ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জেরুজালেম সফরকে ঘিরে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলোর আর্থিক পরিমাণ চোখধাঁধানো হতে পারে। ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব চুক্তির পরিমাণ ৮ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
২০২৩ সাল থেকে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে এই আলোচনা এগোচ্ছে, যেখানে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। একইসঙ্গে মে ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংঘাত নয়াদিল্লির ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও সাইবার যুদ্ধ সক্ষমতার দুর্বলতা স্পষ্ট করে তোলে।
ইসরায়েলের বহুস্তরবিশিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চারটি প্রধান উপাদান নিয়েই সম্ভাব্য চুক্তির আলোচনা চলছে। এগুলো হলো—ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ-এর অ্যারো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাফায়েলের ডেভিড’স স্লিং ও আয়রন ডোম, এবং রাফায়েল ও এলবিটের যৌথ আয়রন বিম। বিশেষ করে আয়রন ডোম ও আয়রন বিম নিয়ে ভারতের বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি নিশ্চিত করেনি বা ঘোষণা দেয়নি।
বর্তমানে ভারত রাশিয়ার এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ইসরায়েলের সহযোগিতায় তৈরি আকাশ ও বারাকভিত্তিক সিস্টেম এবং কিউআরএসএএম ব্যবহার করছে। ইসরায়েল শুধু প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ নয়, বরং হুমকি শনাক্তকরণ ও বহুমাত্রিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয় উন্নত করতেও সহায়তা করতে পারে।
এসব চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ভারত দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, মাঝারি পাল্লার রকেট ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, এবং স্বল্পপাল্লার রকেট মোকাবিলায় সক্ষমতা অর্জন করবে।
ড্রোন যুদ্ধের আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক—দুই ক্ষেত্রেই চুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে। বিভিন্ন ইসরায়েলি কোম্পানি এ খাতে উচ্চপর্যায়ে প্রতিযোগিতা করছে এবং নানা ধরনের সমাধান প্রস্তাব দিচ্ছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কোম্পানি এলবিট সিস্টেমের হারমেস ৯০০ ড্রোন নিয়ে বড় একটি চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আক্রমণাত্মক সক্ষমতার ক্ষেত্রেও একাধিক সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে চুক্তি হয়েছে বলেও জানা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে রাফায়েলের স্পাইস গাইডেন্স কিটসহ ১০০০ বোমা, এলবিটের র্যাম্পেজ আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, আইস ব্রেকার নৌ-ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং আইএআই-এর সুপারসনিক এয়ার লোরা ক্ষেপণাস্ত্র।
আরও পড়ুন: ৮.৭ বিলিয়ন ডলারে ইসরায়েলের কাছ থেকে ১ হাজার ‘স্পাইস বোমা’ কিনছে ভারত
ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শত্রুপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নাগালের বাইরে থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে চান মোদি।
ইসরায়েলি অস্ত্রের ৩৪ শতাংশ ক্রেতা ভারত
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SIPRI)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২০২৪ সময়ে ইসরায়েলের মোট অস্ত্র বিক্রয়ের ৩৪ শতাংশই কিনেছে ভারত। বহু বছর ধরেই ভারত ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা ক্রেতা।
একই সময়ে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অধিদপ্তর জানিয়েছে, ভারতে মোট অস্ত্র বিক্রির পরিমাণ প্রায় ২০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, ২০১২-২০১৭ সময়কালে দুই দেশের প্রতিরক্ষা বিক্রি বহুগুণে বেড়ে যায় এবং ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে, যখন জেরুজালেম নয়াদিল্লির কাছে নৌবাহিনীর জন্য বারাক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিক্রি করে।
২০১৭-২০২৩ সময়ে বাজার শক্তিশালী থাকলেও মোদির ‘মেইড ইন ইন্ডিয়া’ নীতির কারণে কিছুটা শীতলতা দেখা দেয়।
তবে ২০২৪ সাল নাগাদ ইসরায়েল ভারতে সরাসরি বিনিয়োগ বাড়াতে শুরু করে এবং অনেক প্রতিরক্ষা কোম্পানি সেখানে সহায়ক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে।
ক্রয় ও যৌথ শিল্প অংশীদারত্বের মিশ্র মডেলে প্রতিরক্ষা উৎপাদন এগিয়ে নেওয়া, ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সংঘাত —এসব কারণে প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আবারও উল্লম্ফন দেখা গেছে এবং ২০২৬ সালে আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মোদির সফরের অংশ হিসেবে সাইবার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও এমনকি কোয়ান্টাম প্রযুক্তি নিয়ে একাধিক যৌথ উদ্যোগ শুরুর সম্ভাবনাও রয়েছে।
জেরুজালেমে নতুন অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা চুক্তি ঘোষণা
আজ বৃহস্পতিবার জেরুজালেমে এক সংবাদ সম্মেলনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ১৬টি অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষর তদারকি করেন।
কৃষি, ভূ-ভৌতিক অনুসন্ধান, ঐতিহ্য, বিজ্ঞান, শিক্ষা, অর্থনীতি, সাইবার, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেন দুই দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, প্রতিনিধিরা এবং ইসরায়েলে ভারতের রাষ্ট্রদূত জে.পি. সিং।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে ৫০ হাজার ভারতীয় কর্মী নিয়োগের বিষয়টিও এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত।
সংবাদ সম্মেলনে নেতানিয়াহু বলেন, “আমাদের চিন্তা ও হৃদয়ের যে মিলন এখানে হয়েছে, তা সরকার-টু-সরকার সম্পর্ককে নতুন গতি দেবে। এটি দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত ছিল এবং উভয় দেশের পাশাপাশি মানবজাতিরও উপকার বয়ে আনবে।”
মোদি জানান, ইসরায়েলের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির চূড়ান্ত রূপ শিগগিরই দেওয়া হবে। প্রতিরক্ষা খাতে যৌথ উন্নয়ন, উৎপাদন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরেও দুই দেশ কাজ করবে বলে জানান তিনি।
বৈঠকের আগে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ জেরুজালেমে মোদিকে স্বাগত জানান এবং প্রেসিডেন্টের বাসভবনে বন্ধুত্ব, বিকাশ ও যৌথ ভবিষ্যতের প্রতীক হিসেবে একটি ওক গাছ রোপণ করেন।
দুই নেতা একান্ত বৈঠকও করেন, যেখানে হারজগ ইসরায়েলের প্রতি মোদির সমর্থন ও বন্ধুত্বের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।
বৃহস্পতিবারের শুরুতে নেতানিয়াহু ও মোদি জেরুজালেমের ইয়াদ ভাশেম হলোকাস্ট জাদুঘর পরিদর্শন করেন এবং ‘হল অব নেমস’ থেকে সফর শুরু করেন।
পরিদর্শন শেষে এক স্মরণানুষ্ঠান হয়, যেখানে মোদি হলোকাস্টে নিহতদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও স্মৃতিস্তম্ভে একটি পাথর স্থাপন করেন।
এক্স-এ দেওয়া পোস্টে মোদি লিখেছেন, “হলোকাস্ট মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর একটি। এটি মানবতা, মর্যাদা ও শান্তি রক্ষার চিরন্তন প্রয়োজনীয়তার স্মারক।”
নেসেটে ভাষণ দেওয়া প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মোদি
গতকাল বুধবার ইসরায়েলে পৌঁছান মোদি এবং ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে ভাষণ দেন। সেখানে তিনি অনিশ্চিত বিশ্বে ভারত-ইসরায়েল বন্ধুত্বকে শক্তির উৎস হিসেবে উল্লেখ করেন এবং উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে একসঙ্গে কাজ করে সম্পর্ক আরও জোরদারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “অনিশ্চিত বিশ্বে ইসরায়েল ও ভারতের বন্ধুত্ব শক্তির উৎস হয়ে আছে।”
এই ভাষণের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইসরায়েলের পার্লামেন্টে বক্তব্য রাখলেন। রাষ্ট্রীয় সফরের অংশ হিসেবে দেশটিতে অবতরণের কিছুক্ষণ পরই ভাষণটি অনুষ্ঠিত হয় এবং উপস্থিত সদস্যরা দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানান। সূত্র: জেরুজালেম পোস্ট
মাহফুজ/