২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষভাগে শুরু হওয়া ‘এপিক ফিউরি’ অভিযানে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি নতুন মোড় নিয়েছে। অভিযানের মূল টার্গেট ইরানের ইউরেনিয়াম। ইসফাহান, নাতাঞ্জ ও ফোর্ডোর ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে সংরক্ষিত শত শত কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে হাসিল করবে সেটাই এখন বড় প্রশ্ন । ওয়াশিংটন কি কেবল বোমাবর্ষণে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি কোনো জটিল ও সুদূরপ্রসারী কৌশলের দিকে এগোচ্ছে?
বিমান হামলার সীমাবদ্ধতা
যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিষয়ক সচিব সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বিশেষ অভিযানের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন। অপারেশনাল নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে তিনি সরাসরি কোনো উত্তর না দিলেও, প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিদ্যমান সামরিক কৌশলের সীমাবদ্ধতা এখানে স্পষ্ট। বিমান হামলা চালিয়ে সেন্ট্রিফিউজ, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও প্রশাসনিক ভবন ধ্বংস করা সম্ভব। কিন্তু ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত যে গভীর ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ বা ‘বাঙ্কার’ কমপ্লেক্সে সুরক্ষিত, তা কেবল আকাশপথের বোমাবর্ষণে ধ্বংস করা দুরূহ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমান হামলা আর পারমাণবিক মজুতের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা–দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। বোমার আঘাতে ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লোরাইড গ্যাসভর্তি কনটেইনার ক্ষতিগ্রস্ত হলে মারাত্মক রাসায়নিক বিষক্রিয়া ও তেজস্ক্রিয় দূষণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। এমনটি ঘটলে উদ্ধারকাজ চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। স্থানীয় পর্যায়ে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা চাক ডিভোর সতর্ক করেছেন, তেজস্ক্রিয় দূষণের ভয়াবহ ঝুঁকির কারণে ইউরেনিয়াম মজুতকে সরাসরি হামলার লক্ষ্যবস্তু করা সামরিকভাবে কখনোই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত নয়।
প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ বনাম ধ্বংস
ইরানের কাছে ৪৪০ থেকে ৪৬০ কিলোগ্রাম সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায়, এই উপাদানটি অস্ত্র-গ্রেডের (৯০ শতাংশ) কাছাকাছি। আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের নন-প্রলিফারেশন নীতিবিষয়ক পরিচালক কেলসি ডেভেনপোর্ট জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এই ইউরেনিয়ামের সঠিক অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত গোয়েন্দা তথ্য নেই। স্টোরেজ কনটেইনারগুলো বহনযোগ্য হওয়ায় ইরানের অবশিষ্ট বাহিনী সহজেই এগুলো সরিয়ে ফেলা বা ছড়িয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আকাশপথে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করা আর সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা–দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন চ্যালেঞ্জ। ক্ষেপণাস্ত্র নেটওয়ার্ক অকার্যকর হলেও পারমাণবিক উপাদানের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। এই উপাদানের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নিতে কেবল বিমান হামলা যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি।
বিশেষ কমান্ডো অভিযানের সম্ভাবনা
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে বিশেষ বাহিনী (কমান্ডো) ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। যুদ্ধের পরবর্তী ধাপে ইরানের সামরিক প্রতিরোধব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে এই অভিযান চালানোর সম্ভাবনা রয়েছে। মিশনের মূল লক্ষ্য তিনটি–১. ভূগর্ভস্থ স্থাপনা শনাক্ত করে ইউরেনিয়াম উদ্ধার করা। ২. বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মাত্রা কমিয়ে সেটিকে সামরিক ব্যবহারের অযোগ্য করে তোলা। ৩. বিশৃঙ্খলার সুযোগে পারমাণবিক প্রযুক্তি বা উপাদান যেন কোনোভাবেই চোরাকারবারিদের হাতে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা।
নিরাপত্তাঝুঁকি ও আইএইএর ভূমিকা
গত ৪ মার্চ আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানায়, নাতাঞ্জ প্ল্যান্টের অবকাঠামোর কিছু ক্ষতি হলেও পারমাণবিক উপাদানে সরাসরি আঘাতের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে চলমান সংঘাতের কারণে পরিদর্শকদের স্থাপনায় প্রবেশের সুযোগ না থাকায়, ইরানের পারমাণবিক মজুতের সঠিক হিসাব বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সংস্থাটির পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুতে ইরানে সৃষ্ট রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা পারমাণবিক উপাদানের নিরাপত্তাকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বিশ্লেষক কেলসি ডেভেনপোর্টের মতে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক তদারকিতে ‘ডাউনব্লেন্ডিং’ বা উপাদানের মান কমিয়ে ফেলাই সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্প। তার মতে, সরাসরি স্থাপনা দখলের চেষ্টার চেয়ে এই কারিগরি প্রক্রিয়াটি অনেক বেশি সহজ ও কম ঝুঁকিপূর্ণ।
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে ইরান বরাবরই তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করেছে। যুদ্ধের আগে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে ইরানের মজুত হ্রাসের সম্ভাবনা তৈরি হলেও, যুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ওই পথ বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানান–ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখাই ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ অভিযানের মূল লক্ষ্য।
ইরানের ইউরেনিয়াম নিয়ন্ত্রণে এখনো কোনো চূড়ান্ত সামরিক পথ নেই। এটি সফল করতে নিখুঁত তথ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। শোনা যাচ্ছে, যুদ্ধ শেষে ইরানের নতুন সরকার এই ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের হাতে দিয়ে দিতে পারে। সূত্র: ফক্স নিউজ ও আল জাজিরা