জাতীয় জাদুঘরের অধীনে ১০টি শাখা জাদুঘর থাকলেও পুরান ঢাকার ইসলামপুরের আহসান মঞ্জিল ছাড়া অন্যান্য ৮টি জাদুঘর জৌলুস হারাচ্ছে ক্রমাগত। কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ায় অধিকাংশ সময় এসব জাদুঘরের ফটক বন্ধ রাখা হয়। জাতীয় কিছু দিবসে আলোচনা সভার আয়োজন ছাড়া এসব জাদুঘরে বিশেষ আয়োজনও থাকে না।
এমন প্রেক্ষাপটে আজ ১৮ মে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস’। দিবসটি উদযাপনে ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব মিউজিয়ামস (আইকম) এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজে জাদুঘরের ভবিষ্যৎ’। দিবসটি উপলক্ষে আজ দিনব্যাপী র্যালি, প্রদর্শনী, সেমিনার এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ।
দেশের শাখা জাদুঘরগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামের পুরোনো সার্কিট হাউসের জিয়া স্মৃতি জাদুঘরটি পুনরুজ্জীবিত করতে চাইছে জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ। আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই জাদুঘরের উন্নয়নে সাড়ে ৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হচ্ছে বলে জানান জাতীয় জাদুঘরের সচিব সাদেকুল ইসলাম।
১৯৮১ সালের ৩০ মে এই সার্কিট হাউসের একটি কক্ষে হত্যা করা হয় জিয়াউর রহমানকে। পরে ১৯৯৩ সালে ১২টি গ্যালারি নিয়ে প্রতিষ্ঠা হয় জিয়া স্মৃতি জাদুঘর। স্মারক জাদুঘরটিতে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতি এবং ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ও বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন নিদর্শন রয়েছে। তবে চট্টগ্রামের এই পুরোনো সার্কিট হাউস একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্মম গণহত্যারও সাক্ষী। পুরোনো এই সার্কিট হাউস ছিল পাকিস্তানি সেনাদের সামরিক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সরঞ্জামও ছিল এখানে।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে এই জাদুঘরে উন্নয়নমূলক কোনো কর্মকাণ্ড হয়নি। একাধিকবার জাদুঘরের নামফলক মুছে ফেলা হয়েছে। জিয়া স্মৃতি জাদুঘরের নাম বদলে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নামকরণ করার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেতারা। তবে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরে এখন এ জাদুঘরে দর্শক সমাগম বাড়ছে। তাই দ্রুত সংস্কার কার্যক্রমের পাশাপাশি জনবলসংকট নিরসনের দাবিও উঠেছে।
গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা জাদুঘরে ব্যাপক ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
মহান মুক্তিযুদ্ধের নানা স্মৃতিস্মারক লুটপাটের ঘটনা ও পুনরায় সংস্কারের কাজ নিয়ে জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষের মাথাব্যথা নেই। জাতীয় জাদুঘরের সচিব সাদেকুল ইসলাম বলেন, ‘এই জাদুঘরটি দেখভালের জন্য আমাদের দুজন কর্মকর্তা কাজ করছেন। তবে সংস্কারকাজ কবে শুরু করা যাবে, এ নিয়ে এখনো কিছু জানি না। আমি মাত্র দুই সপ্তাহ হলো এসেছি। জাদুঘরের নানা কার্যক্রম নিয়ে আলোচনায় এখনো স্বাধীনতা জাদুঘর নিয়ে কোনো কথা শুনিনি।’
তবে আহসান মঞ্জিলের সীমানা প্রাচীর নতুন করে নির্মাণের কথা জানান জাদুঘরের সচিব।
৫ আগস্টের পর রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে শহিদ জননী জাহানারা ইমাম স্মৃতি জাদুঘরের ফটকে অধিকাংশ সময় তালা ঝুলে থাকে। কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে কাঙাল হরিনাথ জাদুঘরেরও একই দশা। গত ১৮ এপ্রিল কাঙাল হরিনাথের ১২৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতেও জাদুঘরে কোনো আয়োজন ছিল না। কাঙাল হরিনাথের সমাধি ও ব্যবহৃত নানা তৈজসপত্র অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে।
সিলেটের নায়ওরপুলে ওসমানী স্মৃতি জাদুঘরে তিনটি গ্যালারিতে ৪৭৩টি নিদর্শন রয়েছে। তবে অবহেলায় সেসব নিদর্শন নষ্ট হচ্ছে।
চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার নোয়াজিশপুর গ্রামে আবদুল হক চৌধুরী স্মৃতিকেন্দ্রটি সম্পর্কে জাতীয় জাদুঘরের অনেক শীর্ষ কর্মকর্তাই জানেন না। কুমিল্লার লাকসামে নওয়াব ফয়জুন্নেসার স্মৃতিবিজড়িত জমিদারবাড়িটি ২০২৩ সালে জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়। সে বাড়িতে কিছু দর্শকসমাগম হলেও এর প্রচার-প্রসার নিয়ে তেমন উদ্যোগ নেই। ময়মনসিংহে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা ভবনের এখন জরাজীর্ণ দশা। স্মৃতিস্মারক ও জয়নুলের আঁকা নানা ছবিও যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হতে বসেছে।
