৪ জুলাই ২০২৫। ছুটির দিন। সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম পোকামাকড় আর গাছপালার সন্ধানে। আষাঢ়ের আকাশ, মেঘ তো থাকবেই। এই মেঘটাই আবার কোনো কোনো পোকার জন্য আকাঙ্ক্ষিত। বিশেষ করে গঙ্গাফড়িংয়ের জন্য। চলতে চলতে মেঘলা আকাশের দিকে তাকালাম। কয়েকটা গঙ্গাফড়িং উড়ছে। গঙ্গা, একটা নদীর নাম। নদী মানেই জল। জল হলো গঙ্গাফড়িংদের জীবনের ‘একটি কাল’ কাটানোর জায়গা। তাই মেঘ দেখলেই ওরা ওড়াউড়ি করে। অন্তঃসত্ত্বা গঙ্গাফড়িংরা মেঘ থেকে জল পড়ার অপেক্ষায় থাকে। খানা-ডোবা জলে ভরলে তারা সেদিকে ছুটে যায়। আরাম করে সে জলে ডিম পাড়ে। এ জন্যই বোধ হয় ড্রাগন ফ্লাইদের বাংলা নামকরণ করা হয়েছে গঙ্গাফড়িং বা জলফড়িং নামে। অবশ্য পল্লি অঞ্চলে এসব পোশাকি নাম চলে না। গাঁয়ের লোকেরা এ ফড়িংকে ডাকে গয়াল পোকা নামে। গ্রামে গয়াল পোকা উড়তে দেখলেই লোকেরা মনে করে বৃষ্টি হবে। এটি বৃষ্টি আসার যেন এক ধরনের লক্ষণ।
মেঘ থাকলেও বৃষ্টি নেই। এসব কথা ভাবতে ভাবতে পৌঁছে গেলাম শেরেবাংলা নগরের জাতীয় বৃক্ষমেলায়। ফুল-ফলসহ নানা রকমের গাছপালায় সেজেছে জাতীয় বৃক্ষমেলার আঙিনা। এতসব বাহারি গাছপালার মধ্যে হঠাৎ নজরে পড়ল একটা পোকা। ভারি সুন্দর চেহারা। ওটা প্রজাপতি না, গঙ্গাফড়িং। এত সুন্দর গঙ্গাফড়িং খুব কম দেখা যায়। একটা ছোট্ট আমড়াগাছের ছড়ায় ঘিয়া রঙের ফুল ফুটেছে। সেই ফুলগুলোর মঞ্জরির ওপর ফড়িংটি বেশ আয়েশ করে বসে আছে। তার কয়েকটা ছবি তুললাম।
এ গঙ্গাফড়িংয়ের ডানাগুলো যেন কোনো শিল্পীর আঁকা ছবি। এ জন্যই কীটতত্ত্ববিদরা এর ইংরেজি নাম দিয়েছেন কমন পিকচারউইং বা ভেরিগেটেড ফ্লাটারার। ইংরেজি নামের সঙ্গে মিল রেখে অধ্যাপক ড. আ ন ম আমিনুর রহমান গঙ্গাফড়িংয়ের বাংলা নাম দিয়েছেন পাতি চিত্রিতডানা। পশ্চিমবঙ্গের লেখক কৌশিক তার ষড়পা বইয়ের নাম লিখেছেন তিতলিপাখা।
বাংলাদেশের উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ বইয়ের ১৯তম খণ্ডে ১৩১ পৃষ্ঠায় এর বর্ণনা রয়েছে। তবে বাংলা বা স্থানীয় নাম হিসেবে এর নাম লেখা হয়েছে ফড়িং। বৈজ্ঞানিক নাম রিওথেমিস ভেরিগেটা (Rhyothemis Variegata), গোত্র বা পরিবার লিবেলুলিডি, বর্গ ওডোনাটা।
এটি একটি মাঝারি আকারের জলফড়িং। স্ত্রীর তুলনায় পুরুষ চিত্রিতডানা ফড়িং অনেকটা বড়। পাখার নকশা ও রং দেখে পুরুষদের সহজে চেনা যায়। গাঢ় কালচে রঙের দেহ, হলুদে চিত্রিত। পুরুষ ফড়িংয়ের ডানায় কালো রঙের মধ্যে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অল্প হলদে দাগ বা ছোপ থাকে। ডানায় থাকে সোনালি আভা। স্ত্রী ফড়িংদের ডানায় পুরুষের চেয়ে বেশি হলদে ছোপ থাকে। তবে স্ত্রীদের ডানায় পুরুষদের মতো সোনালি আভা নেই। ডানা চারটির অগ্রপ্রান্ত স্বচ্ছ। সবগুলো ডানার শিরাজালিকা স্পষ্ট। ডানার মাঝে ও সামনে সবুজাভ রং থাকে। যেখানে আলো পড়লে রংধনুর রঙের মতো দেখায়। চোখ বড় ও চকচকে লালচে খয়েরি। এরা দুর্বলভাবে উড়ে বেড়ায়। একটি দলে কয়েকটি ফড়িং থাকে। জলাশয়ের কাছে এদের বেশি উড়তে দেখা যায়। জলাভূমি, ধানখেত, পুকুর, ডোবা ইত্যাদি স্থান এদের আবাসস্থল।
মেয়ে চিত্রিতডানা সাধারণত জলাশয়ের কিনারে ডিম পাড়ে। ডিমগুলো ছোট। ডিমগুলো সুরক্ষার জন্য ছদ্মবেশী রঙে রঞ্জিত থাকে। যাতে ডিমখেকো প্রাণীরা সেগুলোকে ডিম মনে না করে।
জলের ভেতরেই ডিম ফুটে বাচ্চারা বসবাস করে। বাচ্চাদের সঙ্গে এ ফড়িংয়ের চেহারার কোনো মিল থাকে না। তাদের ডানাও থাকে না। বাচ্চারা কয়েকবার খোলস বদলায়। তবে সর্বশেষে তারা একটি খোলসের মধ্যে পুত্তল্লি দশায় যায়। পুত্তল্লিগুলো সাধারণত জলাশয়ের কিনারায় থাকা আগাছা ও ঘাসের সঙ্গে আটকে থাকে। এরপর একদিন পুত্তলির ঘাড়ের কাছে বড় ছিদ্র করে পূর্ণাঙ্গ ফড়িং হয়ে বেরিয়ে আসে ও ডানা মেলে উড়ে যায়। পূর্ণাঙ্গ ফড়িং দেখতে ঠিক উড়োজাহাজের মতো।
গঙ্গাফড়িং মানুষের ও গাছের কোনো ক্ষতি করে না, বরং উপকার করে। এর বাচ্চারা জলের ভেতর থাকা মশার বাচ্চা ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলজ জীব শিকার করে খায়। আর প্রাপ্তবয়স্ক চিত্রিতডানা ফড়িংরা খায় মশা। এ ছাড়াও তারা মাছি, ছোট ছোট প্রজাপতি ও মথ, পাতাফড়িং, ঘাসফড়িংয়ের বাচ্চা ইত্যাদি শিকার করে খায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, চিত্রিতডানার গঙ্গাফড়িংয়ের বাচ্চা বা নিম্ফ অ্যানোফিলিস ও কিউলেকস মশার চেয়ে এডিস মশার লার্ভা বা বাচ্চা খেতে বেশি পছন্দ করে। এ জন্য ভারতের কেরালায় এই ফড়িং মশক নিধনের গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক এজেন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশে এদের সারা বছরই দেখা যায়।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশবিদ