হরমুজ প্রণালীর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায় ইরান। এই লক্ষ্যে দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি পরিচালনার জন্য নতুন একটি সংস্থা গঠনের ঘোষণা দিয়েছে।
দেশের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ সোমবার (১৮ মে) জানায়, ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’ (পিজিএসএ) নামে নতুন সংস্থা প্রণালীটির কার্যক্রম ও সর্বশেষ পরিস্থিতির রিয়েল-টাইম আপডেট দেবে। শান্তিকালীন বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।
হরমুজ প্রণালী অতিক্রমকারী জাহাজগুলোকে বিমা দেওয়ার ইরানি পরিকল্পনা প্রকাশের দুই দিন পর এই ঘোষণা এল। গত শনিবার ইরানের আধা সরকারি ফার্স নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়, তেহরান এই প্রণালী ও পার্শ্ববর্তী উপসাগরীয় জলসীমা দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের জন্য বিমার ব্যবস্থা করবে। বিমার টাকা পরিশোধ করতে হবে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করে। এরপর থেকে ইরানি কর্মকর্তা ও আইনপ্রণেতারা এই প্রণালী ব্যবহারকারী জাহাজের ওপর ট্রানজিট চার্জ বা নিরাপত্তা মাশুল আরোপের দাবি তুলছেন। তেহরান স্বীকার করেছে, এই জলপথ দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজের কাছ থেকে তারা টোল নিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান প্রণালীটি বন্ধ করে দিয়েছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। তেলবাহী ট্যাংকারগুলো এখন এই পথে চলাচল করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, আন্তর্জাতিক জলপথ বিশ্বব্যাপী জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। কোনো দেশই ট্রানজিট পারাপারের ওপর একতরফা টোল আরোপ করতে পারে না।
চীনও জলপথে অবাধ চলাচল সীমিত করার যেকোনো পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে।
ফার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘হরমুজ সেফ ওয়েবসাইট’ প্রণালীটি দিয়ে চলাচলকারী সামুদ্রিক পণ্যসম্ভারের জন্য বিমা দেওয়া শুরু করেছে। এই প্রস্তাবে জাহাজের জন্য বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক বিমা পণ্য ও ‘এনক্রিপ্টেড যাচাইকরণ সক্ষমতা’ থাকবে।
বিমার লেনদেন সম্পন্ন হবে বিটকয়েনের মতো ক্রিপ্টোকারেন্সিতে। সংবাদমাধ্যমটি জানায়, এই কর্মসূচি থেকে ইরানের বার্ষিক ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রাজস্ব আয় হতে পারে। তাদের দাবি, ‘নিশ্চিতকরণের মুহূর্ত থেকেই পণ্যের নিশ্চয়তা দেওয়া হয় ও মালিককে একটি স্বাক্ষরিত রসিদ দেওয়া হয়।’
ইরান জানিয়েছে, প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের ক্ষয়ক্ষতি মেরামতের খরচ তুলতেই এই টোল বা ট্রানজিট ফি আরোপ করা হচ্ছে। এর আগে এই প্রণালী সব জাহাজের জন্য উন্মুক্ত ও অবাধ ছিল।
অনেক শিপিং কোম্পানি এই বিমার প্রস্তাবটিকে ট্রানজিট চার্জের ভিন্ন রূপ হিসেবে দেখছে। মার্চ মাসে ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধ শুরুর প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইরান কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে অনিয়মিত ট্রানজিট ফি আদায় শুরু করে। প্রতি যাত্রায় এই ফি ২ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ঠেকেছিল।
প্রস্তাবিত বিমা ব্যবস্থাটি নিরাপদ যাত্রাপথ ও আর্থিক সুরক্ষাকে এক করে ওই টোলের ধারণাটিকেই নতুন রূপ দিচ্ছে। প্রকাশ্যে একে টোল না বলে তেহরান একটি বাণিজ্যিক বিমা ঝুঁকি-ব্যবস্থাপনা পরিষেবা হিসেবে তুলে ধরছে।
সমুদ্র আইনসংক্রান্ত জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে আন্তর্জাতিক প্রণালী বা আঞ্চলিক সমুদ্রসীমা দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর কোনো শুল্ক আরোপ করা যায় না। শিক্ষাবিদ আব্দুল খালিকের মতে, ইরান এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গেলে গুরুতর আর্থিক, আইনি ও কার্যনির্বাহী বাধার মুখে পড়বে।
লিভারপুল জন মুরস ইউনিভার্সিটি মেরিটাইম সেন্টারের প্রধান খালিক আল-জাজিরাকে বলেন, ‘সামুদ্রিক বিমার বিশাল ক্ষতিপূরণের জন্য বিপুল রিজার্ভ ও আন্তর্জাতিক পুনঃবিমা সহায়তার দরকার হয়। অথচ আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাগুলো বৈশ্বিক আর্থিক ও বিমা বাজারে ইরানের প্রবেশাধিকার মারাত্মকভাবে সীমিত করে রেখেছে।’
নির্ভরযোগ্য পুনঃবিমা না থাকলে জাহাজ মালিকরা ক্ষতিপূরণ পাওয়া নিয়ে সংশয়ে থাকবেন। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বন্দরগুলো ইরান প্রদত্ত সনদপত্র প্রত্যাখ্যান করতে পারে। এতে বিমাভুক্ত জাহাজগুলো বন্দরে ভিড়তে বা অর্থায়ন পেতে সমস্যায় পড়বে।
তিনি জানান, বিটকয়েনের মাধ্যমে অর্থ প্রদান তেহরানের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক সরকার ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনকে নিষেধাজ্ঞা এড়ানো ও অর্থ পাচারের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করে দেখে। সাইবার নিরাপত্তা হুমকি, সীমিত বৈশ্বিক স্বীকৃতি ও উপসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এই কর্মসূচির প্রতি আস্থা আরও কমাবে।
ইরানের এই প্রচেষ্টা ভৌগোলিক বাধার মুখেও পড়তে পারে। গত ১৩ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগামী ও ইরান থেকে আসা সব জাহাজের ওপর নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে। তেহরান অনুমতি দিলেও বিমার জন্য ইরানকে অর্থ দেওয়া জাহাজগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র যাতায়াত করতে দেবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
আড়াই মাসের বেশি সময় আগে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্বব্যাপী সামুদ্রিক বিমা সংস্থাগুলো উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজের জন্য যুদ্ধ-ঝুঁকি প্রিমিয়াম অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। মার্চ মাসে ইরানের ওপর প্রথম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলার কয়েক দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালীতে চলাচলকারী জাহাজের বিমা খরচ পাঁচ গুণ বাড়ে।
যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই গার্ড, স্কাল্ড, নর্থ স্ট্যান্ডার্ড, আমেরিকান ক্লাবসহ শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি বিমা সংস্থা উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধ-ঝুঁকি বিমা বাতিল করে।
পরবর্তী সময় কিছু বিমাকারী সরকারি সহায়তায় বাজারে ফেরে। বিমাকারী প্রতিষ্ঠান চাব (Chubb) হরমুজ প্রণালীর বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে একটি ২০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন-সমর্থিত সামুদ্রিক পুনঃবিমা কর্মসূচিতে যোগ দেয়। এটি জাহাজের কাঠামো, পণ্যসম্ভার ও দায়বদ্ধতার জন্য যুদ্ধ-ঝুঁকির সুরক্ষা দেয়।
তবে শিপিং কোম্পানিগুলো সতর্ক রয়েছে। বেশ কিছু অপারেটর নাবিকদের নিরাপত্তা ও জাহাজ জব্দের আশঙ্কায় উপসাগরীয় রুট এড়িয়ে চলছে। যুক্তরাষ্ট্র কোম্পানিগুলোকে সতর্ক করেছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদ যাতায়াতের জন্য ইরানকে অর্থ দিলে তারা নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে।
কৌশলগত এই প্রণালী পারাপারের জন্য ইরানের বিমা প্রস্তাব কোনো দেশ বা জাহাজ নির্মাণ সংস্থা গ্রহণ করবে কি না, তা এখনো কেউ ঘোষণা করেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এই মাসে স্পষ্ট করেছে, প্রণালীটি দিয়ে যাতায়াতের জন্য কোনো দেশকেই টোল আদায়ের অনুমতি দেওয়া উচিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের পর হোয়াইট হাউস জানায়, শি জিনপিং প্রণালীটির সামরিকীকরণ ও এটি ব্যবহারের জন্য টোল আদায়ের যেকোনো প্রচেষ্টার প্রতি চীনের বিরোধিতা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। বেইজিং এই বিবৃতির বিরুদ্ধে কোনো আপত্তি জানায়নি। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস অবিলম্বে এই জলপথ খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি কোনো ধরনের টোল আরোপ ও বৈষম্য না করার কথা বলেছেন। সূত্র: আল-জাজিরা