২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে জানানো হয়, বুধবার (৬ আগস্ট) নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব বরাবর পাঠানো ওই চিঠিতে উল্লিখিত সময়ে প্রত্যাশিত মানের অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া।
গত ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে রমজান শুরুর আগে নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি দেওয়ার কথা বলেন। তারই ধারাবাহিকতায় এই চিঠি পাঠাল প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়।
এদিকে প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণার পর থেকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে আরও তৎপর হয়ে উঠেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধেই সংসদ নির্বাচন আয়োজনের জন্য তাদের প্রস্তুতি রয়েছে। তিনি জানান, প্রধান উপদেষ্টার চিঠি অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের বৈঠকে ভোটের দিন নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে নির্বাচনি রোডম্যাপ এবং আইন অনুযায়ী ভোটের ২ মাস আগেই (ডিসেম্বরের শেষার্ধে) ভোটের তফসিল ঘোষণা করা হবে।
গতকাল দুপুরে আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিইসি এসব তথ্য জানান। সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ইসি সচিবালয়ের ভোট প্রস্তুতি সম্পর্কে এ এম এম নাসির উদ্দিন জানান, আগামী ৩১ আগস্ট চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে। আর দল নিবন্ধন, সীমানা পুনর্নির্ধারণ ও কেনাকাটাসহ ভোটের প্রাক-প্রস্তুতিমূলক সব কাজ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ করতে হবে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভোটের আগে স্বাভাবিক হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করে আগামী নির্বাচনে ভোটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত ও ভোটারদের আস্থা অর্জন করা এবং এআইয়ের অপব্যবহার রোধকে ইসির জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মনে করছেন সিইসি।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতি নিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী গতকাল জানিয়েছেন, আগামী সংসদ নির্বাচনের আগেই এসপি-ওসিদের লটারির মাধ্যমে বদলি করা হবে। এ ছাড়া ভোটের দিন ৪৭ হাজার ভোটকেন্দ্রে থাকবে একটি করে বডি ক্যামেরা।
প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণা অনুযায়ী ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য কতটা প্রস্তুত ইসি- এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, ‘ওনার চিঠি এখনো আমরা পাইনি, তবে বুঝতে পারছি খুব দ্রুতই পাব। তবে চিঠি না এলেও ঘোষিত সময়সীমা ধরে আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি চলমান। অনেক আগে থেকেই আমাদের এই প্রস্তুতি চলছে। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের জন্য বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছি। আশা করছি, প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি হবে না। ভোটের তারিখের ২ মাস আগে তফসিল ঘোষণা করব।’
সিইসি জানান, প্রস্তুতিমূলক প্রধান কাজগুলোর মধ্যে ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ শেষ পর্যায়ে, ভোটার তালিকা নিখুঁত করতে তা পুনরায় হালনাগাদ করা হয়েছে; সেটা ৩১ আগস্টের মধ্যে চূড়ান্ত হবে। ভোটারযোগ্য তরুণদের অন্তর্ভুক্ত করতে তফসিলের মাসখানেক আগে একটা সময় নির্ধারণ করে সম্পূরক ভোটার তালিকাও করা হবে। সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণের খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে, নতুন রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের কাজ চলছে, প্রয়োজনীয় নির্বাচনি সরঞ্জাম কেনাকাটাও চলছে। আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রস্তুতিমূলক এসব কাজ শেষ হবে বলে আশা ইসি সচিবালয়ের।
সিইসি জানান, নির্বাচনের প্রধান অংশীজন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের আয়োজন করা হবে। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে সহযোগিতা চান তিনি। কারণ সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ ভোট আয়োজনে জনসচেতনতা বাড়াতে রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিইসি বলেন, ‘যেনতেন একটা নির্বাচন করে আপনারা জেতার চেষ্টা করবেন না। কারণ প্লেয়াররা যদি সবাই ফাউল করার নিয়তে মাঠে নামেন, তখন রেফারির পক্ষে সে ম্যাচ রক্ষা করা সম্ভব হয় না। লালকার্ড কজনকে দেখাবেন আপনি? সুতরাং যারা খেলবেন তাদের তো দায়িত্ব বিশাল। কাজেই আমাদের সাহায্য করুন। সুন্দর ক্রেডিবল একটা ট্রান্সপারেন্ট ইলেকশন দিতে চাই; আপনাদের সহযোগিতা ছাড়া সেটা পারব না।’
ভোট গ্রহণ কাজের প্রস্তুতি নিয়ে সিইসি জানান, ভোটের কাজে সম্পৃক্ত থাকবেন এমন ৮-৯ লাখ কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রবাসী ভোটারদের ভোটদানের সুযোগ নিশ্চিত করতে এবং ১০ লাখের বেশি ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সাংবাদিকসহ মাঠপর্যায়ের কর্মীদের পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটদানের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনকে ঘিরে ইসির চ্যালেঞ্জ
এবারের সংসদ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের ওপর ভোটারদের আস্থা সৃষ্টি, ভোটের দিন কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করা, ভোটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ও এআইয়ের অপব্যবহার রোধ করাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে নির্বাচন কমিশন। সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, ‘দেশের মানুষ নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা হারিয়েছে, নির্বাচনব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়েছে। তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, কেন্দ্রে নিয়ে আসা এখন নাম্বার ওয়ান চ্যালেঞ্জ। এতে ভোটারদের দোষ দিয়ে লাভ নাই। তাদের আস্থায় নিতে ইসির তরফ থেকে ফ্রি ফেয়ার ইলেকশনের জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা্ নেওয়া হবে।’
ইসির প্রতি অনাস্থা প্রকাশকারী দলগুলোর আস্থা অর্জনে ইসির পদক্ষেপ সম্পর্কে সিইসি বলেন, ‘আমরা কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে মাথা ঘামাতে চাই না। রাজনৈতিক নেতারা অনেক কথা বলতে পারেন, এটা ওনাদের ইচ্ছা, বললে কোনো অসুবিধা নাই। আমরা যখন প্রফেশনালি নিউট্রালি কাজ করছি, তখন অটোম্যাটিক্যালি আস্থা আসবে, ফিরে আসবে। বিশ্বাস করি আমাদের কর্মকাণ্ড যতই তারা দেখবেন, তাদের আস্থা সৃষ্টি হবে।’
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নির্বাচনের জন্য কতটা সহায়ক জানতে চাইলে সিইসি বলেন, ‘এখন তো সেই অবস্থা নাই। পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হচ্ছে। আরও কয়েক মাস সময় আছে। আগামী কয়েক মাসে আরও উন্নতি হবে। আমরা আয়নার মতো স্বচ্ছ নির্বাচন উপহার দিতে চাই। ভোটারদের আস্থা অর্জনে ভোটের নির্বিঘ্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে চাই। যেন উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট হয়।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভোট প্রস্তুতি
আগামী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে গতকাল সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নবিষয়ক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, সংসদ নির্বাচনের আগেই সব জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) ও অফিসার ইনচার্জ (ওসি) পদে লটারির মাধ্যমে কর্মকর্তা নির্বাচন করে পদায়ন করা হবে। তিনি বলেন, ‘যেকোনো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ডিসি, এসপি, ইউএনও এবং ওসিদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা তাদের আসনে পছন্দের ডিসি, এসপি কিংবা ওসিকে পদায়ন করতে চান। এ কারণে কর্মকর্তারা এখন যেখানেই থাকুক না কেন, নির্বাচনের আগে তাদের লটারির মাধ্যমে বদলি করা হবে; বিশেষ করে ওসি ও এসপিদের পদায়ন করা হবে।
এ ছাড়া সংসদ নির্বাচনে ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মনিটর করতে দেশের ৪৭ হাজার ভোটকেন্দ্রের প্রতিটিতে একটি করে বডি ক্যামেরা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বডি ক্যামেরা কারা পাবেন- এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের ৪৭ হাজার ভোটকেন্দ্রের প্রতিটিতে একটি করে বডি ক্যামেরা দেওয়ার চেষ্টা করব। পুলিশের সিনিয়র দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছেই এই ক্যামেরা থাকবে।’ তিনি আরও জানান, নির্বাচন পরিচালনার জন্য সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ৮ লাখ সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত সব বাহিনীর সদস্যদেরই (আনসার থেকে সেনাবাহিনী) প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রিসাইডিং অফিসাররা যেন কারও বাসায় না থেকে নির্বাচনি কেন্দ্রে থাকতে পারেন, সে ব্যবস্থা করা হবে। তাদের সঙ্গে আনসার ও পুলিশ সদস্য মাঠে নিয়োজিত থাকবেন।