গত মাসে যুদ্ধের প্রথম দিনে ইরানের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভয়াবহ হামলার ঘটনায় জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক যুক্তরাষ্ট্রকে দ্রুত তদন্ত শেষ করে তার ফলাফল প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে এক জরুরি আলোচনায় ভলকার তুর্ক বলেন, এই বোমা হামলাটি ‘ভয়াবহ এক আতঙ্ক’ সৃষ্টি করেছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘যে ভয়াবহ ক্ষতি করা হয়েছে, তার বিচার অবশ্যই হতে হবে।’
ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, শাজারেহ তাইয়েবাহ স্কুলে পরপর দুটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৬৮ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১১০ জনই শিশু।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো প্রতিবেদন করেছে যে, দেশটির সামরিক তদন্তকারীরা ধারণা করছেন তাদের নিজস্ব বাহিনীই অনিচ্ছাকৃতভাবে স্কুলটিতে এই হামলা চালিয়েছে।
এর আগে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ জানিয়েছিলেন যে বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। যদি এই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিশ্চিত হয়, তবে এটি হবে গত কয়েক দশকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে মার্কিন বাহিনীর হাতে ঘটা সবচেয়ে বড় বেসামরিক হতাহতের ঘটনাগুলোর একটি।
তুর্ক বলেন, ‘‘বোমা বিধ্বস্ত শ্রেণিকক্ষ এবং শোকাতুর বাবা-মায়ের ছবিগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে, যুদ্ধের সর্বোচ্চ মূল্য কারা দেয়—সেইসব সাধারণ মানুষ যাদের যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তের ওপর কোনো হাত নেই।’’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘‘যারা এই হামলা চালিয়েছে, তাদেরই দায়িত্ব এটি দ্রুত, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করা।’’
জেনেভায় জাতিসংঘের বৈঠকে এক ভিডিও ভাষণে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, এই বোমা হামলা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘‘পরিকল্পিত ও ইচ্ছাকৃত’’ আক্রমণ।
তিনি বলেন, ‘‘এই নৃশংসতাকে কোনোভাবেই জায়েজ করা যায় না, গোপন করা যায় না এবং এর মুখে চুপ থাকা বা উদাসীনতা দেখানো উচিত নয়।’’
চলতি মাসের শুরুর দিকে মার্কিন সিনেটের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের কাছে এই হামলার বিষয়ে জবাব চেয়ে চিঠি লিখেছিলেন। প্রায় সব ডেমোক্র্যাট সিনেটরের স্বাক্ষরিত সেই চিঠিতে মিনাব শহরের এই হামলার বিষয়ে বিস্তারিত প্রশ্ন করা হয়—যার শুরুতেই জানতে চাওয়া হয় হামলাটি যুক্তরাষ্ট্র চালিয়েছে কি না।
চিঠিতে প্রশ্ন তোলা হয় যে, পুরনো বা ত্রুটিপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু বিশ্লেষণের কারণে স্কুলের ভবনটিতে আঘাত হানা হয়েছে কি না।
এছাড়া হেগসেথের আগের একটি বক্তব্য—যেখানে তিনি বলেছিলেন যুদ্ধে কোনো ‘‘বোকামিপূর্ণ নিয়ম’’ থাকবে না—সেটি উল্লেখ করে জানতে চাওয়া হয় যে, তিনি যুদ্ধাপরাধ রোধের নিয়মগুলো মেনে চলেছেন কি না। পেন্টাগন জানিয়েছে, তারা সরাসরি চিঠির লেখকদের কাছে এর জবাব দেবে।
নিউইয়র্ক টাইমস মার্কিন তদন্তের বিষয়ে অবগত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) কর্মকর্তারা ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির দেওয়া পুরনো তথ্যের ভিত্তিতে এই হামলার লক্ষ্যস্থলের স্থানাঙ্ক তৈরি করেছিলেন। হামলার প্রকৃত লক্ষ্য ছিল স্কুলের পাশেই অবস্থিত ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) একটি ঘাঁটি, স্কুল ভবনটি একসময় যে ঘাঁটিরই অংশ ছিল।
বিশেষজ্ঞদের ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আইআরজিসি ঘাঁটিতে একটি ‘টমাহক’ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। এটি এমন এক ধরনের মার্কিন ক্রুজ মিসাইল যা ইরান বা ইসরায়েল কারো কাছেই নেই বলে জানা যায়।
ইরানের আধা-সরকারি মেহের নিউজ এজেন্সির প্রকাশিত একটি ভিডিও—যার সত্যতা বিবিসি ভেরিফাই নিশ্চিত করেছে—সেখানে ঘাঁটিটিতে আঘাত হানার ঠিক আগ মুহূর্তের একটি ক্ষেপণাস্ত্র দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা ভিডিওটি দেখে জানিয়েছেন যে, টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের উপস্থিতি এবং একই এলাকায় একাধিকবার হামলার প্রমাণ ইঙ্গিত দেয় যে এটি একটি মার্কিন অভিযান ছিল। সূত্র: বিবিসি
মাহফুজ/