রতিষ্ঠান স্নেকমা (Snecma)-র সহায়তায় প্রকল্পটি পুনরায় চালু হয়। এটি ছিল ৩৬টি রাফাল যুদ্ধবিমান ক্রয়ের চুক্তির অংশ হিসেবে উল্লেখযোগ্য একটি উদ্যোগ।
বর্তমানে GTRE যুক্তরাজ্যের সঙ্গে যৌথ গবেষণা করছে এবং ‘ন্যাশনাল অ্যারো ইঞ্জিন মিশন’ প্রকল্পের আওতায় ফ্রান্সের সঙ্গেও কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
রাজনাথ সিং বলেন, “ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য অ্যারো ইঞ্জিন প্রযুক্তিতে অত্যন্ত উন্নত। এই সহযোগিতা আমাদের নতুন প্রযুক্তি শেখার সুযোগ করে দেবে।”
ফ্রান্স সফর ঘিরে প্রতিরক্ষা সংলাপ
এদিকে ফরাসি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্যাথরিন ভাউটরিন এবং প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর আসন্ন ভারত সফরকে সামনে রেখে বর্তমানে বেঙ্গালুরুতে অবস্থান করছেন রাজনাথ সিং। সফরকালে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ষষ্ঠ বার্ষিক ভারত-ফ্রান্স প্রতিরক্ষা সংলাপ।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা নিজস্ব জেট ইঞ্জিন প্রকল্প বাস্তবায়নে এবার রাজনৈতিকভাবে চাপ বাড়িয়ে দ্রুত ফল আনতে চাইছে ভারত সরকার।
আরও রাফাল কিনছে ভারত
ভারতের নিজস্ব ‘কাভেরি’ ইঞ্জিন প্রকল্প আশানুরূপ সফল না হওয়ায় এবং বিমানবাহিনীর জরুরি প্রয়োজন মেটাতে শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য যুদ্ধবিমানের জন্য ভারত ফরাসি রাফাল (Rafale) ক্রয়ের দিকে ঝুঁকেছে। ভারত ইতোমধ্যে ৩৬টি রাফাল ব্যবহার করছে। ভারতীয় বিমানবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধিতে আরও ১১৪টি মাল্টি-রোল ফাইটার এয়ারক্রাফট ক্রয়ের প্রক্রিয়া চলছে, যেখানে রাফাল প্রধান দাবিদার। এগুলোর মধ্যে অন্তত ৯০টি ভারতে প্রস্তুত করা হবে কিছু প্রযুক্তি হস্তান্তরসহ। এ বিষয়ে ফরাসি কর্তৃপক্ষ ভারতের চাহিদা মোতাবেক কিছু ছাড় দিতে রাজি বলে জানা গেছে।
পাশাপাশি, ভারতীয় নৌবাহিনীর শক্তি বাড়াতে ভারতের বিমানবাহী রণতরী ‘আইএনএস বিক্রান্ত’ এর জন্য আরও ৩১টি রাফাল-মেরিন (Rafale-M) বা মেরিটাইম সংস্করণ ক্রয়ের চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। নিজস্ব প্রযুক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত আকাশ ও সমুদ্রসীমায় সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতেই ভারত এই বড় বিনিয়োগ করছে। ইতোমধ্যে ২৬টি রাফাল-মেরিন ক্রয় চূড়ান্ত হয়েছে। এর ফলে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ভারতীয় নৌবাহিনী অদূর ভবিষ্যতে মোট ৫৬টি রাফাল পরিচালনা করবে এবং ভারত মহাসাগরে যেকোনো দেশের চেয়ে নৌ শক্তিতে এগিয়ে থাকবে। সূত্র: দ্য ইকোনোমিক টাইমস
মাহফুজ/