জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর গুলশানে শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল আবির হত্যা মামলায় মাত্র ৬০ দিনের তদন্তেই সব আসামিকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন বা ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। জুলাই হত্যাকাণ্ডের কোনো মামলায় এটিই প্রথম চূড়ান্ত প্রতিবেদন। এতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ১০ নেতা-কর্মীসহ সব আসামিকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে পুলিশের দেওয়া ওই প্রতিবেদন বাতিল ও মামলার পুনঃতদন্ত চেয়ে আদালতে নারাজি আবেদন করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। আদালত নারাজি আবেদনের শুনানির জন্য আগামী ১০ আগস্ট দিন ধার্য করেছেন।
এদিকে ওই হত্যা মামলার প্রধান আসামি তানভীর আলীর বিরুদ্ধে অন্য আরেকটি ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তদন্ত করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। জানা গেছে, জুলাই আন্দোলনে রামপুরায় গুলিবিদ্ধ নাহিদ হাসান ট্রাইব্যুনালে অভিযোগটি দায়ের করেন।
জানা গেছে, গত বছরের ১৯ জুলাই বিকেল ৪টার দিকে রাজধানীর গুলশানের কালাচাঁদপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আন্দোলরত শিক্ষার্থী আবিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গুলশান এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা ও বিতর্কিত ব্যবসায়ী তানভীর আলীর নির্দেশে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জাকির হোসেন বাবুলসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ওই হামলা চালান। এ ঘটনায় নিহত আবিরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হাসান মাহমুদ বাদী হয়ে ১৮ আগস্ট আদালতে মামলা করেন। আদালত আবেদনটি এজাহার হিসেবে রুজু করতে গুলশান থানাকে নির্দেশ দেন। ২০ আগস্ট এজাহার রুজু করে গুলশান থানা। এতে তানভীর ও বাবুলসহ মোট ১০ জনের নাম উল্লেখসহ ১৫০ থেকে ২০০ জন নেতা-কর্মীকে আসামি করা হয়। এজাহারভুক্ত অপর আট আসামি হলেন উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শিমুল, গুলশান থানা ছাত্রলীগের নেতা আনিসুর রহমান সুজন, মানিক, সোহাগ, গুলশান থানা শ্রমিক লীগের মহসিন ওরফে কাঁকড়া মহসীন, গুলশান থানা যুবলীগের জামিল হোসেন ও শহিদুল ইসলাম এবং গুলশান থানা আওয়ামী ওলামালীগ সহসভাপতি আব্দুল হামিদ।
মামলাটির তদন্ত করেন গুলশান থানার তৎকালীন সাব-ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) রোমেন মিয়া (বর্তমানে সুনামগঞ্জের ছাতক থানায় কর্মরত)। তিনি মামলার মাত্র ৬০ দিনের মাথায় তদন্ত শেষে আসামিদের অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ জানিয়ে গত বছরের ২২ অক্টোবর আদালতে ফাইনাল রিপোর্ট দাখিল করেন। এতে প্রধান আসামি তানভীর আলীকে কানাডার নাগরিক হিসেবে দেখানো হয়েছে। আলামত হিসেবে তার কানাডীয় পাসপোর্টের ফটোকপি আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে তার বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) থাকলেও পুলিশের রিপোর্টে এর কোনো তথ্য তুলে ধরা হয়নি। ফাইনাল রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, মামলার বাদী হাসান মাহমুদ এবং সাক্ষীদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। মামলাটি ‘তথ্যগত ভুল’। মামলায় বর্ণিত ঘটনার সঙ্গে আসামিদের জড়িত থাকার কোনো তথ্য বা সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে সব আসামিকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতির আবেদন জানিয়ে ‘চূড়ান্ত রিপোর্ট’ দাখিল করা হলো।
এদিকে পুলিশের দেওয়া ওই ফাইনাল রিপোর্ট বাতিল এবং পুনঃতদন্ত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ নারাজি আবেদন দাখিল করেছে। ঢাকা জজ কোর্টের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (অ্যাডিশনাল পিপি) আজিজুল হক দিদার গত ১৭ জুলাই চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নারাজি দাখিল করেন।
এতে বলা হয়েছে, ‘তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা মনগড়া ও আসামিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ফাইনাল রিপোর্ট দিয়েছেন। বাদী বা সাক্ষীদের কোনো ধরনের জবানবন্দি নেওয়া হয়নি। সাক্ষ্য-প্রমাণ সবই বিদ্যমান আছে।’
আদালত ওই আবেদন গ্রহণ করে শুনানির জন্য আগামী ১০ আগস্ট দিন ধার্য রেখেছেন।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুল হক দিদার গত বুধবার খবরের কাগজকে বলেন, ‘একটি স্পর্শকাতর এই মামলায় পুলিশ অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে দায়সারাভাবে তদন্ত শেষ করেছে। মাত্র ৬০ দিনের তদন্তে আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ জানিয়ে অতি গোপনে আদালতে ফাইনাল রিপোর্টটি দাখিল করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের কোনো আইনজীবীকে এবিষয়টি কোনোভাবে জানানো হয়নি। আমি প্রায় সাত মাস পর আকস্মিকভাবে জিআর শাখায় গিয়ে বিষয়টি জেনেছি। ফলে এটি সহজেই অনুমেয় যে, তদন্তকারী কর্মকর্তা মনগড়া ও আসামিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এ মামলার ফাইনাল রিপোর্ট দিয়েছেন। এটিই জুলাই হত্যাকাণ্ডের কোনো মামলার প্রথম ফাইনাল রিপোর্ট।’
ফাইনাল রিপোর্টের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তদন্ত কর্মকর্তা রোমেন মিয়া গত বুধবার খবরের কাগজকে বলেন, ‘তদন্তের সময় আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ করার মতো উপযুক্ত তথ্য-উপাত্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যেটুকু তথ্য পাওয়া গেছে তার ভিত্তিতেই তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে এমই ( মেমো অব এভিডেন্স) পেশ করা হয়েছিল। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ প্রতিবেদনের বিষয়ে একমত পোষণ করলে আইন অনুযায়ী ওই ফাইনাল রিপোর্ট আদালতে দাখিল করা হয়েছে। এখানে প্রভাবিত হওয়ার কিছু নেই। এখন সংক্ষুব্ধ বা বাদী পক্ষ আদালতে নারাজি দিতেই পারেন। পুনঃতদন্ত চাইতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আদালত পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন।’
অন্যদিকে আবির হত্যা মামলায় পুলিশের ফাইনাল রিপোর্টে অব্যাহতি পাওয়া তানভীর আলীর বিরুদ্ধে অন্য একটি ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ তদন্ত করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় গত বছরের ২০ জুলাই সন্ধ্যায় রামপুরা এলাকায় গুলিবিদ্ধ নাহিদ হাসান গত ১১ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনালে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। এতে সাবেক সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ২২ জনের নাম উল্লেখসহ ২০-৩০ জনকে আসামি করা হয়। আসামির তালিকার ২ নম্বরে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং ৩ নম্বরে তানভীর আলীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল সূত্র জানিয়েছে, অভিযোগটির তদন্ত চলছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া শুরু হবে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, তানভীর আলীর বিরুদ্ধে ১৬ বছর ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ-দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগে অন্তত তিনটি মামলা রয়েছে। তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনে মামলা করায় ভুক্তভোগী এক নারী চরম হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তানভীরকে কয়েকবার দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তলব করা হয়েছিল। তবে তিনি দুদকের তলবে সাড়া দেননি।