আগামী অর্থবছরের বাজেটে শুল্ক-কর-ভ্যাটের মারপ্যাঁচে চাল, ডালসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্য থেকে পাউরুটি, চিপস, বিস্কুট ও জুসের মতো খাবারের দাম বাড়বে। চিকিৎসা ও যাতায়াতের খরচ বাড়বে। শিক্ষা উপকরণের দাম বাড়বে। আমদানি করা মোবাইল, ল্যাপটপ ও কম্পিউটার এবং এসব পণ্যের যন্ত্রাংশের দাম বাড়বে। দেশি পোশাকের দাম বাড়বে। ঠিকাদার ব্যবসায়ের লাইসেন্স ফি বাড়বে। জোরালো আবেদন সত্ত্বেও আগামীবারও কমবে না মোবাইল ফোন ব্যবহারের খরচ।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এসব জানা যায়।
সূত্র আরও জানায়, বাজেটে চাল, ডাল, চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি পর্যায়ে উৎসে কর কিছুটা কমিয়ে বহাল থাকছে। আমদানিকারকরা এই বহাল থাকা করের অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়িয়ে রাখার সুযোগ পেতে পারেন।
আগামী বাজেটে তামাক পণ্যের দাম বাড়বে। কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক বাড়ানোয় দেশে উৎপাদিত ঘড়ি ও চশমার দাম বাড়বে। অন্যদিকে সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোয় বিদেশি ঘড়ি ও চশমার দামও বাড়বে। বিদেশি ব্র্যান্ড ও নন ব্র্যান্ড সব ধরনের প্রসাধনীর দাম বাড়বে। আমদানি করা গুঁড়া দুধ, মাছ ও শুকনা ফলের দাম বাড়বে।
ব্যবসায়ীরা দাম কমানোর জোরালো আবেদন করলেও কমছে না মাছ ও পোলট্রি ফিডের দাম। মানবিক বিবেচনায় কিডনি ডায়ালাইসিসের খরচ কমানোর পরামর্শ দিলেও আমলে আনা হচ্ছে না। কাঁচামাল আমদানিতে ছাড় না দেওয়ায় কমছে না ওষুধের দাম। জমি রেজিস্ট্রির খরচ কমানো হচ্ছে না।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অর্থ সংকটে নিয়মিত খরচ চালিয়ে যাওয়াও সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় মিটাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ আগামী বাজেটে খরচ কমানোর প্রত্যাশা করলেও তা বাস্তবায়ন হবে না। বরং বাজেটে সরকার আয় বাড়াতে গিয়ে আগামী অর্থবছরের বাজেটে অনেক জিনিসপত্রের দাম বাড়াচ্ছে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প খাতে খরচ বাড়বে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, এরই মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে বাড়বে মূল্যস্ফীতি। অন্যদিকে নতুন অর্থবছরে এক লাখ কোটি টাকার বেশি ভ্যাটের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। অন্য সব বাদ দিয়ে শুধু এই দুই কারণেই অনেক কিছুর দাম ও খরচ বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এ সব কিছুই জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে ফেলবে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, আওতা বাড়িয়ে সরকার আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। অনেক নতুন খাত অর্থনীতির মূল ধারায় যুক্ত করা হচ্ছে। এতে সরকারের আয় বাড়বে বলে আশা করছি।
বাজেট প্রণয়নকালেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে দেশি কম্পিউটার শিল্পের বাজার সম্প্রসারণে দেশে কম্পিউটার সংযোজন ও খুচরা যন্ত্রাংশ উৎপাদনে রাজস্ব ছাড়ের সর্বোচ্চ সুবিধা দেওয়ার জন্য আবেদন করে। আগামী বাজেটে কম্পিউটার সংযোজনকারী শিল্প এবং কম্পিউটার আমদানি নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। বাজেট প্রস্তাব চূড়ান্ত হলে আমদানিকৃত কম্পিউটার ও ল্যাপটপের দাম বাড়বে।
সূত্র জানায়, মোটরসাইকেল উৎপাদনে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিদ্যমান রাজস্ব বহাল থাকলেও উচ্চ সিসির সম্পূর্ণ মোটরসাইকেল আমদানিতে শুল্ক হার বাড়বে। এতে আমদানি করা বেশি সিসির মোটরসাইকেলের দাম বাড়বে। অন্যদিকে আসন্ন বাজেটে আমদানিকৃত প্লাস্টিক পণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। পার্লারের খরচ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহনে চলাচল খরচও আসন্ন বাজেটে বেশি থাকবে।
সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর ফলে আসন্ন বাজেটে অটোরিকশার যন্ত্রাংশ আমদানিতে খরচ বাড়বে। এতে অটোরিকশা বানাতে খরচ বাড়বে। ফলে অটোরিকশার দাম বাড়বে।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সদস্য প্রায় ৩০ লাখ। এনবিআর থেকে এসব দোকানের তালিকা নিয়ে ভ্যাটের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব দোকানের মধ্যে লক্ষাধিক হস্ত ও কুটির শিল্পের দোকান আছে। এসব দোকানের বেশির ভাগই এসএমই খাতের (ক্ষুদ্র ও মাঝারি। আগামী বাজেটে ছোট দোকানের ওপর বছরে এক হাজার টাকা করে ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ছোট ছোট দোকান সাধারণত পাড়া-মহল্লা ও গ্রামে থাকে। এসব দোকানের আয় দিয়ে দোকান-মালিক সংসারের খরচ চালান। এসব লোকের বেশির ভাগই অল্প আয়ের মানুষ। এখান থেকে যারা কেনাকাটা করেন তারাও ধনী ব্যক্তি না। এসব দোকানকে ভ্যাটের আওতায় আনা হলে দোকান-মালিকের ওপর চাপ হয়ে যাবে। অনেক দোকান জিনিসপত্রের দামও বাড়াবে।
আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণের বদলে আরও উসকে দেবে বলে মনে করছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, গণমাধ্যমে দেখেছি আগামী বাজেটের আকার ৯ লাখ কোটি টাকার বেশি হবে। এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের আয় বাড়াতে হবে। এনবিআরের রাজস্বের আওতা ও লক্ষ্যমাত্রা বাড়াতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে নতুন করে শুল্ক-কর-ভ্যাট আরোপ করতে হবে। এতে অনেক পণ্যের দাম বাড়বে। সেবা খাতের খরচ বাড়বে। যা জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াবে। এখনই সাধারণ মানুষ খরচের চাপে আছে। আরও খরচ বাড়লে বিপাকে পড়বে।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে স্টেডিয়ামের খেলা ও থিয়েটারে নাটক দেখতে হলে এখনকার চেয়ে বেশি দাম দিয়ে টিকিট কাটতে হবে।
আসন্ন অর্থবছরের বাজেটে ভারতসহ অনেক দেশ থেকে তুলা আমদানিতে খরচ বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানিতে বিশেষ ছাড় থাকবে। তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা কম দামে তুলা আমদানির পক্ষে। তাদের বেশির ভাগই ভারত থেকে কম দামে তুলা আমদানি করতে চায়। অন্যদিকে টেক্সটাইল খাতের ব্যবসায়ীরা ভারত থেকে তুলা আনার বিপক্ষে। তারা দেশে উৎপাদিত তুলা ব্যবহারের পক্ষে। তবে সরকার পড়েছে খানিকটা বেকায়দায়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি বাড়ানোর শর্ত রয়েছে। তাই আগামী বাজেটে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানিতে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে।
শুল্ককরের মারপ্যাঁচে আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার পরই মোবাইল ফোনের সামগ্রী বেশি দামে আমদানি করতে হবে। মোবাইল ফোন মেরামতে খরচ বাড়বে। একই সঙ্গে আমদানি করা মোবাইলের দামও বাড়বে। একইভাবে কম্পিউটার যন্ত্রাংশ আমদানিতে খরচ বাড়বে। এতে কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের গুনতে হবে বাড়তি টাকা।
আগামী বাজেটে দেশে শিল্প খাতে ব্যবহৃত অনেক কাঁচামালের আমদানি নিরুৎসাহিত করা হবে। বিশেষভাবে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি, লোহার রড, স্ক্র্যাব, টেক্সটাইল, চামড়া খাত, পাটশিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হবে। দেশি গরুর দুধ, মসলা ও দেশি শিল্পে বানানো খেলনার দাম বাড়বে না।
অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আগামী অর্থবছরের বাজেটে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, সফটওয়্যার বা অ্যাপ্লিকেশন কাস্টমাইজেশন, এনটিটিএন, ডিজিটাল কনটেন্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট, ডিজিটাল অ্যানিমেশন ডেভেলপমেন্ট, ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্ট, ওয়েবসাইট সার্ভিস, ওয়েব লিস্টিং, আইটি প্রসেস আউটসোর্সিং, ওয়েবসাইট হোস্টিং, ডিজিটাল গ্রাফিক্স ডিজাইন, ডিজিটাল ডেটা এন্ট্রি অ্যান্ড প্রসেসিং, ডিজিটাল ডেটা অ্যানালেটিক্স, জিওগ্রাফিক্স ইনফরমেশন সার্ভিসেস, আইটি সাপোর্ট অ্যান্ড সফটওয়্যার মেইনটেন্যান্স সার্ভিস, সফটওয়্যার ল্যাব টেস্ট সার্ভিস, কল সেন্টার সার্ভিস খাতে খরচ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হবে। একইভাবে ওভারসিজ মেডিকেল ট্রান্সক্রিপশন্স সার্ভিস, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন সার্ভিস, ডকুমেন্ট কনভারশন, রোবোটিক্স প্রসেস আউটসোর্সিং এবং সাইবার সিকিউরিটি সার্ভিস খাতেও খরচ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হবে। সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থমন্ত্রীসহ এনবিআর বাজেট প্রস্তুত কমিটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এসব খাতের ওপর কোনো ধরনের রাজস্ব আরোপ না করার নির্দেশ দেন। ফলে আগামী বাজেটে বাড়ছে না এসব খাতের খরচ।