ভবনের নকশা ও নিমার্ণ সংক্রান্ত কাজ পর্যবেক্ষণে ব্যয় হবে ৪০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। যা মোট খরচের প্রায় ৬ শতাংশ। ৯ বিঘা নিজস্ব জমি অধিগ্রহণে খরচ করা হবে ৬০ কোটি টাকা। প্রশিক্ষণ ও গবেষণা সেন্টার নির্মাণে খরচ করা হবে ৩৩২ কোটি টাকা। দুটি যানবহন ব্যবহারে খরচ করা হবে ১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এভাবে ‘ঢাকা ওয়াসা ট্রেনিং অ্যান্ড রিসার্চ একাডেমি’ নামে ১০ তলা বিল্ডিং নির্মাণ প্রকল্পে বিভিন্ন খাতে খরচ করা হবে ৭২১ কোটি টাকা।
এর মধ্যে কোরিয়ার ঋণ হচ্ছে ৫৭১ কোটি টাকা, বাকি ১৫০ কোটি টাকা সরকারি কোষাগার থেকে খরচ করা হবে। স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে সম্প্রতি সরকার তাতে অনুমোদন দিয়েছে। অত্যাধুনিক এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ঢাকা ওয়াসা।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও ঢাকা ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আসাদগেটে একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। কিন্তু সেটা স্থানীয় কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য। তাই পানি ও পয়ঃব্যবস্থাপনাসংশ্লিষ্ট সেবা প্রদানে একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ ও গবেষণা একাডেমি স্থাপনের উদ্যোগ নেয় ঢাকা ওয়াসা। এরই অংশবিশেষ এই প্রকল্পটি তৈরি করা হয়। তাতে খরচ ধরা হয়েছে ৭২১ কোটি ৪২ লাখ টাকা। বাস্তবায়নকাল ধরা হয় ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত। এর অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্পটি পাঠানো হলে তা যাচাই করতে গত ১০ মার্চ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় কিছু ব্যাপারে আপত্তি করে সংশোধন করতে বলা হয়। সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। এর পর ৫০ কোটি টাকার বেশি হওয়ায় ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) এম এ আকমল হোসেন আজাদ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করেন। তার পর সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়।
প্রকল্পের প্রধান কাজ হচ্ছে- ১০ তলা একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও গবেষণা সেন্টার। এতে খরচ ধরা হয়েছে ৩৩১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। যা মোট খরচের প্রায় ৪৬ শতাংশ। এই ভবন নির্মাণে ভূমি অধিগ্রহণ করতে হবে ২ দশমিক ৮ একর বা প্রায় ৯ বিঘা। নিজস্ব জমিতে এই ভবন নির্মাণ করা হবে। তার পরও খরচ ধরা হয়েছে ৬০ কোটি টাকা। যা মোট খরচের ৮ শতাংশের বেশি। এই ভবনের আর্কিটেকচারাল ডিজাইন ও কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন করতে পরামর্শক সেবা খাতে খরচ করা হবে ৪০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। যা মোট খরচের ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ। প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও একাডেমি কাজের জন্য ৫৬ কোটি টাকার বিভিন্ন যন্ত্রপাতিও কেনা হবে। প্রায় ৪৪ কোটি টাকা খরচ করে গবেষণার যন্ত্রপাতিও কেনা হবে। এসব দেখভাল তথা প্রশিক্ষণ ও গবেষণাবিষয়ক পরামর্শক সেবা (কারিগরি পরামর্শক) খাতে খরচ ধরা হয়েছে ৩২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এ ছাড়া কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা, সম্মানী, যাতায়াত খরচ, যানবাহন ব্যবহারের খরচ রয়েছে। এভাবে বিভিন্ন খাতে খরচ ধরা হয়েছে ৭২১ কোটি টাকা।
প্রকল্পটি গ্রহণের যৌক্তিকতা
প্রকল্পটি গ্রহণের ব্যাপারে বলা হয়েছে- ঢাকা ওয়াসা ওয়াটার মাস্টার প্ল্যান এবং সুয়ারেজ মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করেছে। এই মাস্টার প্ল্যান অনুসারে বর্তমানে ২টি পানি শোধনাগার ও একটি পয়ঃশোধনাগার নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। সিস্টেম লস কমানো এবং প্রেসারাইজড পদ্ধতিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে সুপেয় পানি সরবরাহের লক্ষ্যে সমগ্র ঢাকা শহরকে ১৪৫টি ডিস্ট্রিক মিটারেড এরিয়াতে (ডিএমএ) বিভক্ত করা হয়েছে। যার ৮৯টি ডিএমএ নির্মাণ করা হয়েছে। বাকিগুলো নির্মাণাধীন রয়েছে। এ ছাড়া সেন্টার মনিটরিং ও ডাটা অ্যাকুইজিশনের জন্য স্মার্ট মিটার এবং বড় করে সুপারভাইজারি কন্ট্রোল ডাটা অ্যাকুইজেশন ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমানে এই বিষয়গুলোর ওপর ঢাকা ওয়াসার কর্মকর্তাদের জ্ঞান না থাকায় এসব কাজ বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হচ্ছে। যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বর্তমান ঢাকা ওয়াসার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটিতে অবকাঠামো এবং মানবসম্পদ অপ্রতুলতার কারণে সংশ্লিস্ট আধুনিক প্রযুক্তির জ্ঞান অর্জন এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ খুবই কম। এ ছাড়াও মাইক্রোবায়োলজি ও কেমিক্যাল বিভাগ থেকে শুধু পানির কোয়ালিটি পরিমাপ করা হয়। কিন্তু মান বৃদ্ধিসংক্রান্ত গবেষণা অপ্রতুল।
এমন অবস্থায় টেকসই পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার জন্য পানি ও পয়ঃশোধনাগারের নির্মাণকাজে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কম খরচে পানি ও পয়ঃশোধনাগার নির্মাণ, ডিএমএ স্থাপন, স্মার্ট মিটার, এসসিএডিএ ব্যবহারসংক্রান্ত বিষয় নতুন হওয়ায় সে সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনে ঢাকা ওয়াসার আন্তর্জাতিক মানের একটি প্রশিক্ষণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপন করা প্রয়োজন। যেখানে ঢাকা ওয়সার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় পানি ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ধ্যান-ধারণা ও দক্ষতা উন্নয়নের কাজ করা হবে। সে লক্ষ্যে প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এটি হবে খুবই অত্যাধুনিক ও রাজকীয় ভবন। এজন্য বিভিন্ন খাতে টেকনিক্যাল ব্যাপার যোগ করা হয়েছে।
প্রকল্প এলাকা নির্বাচনের যৌক্তিকতা
প্রকল্পটি রাজধানীর কেন্দ্রস্থল মিরপুর-১০-এ ঢাকা ওয়াসার নিজস্ব জমিতে স্থাপন করা হবে। যা শাহজালাল আন্তর্জঅতিক বিমানবন্দর থেকে ৫ কিলোমিটার এবং তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে ২ কিলোমিটারে দূরে অবস্থিত। এখানে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা অফিস, গভীর নলকূপ, আউটডোর ট্রান্সফরমার ও অন্যান্য অবকাঠামো বিদ্যমান রয়েছে। ঢাকা ওয়াসার নিজস্ব জমিতে প্রশিক্ষণ একাডেমি স্থাপন করা হলে নতুন করে ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থীদের যাতায়াতে কোনো অসুবিধা হবে না। এসব বিবেচনা করে প্রকল্প এলাকা নির্মাণ করা হয়েছে। বিদেশি ঋণে হচ্ছে প্রকল্পটি।
২০২৩ সালের মে মাসে বাংলাদেশ সরকার ও কোরিয়া সরকারের মধ্যে একটি ঋণচুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী এ প্রকল্পের ঋণের নিশ্চয়তা রয়েছে। কোরিয়া এক্সিম ব্যাংকের আর্থিক সহযোগিতায় কে-ওয়াটার, হ্যানওয়াং ইউনিভার্সি এবং ইলি কনস্ট্রাকশন প্রকল্পটির ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন করে।
প্রকল্পটির ব্যাপারে জানতে প্রকল্প পরিচালক মিহির কুমার দত্তের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, কেবল সরকার প্রকল্পটির অনুমোদন দিয়েছে। এখনো সরকারি আদেশের (জিও) কাগজ হাতে পাইনি। কাজেই এ মুহুর্তে কিছু বলার নেই।’