ফরিদপুরের অম্বিকাপুরে পল্লিকবি জসীম উদদীন স্মৃতি জাদুঘর ও লোক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে লোকজ সংস্কৃতি চর্চার হালহকিতত নিয়ে জানতে চাইলে জাদুঘরের কর্মকর্তারা সদুত্তর দিতে পারেননি। শুধু দিবসভিত্তিক কর্মসূচির মধ্যে সীমিত হয়ে পড়েছে এসব জাদুঘরের কার্যক্রম।
জাতীয় জাদুঘরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, এসব শাখা জাদুঘরের আধুনিকায়ন, সংগ্রহশালা সমৃদ্ধ করার ব্যাপারে আপাতত কোনো পরিকল্পনা নেই। নতুন অর্থবছরের বাজেটে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে জাতীয় জাদুঘরের বরাদ্দ নিয়ে এখন চিন্তিত কর্মকর্তারা। এ বরাদ্দ থেকে শাখা জাদুঘরগুলো প্রয়োজনীয় অর্থ পাবে এমন আশা দিতে পারেননি তারা।
আসছে না নতুন নিদর্শন
এদিকে জাতীয় জাদুঘরের কার্যক্রম নিয়েও আছে অনেক প্রশ্ন। জাতীয় জাদুঘরে সমকালীন শিল্পকলা ও বিশ্বসভ্যতা গ্যালারি; ইতিহাস ও ধ্রুপদী শিল্পকলা বিভাগে নতুন কোনো নিদর্শন আনার উদ্যোগ নেই। বছরের পর বছর ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একই নিদর্শনে দর্শকরাও বিরক্ত হচ্ছেন।
সমকালীন শিল্পকলা ও বিশ্বসভ্যতা গ্যালারি; ইতিহাস ও ধ্রুপদী শিল্পকলা বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানসংকট আর সংরক্ষণের দুর্বলতায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জাতীয় জাদুঘরের প্রায় ৮৯ হাজার নিদর্শন। এর মধ্যে আছে দুই হাজার বছরের পুরোনো গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনও। নিদর্শনগুলোর ৫ শতাংশ থাকে প্রদর্শনের জন্য। বাকি সব থাকে ১৯৮৩ সালে তৈরি এ ভবনের বিভিন্ন স্টোররুম বা গুদামঘরে।
জাতীয় জাদুঘরের একজন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে জাতীয় জাদুঘরে নিদর্শন সংগ্রহের কার্যক্রমে ভাটা পড়েছে। যেসব নিদর্শন রয়েছে জাদুঘরের সংগ্রহশালায়, সেসব নিদর্শনও স্থানাভাবে প্রদর্শন করা যাচ্ছে না। জাদুঘরের নানা গ্যালারিতে প্রস্তর ও ধাতব ভাস্কর্য, পোড়ামাটির ফলক, প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় মুদ্রা, শিলালিপি, তুলট কাগজ ও তালপাতায় লেখা সংস্কৃত, বাংলা ও আরবি-ফার্সি পাণ্ডুলিপি, মধ্যযুগীয় অস্ত্রশস্ত্র, বাংলাদেশের দারু ও কারুশিল্প, নকশিকাঁথা, সমকালীন ও বিশ্বসভ্যতার চিত্রকলা ও ভাস্কর্য, বাংলাদেশের গাছপালা, পশুপাখি, শিলা ও খনিজসহ প্রাকৃতিক নানা নিদর্শন জাদুঘরের মূল সংগ্রহ।
প্রত্নসম্পদ নিদর্শন সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের ক্ষেত্রে তাপ, আর্দ্রতা, আলো গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় জাদুঘরের নানা প্রত্নসম্পদ সঠিকভাবে সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে বলে জানা গেছে। প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ বিভাগে যারা কাজ করছেন, তাদেরও আধুনিক প্রশিক্ষণ নেই।
জাদুঘর কর্তৃপক্ষ বলছে, ১৭ তলাবিশিষ্ট নতুন ভবন তৈরি করা হলে প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ, প্রদর্শনের জটিলতা কেটে যাবে। সেই নতুন ভবন নির্মাণে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩০০ কোটি টাকা। তবে নতুন ভবন নির্মাণের কাজ এখনো শুরু করতে পারেনি ঠিকাদার। এ বিষয়ে জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কোনো ব্যাখা পাওয়া যায়নি।
ইতিহাস ও ধ্রুপদ শিল্পকলা বিভাগের কিপার মনিরুল হক জানান, কিছুদিনের মধ্যে নরসিংদী জেলা প্রশাসন থেকে বেশ কিছু প্রত্নসম্পদ পাবে জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া বিভিন্ন জেলা প্রশাসন থেকে নানা প্রত্নসম্পদ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।
তবে আশার কথা হচ্ছে, জাতীয় জাদুঘরের ভ্রাম্যমাণ জাদুঘরের কার্যক্রমটি এখন আবার সক্রিয় হচ্ছে। জাতীয় জাদুঘরের জনশিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ঢাকার বাইরে নানা জেলায় ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির কার্যক্রম বিস্তৃত করবেন তারা।