বিশ্বজুড়ে প্লাস্টিক পণ্যের উৎপাদন ও ব্যবহার যে হারে বাড়ছে, তাতে ২০৪০ সাল নাগাদ এর স্বাস্থ্যঝুঁকি বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি হতে পারে। প্লাস্টিকের জীবনচক্রের প্রতিটি ধাপে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাস, বায়ুদূষণ ও বিষাক্ত রাসায়নিকের প্রভাবে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। সম্প্রতি চিকিৎসা সাময়িকী ‘ল্যানসেট প্ল্যানেটারি হেলথ’-এ প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন (এলএসএইচটিএম), ইউনিভার্সিটি অব টুলুস এবং ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের গবেষকরা যৌথভাবে এ গবেষণাটি পরিচালনা করেন। তারা ২০১৬ থেকে ২০৪০ সাল পর্যন্ত প্লাস্টিক উৎপাদন, ব্যবহার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, প্লাস্টিকের কাঁচামাল হিসেবে জীবাশ্ম জ্বালানি আহরণ থেকে শুরু করে এটি তৈরি এবং সবশেষে পরিবেশে বর্জ্য হিসেবে মিশে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি বিদ্যমান।
গবেষকদের মতে, প্লাস্টিক সংশ্লিষ্ট দূষণে শ্বাসকষ্টজনিত রোগ, ক্যানসার ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে সৃষ্ট বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা বাড়তে পারে। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৪০ সাল নাগাদ এই ক্ষতির পরিমাণ ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। মডলিং গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্লাস্টিকের কারণে হওয়া মোট স্বাস্থ্যঝুঁকির ৪০ শতাংশ আসবে গ্রিনহাউস গ্যাস ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন থেকে। বায়ুদূষণ মূলত প্লাস্টিক উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ঘটে থাকে, এর প্রভাব থাকবে ৩২ শতাংশ। বাকি ২৭ শতাংশ ক্ষতির কারণ হবে পরিবেশে মিশে যাওয়া বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ।
গবেষণাটি বৈশ্বিক স্কেলে প্লাস্টিক নির্গমনের কারণে মানুষের সুস্থ জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া সময়ের হিসাব করেছে। একে বলা হয় ‘হেলদি ইয়ারস অব লাইফ লস্ট’। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান ব্যবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে প্লাস্টিক দূষণের কারণে বার্ষিক সুস্থ জীবন হারানোর পরিমাণ ২০১৬ সালের ২১ লাখ বছর থেকে বেড়ে ২০৪০ সালে ৪৫ লাখ বছরে দাঁড়াবে। সামগ্রিকভাবে, ২০১৬ থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে বিশ্ববাসীর সুস্থ জীবন থেকে প্রায় ৮ কোটি ৩০ লাখ বছর কেড়ে নিতে পারে এই প্লাস্টিক দূষণ।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কেবল প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ বা পুনরুৎপাদন (রিসাইক্লিং) বাড়িয়ে এই বৈশ্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়। তবে যদি প্লাস্টিক উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহারের পুরো ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা যায়, তবে ২০৪০ সাল নাগাদ এই স্বাস্থ্যঝুঁকি ৪৩ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হতে পারে। অর্থাৎ, সমস্যা সমাধানে কেবল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নয়, বরং উৎপাদনের উৎস থেকে কাজ শুরু করতে হবে।
গবেষণা প্রতিবেদনের অন্যতম লেখক মেগান ডিনি বলেন, সাধারণত প্লাস্টিক সমস্যার জন্য এককভাবে ভোক্তাদের দায়ী করা হয়। কিন্তু প্লাস্টিক উৎপাদন ও ব্যবহারের পুরো প্রক্রিয়া বা ‘সিস্টেমিক’ পরিবর্তন ছাড়া এটি রোধ করা সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, প্লাস্টিকের রাসায়নিক উপাদান সম্পর্কে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর অস্বচ্ছতা ও তথ্য গোপন করার প্রবণতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর নীতিমালা তৈরিতে এই তথ্যগুলো জানা অত্যন্ত জরুরি।
ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের অধ্যাপক শিয়াওয়ু ইয়ান বলেন, এই গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে প্লাস্টিক মানবস্বাস্থ্যের ওপর কতটা গভীর প্রভাব ফেলছে। পরিবেশ এবং মানুষের জীবন বাঁচাতে এখন প্লাস্টিকের ব্যবহার ও উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকার ও শিল্প মালিকদের স্বচ্ছতা ও সদিচ্ছাই পারে আগামীর এই জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলা করতে।


