মুখ ফসকে আসল কাহিনী ফাঁস করে দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। লন্ড্রির আগুন নয়, ইরানের মিসাইলের আঘাতেই বাজেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কোনোরকমে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পালিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড’।
গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, “ইরান বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরীতে (জেরাল্ড ফোর্ড) ১৭টি দিক থেকে আঘাত হেনেছিল, আমরা প্রাণ বাঁচাতে পালিয়েছিলাম, সব শেষ হয়ে গিয়েছিল।”
এ বিষয়ে তথ্য ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার মধ্যে সম্ভবত ট্রাম্প অনাচ্ছাকৃতভাবেই এই ঘটনা বলে ফেলেছেন। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরীতে ইরানের হামলা খুব স্বাভাবিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় লজ্জার এবং সমরাঙ্গণে ইরানের জন্য বড় অর্জন।
অথচ যুক্তরাষ্ট্র সে সময় দাবি করেছিল, লন্ড্রি রুমের আগুনে ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড অচল হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ইরান দাবি করেছিল তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরীতে সফলভাবে আঘাত করেছিল। তবে ইরান আঘাত করার কোনো ফুটেজ বা অবজেকটিভ কন্ট্রোল ইমেজ দেখাতে পারেনি। তাই ইরানের দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ ছিল না। কিন্তু ট্রাম্প নিজেই সেই কাহিনী ফাঁস করে দিলেন।
ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড প্রায় ৯ মাস সমুদ্রে মোতায়েন ছিল। এ দীর্ঘ সময়ে এটি ক্যারিবীয় সাগরে মার্কিন অভিযানেও অংশ নিয়েছে। সেখানে ওয়াশিংটন মাদক চোরাচালানের অভিযোগে বিভিন্ন নৌযানে হামলা চালিয়েছে, নিষেধাজ্ঞাভুক্ত তেলবাহী ট্যাংকার জব্দ করেছে এবং ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযানেও অংশ নিয়েছে। সেখান থেকে সরাসরি জিব্রাল্টার প্রণালি হয়ে ভূমধ্যসাগর এবং তারপর মধ্যপ্রাচ্যে প্রবেশ করে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এর প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানে হামলা শুরুর পর ভারত মহাসাগরে অবস্থান করা যুক্তরাষ্ট্রের অপর বিমানবাহী রণতরী ‘আব্রাহাম লিংকন’ এর সঙ্গে যোগ দিতে মার্চের শুরুর দিকে ভূমধ্যসাগর থেকে সুয়েজ খাল পার হয়ে লোহিত সাগরে অবস্থান করে। খুব সম্ভবত লোহিত সাগরেই হামলার শিকার হয় বিশাল এ যুদ্ধজাহাজটি। কারণ এই অঞল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সীমার মধ্যেই রয়েছে। তাছাড়া ইয়েমেনের হুথিদের কাছ থেকে লোহিত সাগর আরও নিকটে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলার শিকার হওয়ার পর জাহাজটিতে প্রায় ৩০ ঘণ্টা আগুন জ্বলে। কিছু নাবিক হাতহত হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে এটি অগ্নকাণ্ডের ঘটনা ‘যুদ্ধ সম্পর্কিত নয়’।
এর পর জাহাজটি গত সপ্তাহে আবার ভূমধ্যসাগরে ফিরে গিয়ে গ্রিসের ক্রিট আইল্যান্ডে নোঙ্গর করে। মার্কিন নৌবাহিনীর তথ্যমতে, আজ শনিবার (২৮ মার্চ) জাহাজটি ক্রোয়েশিয়ার স্প্লিট নৌবন্দরে নোঙ্গর করেছে মেরামতের জন্য।
তথ্য লুকাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত তথ্য তুলে ধরেনি কোনো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কর্মকর্তা এ বিষয়ে মুখ খুলেনি এবং সঠিক তথ্য দেয়নি।
যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহে সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাটিতে ৬টি রিফুয়েলিং বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কেউ ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেনি।
সম্প্রতি ইরানি স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাটিতে তিনটি মার্কিন কেসি-১৩৫ রিফুয়েলিং বিমান পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে ইরানি মিসাইল। এর আগে আরেকটি কেসি-১৩৫ রিফুয়েলিং বিমান বিধ্বস্ত হয় ইরাকে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল, এ ঘটনার পেছনে যান্ত্রিক ত্রুটি দায়ী। কিন্তু ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলো জানায়, তারা দুটি কেসি-১৩৫ রিফুয়েলিং বিমানকে লক্ষ্য করে মিসাইল ছুড়ে। এর ফলে একটি বিমান ভূপাতিত হয়। আরেকটির পেছনের ভার্টিকাল স্ট্যাবিলাইজার (লেজ) ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ইসরায়েলে জরুরি অবতরণ করে।
আরও পড়ুন: ইরানের নতুন হামলায় সৌদি আরবে ১৫ মার্কিন সেনা আহত
যুক্তরাষ্ট্র তার বৈশ্বিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার ভয়ে ইরানের সঙ্গে হামলায় তার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র প্রকাশ করছে না। যুদ্ধের একমাস পূর্ণ হলো আজ ২৮ মার্চ। অথচ তেহরানের সরকার এখনো অটুট। নেতানিয়াহুর প্ররোচনায় ইরানে সরকার পরিবর্তন, অস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করতে নেমে চোরাবালিতে আটকে গেল যুক্তরাষ্ট্র!
মাহফুজ/