কয়েক একরের বিশাল দিঘিজুড়ে সবুজের মেলা, তার মাঝে মাথা উঁচিয়ে আছে হাজারও বিরল শ্বেতপদ্ম। অথচ ঈদের ছুটিতে পরিবার নিয়ে বরিশালের এই বিখ্যাত পদ্মপুকুরের সৌন্দর্য দেখতে এসে হতাশ হয়ে ফিরে গেছেন অসংখ্য দর্শনার্থী। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) হঠাৎ করেই বন্ধ করে দিয়েছে ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনায় প্রবেশ। প্রায় এক মাস ধরে কার্যকর থাকা এই সিদ্ধান্তের কারণে স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রকৃতিপ্রেমীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
বরিশাল শহরের রাজাবাহাদুর সড়কে বিআইডব্লিউটিএর বিশ্রামাগার ‘হিমনীড়’-সংলগ্ন পুকুরটিতে প্রতিবছর এই সময়ে শ্বেতপদ্মে ছেয়ে যায়। ঈদের ছুটিতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক দর্শনার্থীকে দেখা গেছে, সীমানাপ্রাচীরের বাইরে দাঁড়িয়ে শ্বেতপদ্মের সৌন্দর্য দেখছেন। কয়েকজন কিশোরও ভেতরে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকলেও সুযোগ পায়নি। অনেকে আক্ষেপ করছেন, বছরের এই একটি সময়ে ফোটা বিরল শ্বেতপদ্মগুলো কাছ থেকে দেখার সুযোগ থেকে তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে।
পরিবার-পরিজন নিয়ে পদ্মপুকুর দেখতে আসা মাহবুব মাসুম নামে এক প্রবাসী বলেন, ‘শনিবার অনেক আশা নিয়ে সন্তানদের এই ঐতিহাসিক পুকুরটি দেখাতে এনেছিলাম। কিন্তু গেটে থাকা আনসার সদস্যরা আমাদের ভেতরে ঢুকতে দেননি। বাধ্য হয়ে প্রাচীরের বাইরে দাঁড়িয়েই বাচ্চাদের ফুল দেখালাম।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘এত সুন্দর ও দর্শনীয় একটি জায়গা সাধারণ মানুষের জন্য এভাবে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। বরিশালের এই অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা উচিত।’
পুকুরটির পাহারায় নিয়োজিত আনসার সদস্যরা জানান, কর্তৃপক্ষের কঠোর নির্দেশেই তারা কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছেন না। তাদের দাবি, কিছু দর্শনার্থী ভেতরে ঢুকে পদ্মফুল টেনে ছেঁড়েন এবং আশপাশের বাগানের ক্ষতি করেন। এ ছাড়া কিছু অপ্রাপ্তবয়স্ক ও তরুণ-তরুণী দীর্ঘসময় ধরে ভেতরে বসে আপত্তিকর আচরণ করেন। মূলত এই সামাজিক পরিবেশ রক্ষা ও ফুল বাঁচানোর তাগিদেই বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশল শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী আমজাদ হোসাইনের নির্দেশে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।
তবে বিআইডব্লিউটিএর এই যুক্তিকে ‘অজুহাত’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন স্থানীয় সাংস্কৃতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম শিশির এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, ‘এই পদ্মপুকুর বরিশালের একটি অন্যতম ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। এখানকার শ্বেতপদ্ম অত্যন্ত বিরল প্রজাতির। ফলে এই সৌন্দর্য উপভোগ করা ও দেখার নাগরিক অধিকার সবার আছে।’
তিনি আরও যুক্তি দেন, ‘পুকুরটির ঠিক পাশেই বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশল কার্যালয় এবং তাদের ঐতিহাসিক বাংলো ‘হিমনীড়’ অবস্থিত। সেখানে সার্বক্ষণিক আনসার ও নিরাপত্তাকর্মীরা ডিউটি করেন। এত নজরদারির মধ্যে কিশোর-কিশোরী বা যুবকদের পক্ষে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড করা প্রায় অসম্ভব। আর যদি এমন কিছু ঘটেও থাকে, তবে তা শক্ত হাতে দমন করার দায়িত্ব তো নিরাপত্তাকর্মীদেরই।’
শহীদুল ইসলাম শিশির পরামর্শ দেন, প্রয়োজনে সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে অতিরিক্ত নিরাপত্তারক্ষী চাওয়া যেতে পারে কিংবা আরও আনসার সদস্য নিয়োগ করা যেতে পারে। কিন্তু সমস্যা সমাধানের নামে দর্শনার্থীদের ভেতরে ঢুকতে না দেওয়া কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এর ফলে নতুন প্রজন্ম নিজেদের ইতিহাস ও প্রকৃতির সুন্দর একটা অংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
তবে বরিশাল নদীবন্দর কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান ইমন অবশ্য বিষয়টিকে দেখছেন ঐতিহ্য সংরক্ষণের অংশ হিসেবে। তিনি বলেন, ‘পদ্মপুকুরের ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য সংরক্ষণের স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি বিআইডব্লিউটিএর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা। দর্শনার্থীরা সীমানাপ্রাচীরের বাইরে থেকে পুকুরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।’
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে নগরের বান্দ রোড এলাকায় প্রায় সাড়ে পাঁচ একর জায়গাজুড়ে স্টিমার কোম্পানির কার্যালয় স্থাপন করা হয়। ১৯৬৫ সালে মেরিন ওয়ার্কশপের তৎকালীন ব্যবস্থাপক জার্মান নাগরিক মি. ইলিনগর বিশেষভাবে শ্বেতপদ্মের চারা সংগ্রহ করে পুকুরে রোপণ করেন। এর পর থেকেই পুকুরটি ‘পদ্মপুকুর’ নামে পরিচিতি পায়। প্রতিবছর এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত পুকুরজুড়ে শ্বেতপদ্মের সমারোহ দেখতে ভিড় করেন প্রকৃতিপ্রেমী ও দর্শনার্থীরা।
মঈনুল ইসলাম সবুজ/ খাদিজা রুমি/