দুই দিনের টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বাড়ছে। উত্তরের চার জেলায় কড়া নাড়ছে বন্যা। ইতোমধ্যে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর ও নীলফামারী জেলার নিচু অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ঘরে পানি ঢোকায় চরাঞ্চলে রান্নাবান্না বন্ধ। এ ছাড়া পানিতে তলিয়ে গেছে আগাম আমনের আধা পাকা ধানসহ নানা ফসলের খেত। ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো বিস্তারিত খবর:
কুড়িগ্রাম: কুড়িগ্রামের সব কটি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। শনিবার স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বলেছে, নদ-নদীগুলোর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে আগামী ২৪ ঘণ্টা পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে তিস্তার পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি চলে আসতে পারে।
তিস্তার পানি কাউনিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার সামান্য নিচ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নদী তীরবর্তী চর এলাকায় আগাম আমনের আধা পাকা ধান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। অসময়ে নদীর পানি বৃদ্ধিতে চর এলাকার মরিচের বীজ, বাদামসহ অন্যান্য ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষকরা।
পাউবোর কুড়িগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, আগামীকাল দুপুর পর্যন্ত পানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর থেকে পানি কমতে পারে। এতে তিস্তার পাড় ছাড়া অন্য কোথাও বন্যার আশঙ্কা নেই।
লালমনিরহাট: তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়ে ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল ও নিচু এলাকা প্লাবিত হয়ে পড়েছে। ডুবে গেছে ফসলের খেত ও রাস্তাঘাট। বাড়িঘরে পানি ওঠায় বিপাকে পড়েছে নিচু অঞ্চলের মানুষ।
শনিবার সকাল ৬টায় তিস্তার পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। কাউনিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ২৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার রেকর্ড করা হয়। সন্ধ্যা ৬টায় ডালিয়া পয়েন্টে পানি ৫ সেন্টিমিটার এবং কাউনিয়া পয়েন্টে ১১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়।
তিস্তার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে শীতকালীন আগাম সবজি ও ধানসহ বিভিন্ন ফসলের খেত পানিতে ডুবে গেছে। নতুন নতুন এলাকায় পানি উঠছে। এতে আমনসহ বিভিন্ন ধরনের ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাড়িঘরে পানি ঢোকায় রান্নাবান্না নিয়ে বিপাকে পড়েছে অনেক মানুষ। অনেকে উঁচু স্থানে গবাদিপশু নিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে।
আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের গোবর্ধন এলাকার আব্দুর রহিম বলেন, গত শুক্রবার রাত থেকে পানি বাড়তে শুরু করে। এর মধ্যেই ঘরে পানি ঢুকেছে। রাস্তাতেও পানি উঠেছে। ঠিকমতো চলাচল করা যাচ্ছে না। রান্নার কোনো সুযোগ নেই। শুকনো খাবার খেয়ে আছেন অনেকে।
প্লাবিত এলাকার বাসিন্দা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, পানি এখনো বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় ফসলের খেত ডুবে গেছে। পানি কত দিন থাকবে বলাও মুশকিল। তাই এসব খেতের ফসল পচেও যেতে পারে।
লালমনিরহাট পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার রায় জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশের সব প্রধান নদ-নদীর পানি সমতল বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে রংপুর বিভাগের তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি গত দুই দিনে সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অবস্থায় আগামী ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লালমনিরহাট জেলার তিস্তা নদীর পানি সমতল সতর্ক সীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং জেলার নদী তীরবর্তী চরাঞ্চল ছাড়াও কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে।
জেলা প্রশাসক রকিব হায়দার বলেন, ‘জেলার বিভিন্ন নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। আমরা চেয়ারম্যান ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে প্লাবিত লোকজনের তালিকা চেয়েছি। সংশ্লিষ্ট ইউএনও তালিকা করছেন। তালিকা যাচাই-বাছাই শেষে সাহায্য করা হবে।’
রংপুর: দুই দিন ধরে হালকা থেকে মাঝারি, আবার ভারী বর্ষণের ফলে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের সব কটি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। তবে তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া তিস্তা সেতু পয়েন্টে বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, আগামী দুই দিন পর্যন্ত রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলার তিস্তা নদীর পানি সমতল সতর্ক সীমায় প্রবাহিত হতে পারে। তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে।
পাউবো ডালিয়া শাখার উপপ্রকৌশলী মোহাম্মদ রাশেদীন বলেন, অব্যাহত বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তার পানি বাড়তে শুরু করেছে। পানির চাপ সামলাতে ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খোলা রাখা হয়েছে।
নীলফামারী: তিস্তার পানি বেড়ে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার কয়েকটি নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। শনিবার সকাল থেকে তিস্তার পানি বেড়ে সন্ধ্যায় বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে পানি আরও বেড়ে বিপৎসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা করছে পাউবো।
এদিকে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার তিস্তার চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বেশ কয়েকটি চরের মানুষ। ডুবে গেছে ফসলি জমি।
উপজেলার কিসামত চরের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম (৪৩) খবরের কাগজকে জানান, গতকাল রাত থেকে পানি উঠতে শুরু করেছে। শনিবার ভোর থেকে ঘরবাড়িতে পানি ঢোকে। চরের অনেক পরিবার তাদের মালপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন।