শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে ইরান। গতকাল বৃহস্পতিবার দেশটির কমান্ডোরা নাটকীয়ভাবে একটি বিশাল কার্গো জাহাজ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। এর আগে গত বুধবার প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টার অভিযোগে আরও দুটি কনটেইনার জাহাজ জব্দ করে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্রও সাগরে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে অবরোধ কার্যকরের চেষ্টা চালাচ্ছে। ভারত মহাসাগরে ‘ম্যাজেস্টিক’ নামের একটি ট্যাংকার গতকাল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করেছেন মার্কিন সেনারা।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে মাইন স্থাপনকারী ইরানি নৌযান দেখামাত্রই গুলি করে ধ্বংস করার নির্দেশ দিয়েছেন। একদিকে ইরানের কঠোর নৌ-অবরোধ, অন্যদিকে মার্কিন বাহিনীর পাল্টা অভিযান–সব মিলিয়ে এই জলপথকে কেন্দ্র করে বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতি এখন চরম উত্তেজনার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তেলের দাম ইতোমধ্যে প্রতি ব্যারেল ১০২ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
টোল আদায় শুরু করেছে ইরান
পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার খ্যাত হরমুজ প্রণালি এখন আক্ষরিক অর্থেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। শান্তি আলোচনার মাধ্যমে নৌপথটি উন্মুক্ত হওয়ার যে আশা ওয়াশিংটন করেছিল, তা কার্যত ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। ইরান এখন এই পথে চলাচলকারী জাহাজ থেকে টোল বা কর আদায় শুরু করেছে, যা দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা হচ্ছে বলে দেশটির সংসদীয় সূত্রে জানা গেছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ফুটেজে দেখা গেছে, মুখোশধারী ইরানি সেনারা স্পিডবোটে করে ‘এমএসসি ফ্রান্সেসকা’ নামক একটি বিশাল জাহাজের দখল নিচ্ছে। এর আগে ‘এপামিনন্ডাস’ নামের আরেকটি জাহাজও জব্দ করে তারা। ইরানের বিচার বিভাগীয় প্রধান গোলাম হোসেন মহসেনি-এজেই দাবি করেছেন, এই জাহাজগুলো আইন ভঙ্গ করায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ইরানি বাহিনী স্পিডবোট ও ড্রোন নিয়ে উপকূলীয় দ্বীপের গুহাগুলোতে অবস্থান নিয়েছে, যার ফলে মার্কিন নৌবাহিনী সরাসরি তাদের নাগাল পাচ্ছে না।
মাইন স্থাপনকারী ইরানি নৌকা দেখা মাত্রই গুলির নির্দেশ ট্রাম্পের
অন্যদিকে হোয়াইট হাউস থেকে সরাসরি যুদ্ধের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক পোস্টে তিনি জানান, মার্কিন নৌবাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা মাইন স্থাপনকারী যেকোনো ইরানি নৌকা দেখা মাত্রই গুলি চালায়। ট্রাম্পের দাবি, ইতোমধ্যে ইরানের ১৫৯টি নৌযান সমুদ্রের তলদেশে পাঠানো হয়েছে। তবে ইরানের শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং ড্রোন মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। এদিকে ওই অঞ্চলে মার্কিন ‘মাইন সুইপার’ বা মাইন পরিষ্কারকারী জাহাজের তৎপরতা তিন গুণ বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প।
এদিকে ভারত মহাসাগরে ‘ম্যাজেস্টিক’ নামের একটি ট্যাংকার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করেছে মার্কিন সেনারা। ধারণা করা হচ্ছে, এটি আসলে ‘ফিনিক্স’ নামের একটি সুপারট্যাংকার, যা ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে শ্রীলঙ্কা অভিমুখে যাচ্ছিল। তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর আরোপিত নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত করা হবে না। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই পরিবহন করা হয়। ফলে এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ববাজারে বড় ধরনের জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকেই এই অঞ্চলে অস্থিরতা বিরাজ করছে। গত বুধবার যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে পাকিস্তান একটি বৈঠকের আয়োজন করলেও ইরান সেখানে অংশ নেওয়ার জন্য কঠিন শর্ত জুড়ে দিয়েছে। তাদের দাবি, বৈঠকের আগে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের জব্দ করা জাহাজগুলো ছেড়ে দিতে হবে। সাধারণ ইরানিদের মধ্যেও এই পরিস্থিতি নিয়ে চরম আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। রাজধানী তেহরানের বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, যুদ্ধ ও শান্তির মাঝামাঝি এক অনিশ্চিত অবস্থায় তাদের জীবন কাটছে। যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের হামলার আশঙ্কায় ভবিষ্যতের কোনো পরিকল্পনা তারা করতে পারছেন না।
মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেও অস্থিরতা
এই চরম উত্তেজনার মধ্যেই মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। জাহাজ নির্মাণসংক্রান্ত বিরোধের জেরে নৌবাহিনী সচিব জন ফেলানকে বরখাস্ত করেছেন ট্রাম্প। পেন্টাগনের এই রদবদল যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে মার্কিন সামরিক পরিকল্পনার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তবে যুদ্ধের লক্ষ্যগুলো এখনো অর্জিত হয়নি। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি এখনো অটুট এবং তাদের হাতে বিপুল পরিমাণ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের এই শক্তিমত্তা প্রদর্শন এবং ট্রাম্পের পাল্টা আক্রমণাত্মক অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটকে এক ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে পরবর্তী কূটনৈতিক বা সামরিক পদক্ষেপের দিকে, যা নির্ধারণ করবে এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ।