ছেলেবেলার কথা। তখন এই পাখির নাম জানতাম না। তবে পাখিটির চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করেছি কয়েক বছর ধরে। মাঝে মাঝে দুটি পাখি মধুর সুরে ‘টুয়ি টুয়ি’ শব্দে ডাকত। প্রায় সারা বছরই আমি এদের জোড়ায় দেখতাম। তারা একে অন্যকে ছেড়ে খুব বেশি দূরে বিচরণ করত না। কখনো দুজন মিলে ‘প্রিয় প্রিয়’ শব্দে গান গাইত। বাড়ির বনের যে অংশে সূর্যের আলো কম পড়ে এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন, তারা সেখানেই বেশির ভাগ সময় থাকত। সেখানকার আর্দ্র ভূমিতে নেমে শুকনো পাতা উল্টে খাবার খেত। খাবার খোঁজার সময় এরা একে অন্যকে ডাকত। গ্রীষ্ম-বর্ষার সময় এরা প্রজনন করত।
আমাদের বাড়িতে সেই প্রজাতির দুই জোড়া পাখি বাস করত। ছেলেবেলায় কেবল দুবার এ পাখির বাসা খুঁজে পেয়েছিলাম। আমাদের ঘরের দক্ষিণ পাশে ছোট একটি খেজুরগাছের ঘেরার গোড়ায় একটি বাসা দেখেছিলাম। সেখানে শুকনো পাতা, নারিকেলের বাইলের শুকনো আঁশ, শুকনো শিকড় ও চিকন ডালপালা দিয়ে বাসা বেঁধে তিনটি ডিম পেড়েছিল। ডিমগুলো ছিল খুবই ছোট।
এদের বাসার প্রধান উপকরণ ছিল শুকনো পাতা। মূলত পাতা দিয়ে বাসাটির ভিত্তি তৈরি করে। তারপর অন্য উপকরণ জমা করে বাটির মতো বাসা বানায়। পুরুষ ও স্ত্রী পাখিকে বাসা তৈরির জন্য উপকরণ সংগ্রহ করতে দেখেছি। দ্বিতীয় বাসাটি ছিল বাড়ির গভীর নলকূপের চারদিকে খেজুরের বাইল দিয়ে বেড়া দেওয়া পাতার মধ্যে।
ছেলেবেলায় এই পাখির নাম জানার জন্য ব্যাকুল ছিলাম। কিন্তু কোনো নাম খুঁজে পায়নি। পরবর্তী সময়ে প্রায় দুই দশক পর ২০০৮ সালে কাপ্তাই বনে গিয়ে এ পাখির ডাক শুনে অবাক হয়ে যাই। মনটা আনন্দে ভরে ওঠে। ছেলেবেলার স্মৃতি মনে পড়ে যায়। তখন আমার সঙ্গের একজন বলে, এ পাখির পোশাকি নাম অ্যাবটের ছাতারে। আমাদের অতিচেনা সাতভায়লা, এদের জ্ঞাতী। অর্থাৎ এরা একই পরিবারের পাখি। বাগেরহাট জেলার মানুষের কাছে এ পাখিটি ভেদা টুনি নামে পরিচিত।
অ্যাবটের ছাতারে মাঝারি আকৃতির সুকণ্ঠী গায়ক পাখি। দেহের দৈর্ঘ্য ১৫ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৩০ গ্রাম। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির পিঠ নিরল জলপাই বাদামি, গলা, বুক এবং পেটের পালক ধূসরভাব বাদামি। ওপরের ঠোঁট কালো এবং নিচের ঠোঁট ধূসর। ছেলে ও মেয়ে পাখি দেখতে একই রকম। এরা আর্দ্র চিরসবুজ বনের বৃক্ষতলে, গুল্মের ঝোঁপে এবং বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের কিছু গ্রামীণ বনে বাস করে। ঝোপের তলে কিংবা বনতলের পাতা উল্টে খাবার খোঁজে। এরা কখনো গাছের ডালে থাকা শুঁয়োপোকা ধরে খায়।
খাদ্যতালিকায় আছে পোকামাকড় এবং তাদের লার্ভা। সাধারণত ভূমির কাছে খেজুর, তাল, নারিকেল ঘেরার গোড়ায় শুকনো পাতা, শেওলা, শুকনো শিকড় দিয়ে বাটির মতো বাসা বানায়। উজ্জ্বল স্যামন রঙের তিন থেকে পাঁচটি ডিম পাড়ে। উভয় পাখি মিলে ডিমে তা দেয় এবং ছানাদের যত্ন নেয়।
এ পাখি দক্ষিণ এশিয়ার হিমালয় পর্বতমালা বরাবর এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বনাঞ্চলে বিস্তৃত। বরিশাল, খুলনা, সিলেট, চট্টগ্রাম জেলার চিরসবুজ বনে এবং গ্রামীণ কুঞ্জবনে এদের দেখা যায়। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, ভুটান, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াতে এই পাখিদের দেখা যায়।
এ পাখির ইংরেজি নাম Abbott's Babbler এবং বৈজ্ঞানিক নাম Malacocincla abbotti. ১৮৪৫ সালে ইংরেজ প্রাণীবিদ এডওয়ার্ড ব্লাইদ প্রথম অ্যাবটের ছাতারের বর্ণনা দেন। পাখিটির প্রথম নমুনা সংগ্রাহক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জে আর অ্যাবট। তিনি ১৮৩৭ থেকে ১৮৪৫ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতে আরাকানের সহকারী কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তার সম্মানে পাখিটির নাম অ্যাবটের ব্যাবলার রাখা হয়েছে।
লেখক: নিসর্গী ও পরিবেশবিদ, জার্মান অ্যারোস্পেস সেন্টার