স্বাধীন সাংবাদিকতা শুধু সাংবাদিকতার জন্য না, সুষ্ঠু ও কার্যকর সরকারের জন্য জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন দেশের প্রথম সারির গণমাধ্যমগুলোর সম্পাদক, নির্বাহী সম্পাদক এবং টেলিভিশন ও অনলাইন পোর্টালের প্রধানরা।
রবিবার (২১ ডিসেম্বর) বিএনপির সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তারা এ মন্তব্য করেন।
আগামীতে রাষ্ট্রের ক্ষমতায় এলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা বিএনপির দায়িত্ব বলে মত দিয়ে তারা বলেছেন, গণমাধ্যম ছাড়া গণতন্ত্র হয় না। গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে হলে গণমাধ্যমকে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। আমরা কোনো এজেন্সির টেলিফোন চাই না। আগামী দিনে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও বিএনপির ৩১ দফায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নের পরামর্শ দেন সাংবাদিকরা।
এ সময় বিএনপির পক্ষ থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের দমন-পীড়নের কথা মাথায় রেখে গণমাধ্যমকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা।
রাজধানীর হোটেল র্যাডিসন ব্লুতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে দৈনিক পত্রিকা ও অনলাইন নিউজপোর্টালের সম্পাদক, রেডিও ও টেলিভিশনের বার্তাপ্রধান এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে এই মতবিনিময় সভা করে বিএনপি।
মতবিনিময় সভার শুরুতে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকা অফিস ভাঙচুর ও জ্বালিয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এ দৃশ্য সারা বিশ্ব দেখেছে। এটা জাতির জন্য লজ্জার। আমরা শুধুমাত্র দুঃখ প্রকাশ করে এটা সমাপ্ত করতে পারব না। এখানে সরকারের দায়িত্ব ছিল সবচেয়ে বেশি। আমরা জেনেছি, হামলার বিষয়ে ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট ছিল। কিন্তু সেটা আমলে নেওয়া হলো না কেন?’
তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বলার পরও শুনেছি এক-দুই ঘণ্টা পরে তারা সাড়া দিয়েছে। সেটা কেন? কাদের হাতে আমরা এই রাষ্ট্রব্যবস্থা দেব? নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য যারা দায়িত্ব নিয়েছেন তাদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ।’
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম ডেমোক্রেসি, কিন্তু কেন হয়ে যাবে মবোক্রেসি? তাকে কেন লালন করতে দেওয়া হবে। সরকারের দুর্বলতার কারণেই এসব প্রশ্রয় পাচ্ছে। এগুলো আরও কঠোর হস্তে দমন করতে হবে।’
গণমাধ্যমকে সমাজের দর্পণ উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘পত্রিকা হচ্ছে সমাজের দর্পণ। এই মুহূর্তে সমাজের সেই দর্পণ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সাংবাদিকদের দর্পণ যেন চূর্ণ না হয়। জনগণ যদি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেয়, তাহলে গণমাধ্যমের জন্য আমাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা থাকবে।’
এ সময় দেশের স্বার্থ বিবেচনায় দেশের পক্ষে ও নিরপেক্ষ থাকার জন্য সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘শফিক রেহমানের মতো বর্ষীয়ান সাংবাদিকদের যেভাবে জেলে নিয়ে যে আচরণ করা হয়েছে, সবকিছু মিলিয়ে ফ্যাসিবাদের আমলে একটা ঘন কালো অন্ধকারের সময় পার করেছি। প্রত্যেকেই কমবেশি আক্রান্ত হয়েছি। এখনো যেসব বিষয় আমাদের সামনে আসছে, তা আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। তরুণ নেতা শরিফ ওসমান হাদির এমন মৃত্যুর প্রতিবাদ জানাই। তাকে কথার কারণে জীবন দিতে হবে, এটা মেনে নেওয়ার মতো না।’
মতবিনিময় সভায় যায়যায়দিনের সম্পাদক শফিক রেহমান বলেন, ‘সাংবাদিকদের দায়িত্ব সমালোচনা করা, আবার প্রশংসা করাও তাদের দায়িত্ব। ওয়ান-ইলেভেনে কয়েকজন সাংবাদিক প্রচণ্ড ভুল করেছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে তারা আমার কাছে স্বীকার করেছিলেন। তারা ভুল করেছিলেন। এই ভুল যেন আর না হয়।’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ফেরার দিন বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটতেও পারে। এ বিষয়ে বিএনপিকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, দেশে একটা রাজনৈতিক শূন্যতা চলছে। এটা বিএনপির জন্যও বিপজ্জনক। তারেক রহমান যদি আরও কিছুদিন আগে আসতেন তাহলে হয়তো বিএনপির আরও সুযোগ তৈরি হতে পারত। তবে এখনো ভালো করার সম্ভাবনা আছে।
তিনি বলেন, ‘প্রথম আলো, ডেইলি স্টারের ওপরে হামলা-আক্রমণ নিয়ে আপনারা সবাই বলেছেন- এর জন্য সবার প্রতি আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। কোনো সরকারের আমলে সংবাদপত্র শিল্প নানা কারণে খুব ভালো থাকতে পারেনি। নানা রকম সমস্যার মধ্য দিয়ে গেছে। তার মধ্যে গত ১৫-১৬ বছরে স্বৈরাচারী সরকারের আমলে সবচেয়ে বেশি ভয়, চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। বিএনপির শাসন আমলে খুব স্বস্তিতে ছিলাম তা না। যদি পার্থক্য করি দুই সরকারের মধ্যে, তাহলে বিএনপির সময়ে গণমাধ্যমের পরিবেশ অধিকতর স্বস্তিদায়ক ছিল।’
এ সময় দুই-তিন মাস পরপর গণমাধ্যমের সঙ্গে বিএনপিকে বসার পরামর্শ দেন প্রথম আলোর সম্পাদক।
ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘বাংলাদেশ এই মূহূর্তে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। ৫৩ বছরে কোনো মিডিয়া অফিসে আগুন দেওয়া হয়নি। প্রথমবারের মতো প্রথম আলো, ডেইলি স্টার অফিসে আগুন দেওয়া হলো। কেন? আমরা কী অপরাধ করলাম? তবে আমি ভবিষ্যতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চাই। নতুন যে বাংলাদেশ আমরা চাচ্ছি, সেখানে যেন ক্রিটিক্যাল জার্নালিজম, স্বাধীন গণমাধ্যমের সুযোগ থাকে।’
তিনি বলেন, ‘এই দেশে কোনো সরকারই ক্রিটিক্যাল জার্নালিজম গ্রহণ করেনি। স্বাধীন স্বাংবাদিকতা শুধু সাংবাদিকতার জন্য না, সুষ্ঠু সরকারের জন্য জরুরি। আপনাদের যেমন গুড গভর্ন্যান্স দরকার, আমাদের নৈতিক সাংবাদিকতা দরকার। আমাদের ভুল হতে পারে, আপনারা বলবেন। যদি আপনি দেখাতে পারেন আমার রিপোর্ট ফ্যাক্ট বেইজড না, নিউজের তথ্য বিকৃতি ঘটেছে, তখন আমি ক্ষমা চাইব।’
মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘অস্থির সময়ে আমরা সবাই অস্থির। মিডিয়া পলিসি যেটা বলা হয়েছে, সেটা বাস্তবায়ন হলেই মিডিয়া এগিয়ে যাবে। ডেইলি স্টার, প্রথম আলোর ওপরে হামলা হয়েছে। এরপর কী হবে আমরা জানি না। আমরা সবাই নিরাপদ থাকতে চাই, লিখতে চাই। আপনারা আমাদের কথা বলতে দিলে সাধুবাদ জানাব, নয়তো সমালোচনা করব। তবে আগামী দিনে যে চ্যালেঞ্জ আসছে তা মোকাবিলা করতে হলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’
সংবাদপত্র মালিক সমিতির (নোয়াব) সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আমরা অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছি। নির্বাচনটা যদি দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা না পায় তাহলে আমাদের বিশাল বিপদ। বিদেশিরা উদগ্রীব হয়ে আছে আমাদের নির্বাচন নিয়ে।’ ক্ষমতায় গেলে গণমাধ্যমের সঙ্গে ছয় মাস পরপর কথা বলার আয়োজনের প্রস্তাব দেন তিনি।
কালের কণ্ঠের সম্পাদক ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ বলেন, ‘একটা বিষাক্ত পরিস্থিতির মধ্যে আমরা আছি। এই বিষবৃক্ষ স্বাধীনতার পর থেকেই শুরু হয়েছে। আমরা ঐক্যবদ্ধ না হলে এই সংকট কাটাতে পারব না। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
ডেইলি স্টারের উপদেষ্টা সম্পাদক কামাল আহমেদ বলেন, ‘আমরা আর কোনো নিরাপত্তা সংস্থার টেলিফোন চাই না। আমরা সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব জমা দিয়েছি। তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন সরকারের। বিএনপি ৩১ দফায় বলেছে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য যা যা করা দরকার তা করবে। আমরা আশা করি, বিএনপি সরকারে এলে সংস্কার কমিশনের সব প্রস্তাব বাস্তবায়ন করবে।’
মতবিনিময় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন খবরের কাগজের সম্পাদক মোস্তফা কামাল, বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক আবু তাহের, ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, দেশ রূপান্তরের সম্পাদক কামাল উদ্দিন সবুজ, ইনকিলাবের সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দিন, যুগান্তরের সম্পাদক আব্দুল হাই শিকদার, কালবেলার সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, আজকের পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কামরুল হাসান, ইউএনবির সম্পাদক মাহফুজুর রহমান, বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহ উদ্দিন বাবর, প্রতিদিনের বাংলাদেশের সম্পাদক মারুফ কামাল খান, বাসসের চেয়ারম্যান আনোয়ার আলদীন, সমকালের সম্পাদক শাহেদ মোহাম্মদ আলী, যুগান্তরের নির্বাহী সম্পাদক এনাম আবেদীন, আমার দেশের নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ, জনকণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক খোরশীদ আলম, যমুনা টিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফাহিম আহমেদ, ডিবিসির সম্পাদক লোটন ইকরাম, বাংলা ভিশনের আবদুল হাই সিদ্দিকী, এসএ টিভির মাহমুদ আল ফয়সাল, বাংলাদেশ প্রতিদিনের নির্বাহী সম্পাদক মনজুরুল ইসলাম প্রমুখ।
মতবিনিময় সভায় বিএনপির নেতাদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, সেলিমা রহমান ও হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, ভাইস চেয়ারম্যান ইসমাইল জবিহউল্লাহ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জিয়া উদ্দিন আহমেদ, যুগ্ম মহাসচিব শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, কেন্দ্রীয় নেতা মাহাদী আমীন, রশিদুজ্জামান মিল্লাত, আতিকুর রহমান রুমন, ব্যারিস্টার মীর হেলাল, মোর্শেদ হাসান খান, শাম্মী আখতার প্রমুখ।