ঢাকা ১ আষাঢ় ১৪৩১, শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪

ব্যতিক্রমী সময়ে গতানুগতিকতার বাজেট

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৪, ১০:৪৩ এএম
আপডেট: ১০ জুন ২০২৪, ১০:৪৩ এএম
ব্যতিক্রমী সময়ে গতানুগতিকতার বাজেট
ড. মোস্তাফিজুর রহমান

২০২৪-২৫ অর্থবছরে যে বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে, বলা বাহুল্য এটি একটি চ্যালেঞ্জিং সময়ের বাজেট। তবে এটি ব্যতিক্রমী সময়ের বাজেট হিসেবে গতানুগতিকতার বাইরে যেতে পারেনি। বাংলাদেশ একটি শক্তিমত্তার জায়গায় ছিল। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, নিম্ন মূল্যস্ফীতি এবং উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি- এই তিনটি ক্ষেত্র বর্তমান সময়ে একই সঙ্গে বিগত দুই বছরে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানের একটা অবনমন হয়েছে। আমরা আশা করেছিলাম, সেদিকে লক্ষ্য রেখে বাজেটে মূল্যস্ফীতি হ্রাস করা, সাধারণ মানুষের সামাজিক সুরক্ষা ইত্যাদি বিষয়কে আরও শক্তিশালী করার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হবে। আমরা দেখেছি যে, বাজেটে বেশ কিছু প্রস্তাব করা হয়েছে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার জন্য। এবারের বাজেটে কর কাঠামোর কিছুটা পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। যাতে মধ্যবিত্তদের ওপর করের চাপ কিছুটা কমে। উচ্চবিত্তের ওপর করের হার ২৫ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ করা হয়েছে। কিছু কিছু আমদানি করা পণ্যের শুল্ক ও ভ্যাট কমানোর প্রস্তাবও করা হয়েছে। তার পরও আমাদের মনে হয়েছে, যে ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন ছিল, তা হয়নি। বিশেষত দুই বছর ধরে সাধারণ মানুষ মূল্যস্ফীতির চাপে আছে। এ রকম একটা অবস্থায় সামাজিক সুরক্ষা খাতে আমরা মনে করেছিলাম বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হবে। সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ সামান্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতিকে যদি আমরা বিবেচনায় নিই, তবে প্রকৃত অর্থে সেই বৃদ্ধি খুব একটা বিবেচ্য নয়। আমরা আশা করেছিলাম, সামাজিক সুরক্ষার প্রাপ্তি ও স্থায়িত্ব আরও বাড়ানো হবে। কিন্তু আমরা দেখেছি, সামাজিক সুরক্ষা খাতে যে হিসাব সেখানে কৃষি খাতের ভর্তুকিও আছে, সঞ্চয়পত্রের সুদের প্রিমিয়ামও আছে। সরকারি কর্মকর্তাদের পেনশন খাতের স্কিম ইত্যাদিও সেখানে ঢোকানো হয়েছে। এগুলো বাজেটের ১৭ শতাংশের মতো হয় অথবা জিডিপি ১.৩ শতাংশের মতো হয়। এটা খুব বেশি বাড়ানো হয়নি। আমাদের প্রস্তাব ছিল, শহরাঞ্চলে রেশনিংয়ের ব্যবস্থা করা, বিভিন্ন ধরনের সার্ভে যেমন ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম, বিশ্বব্যাংক অথবা আমাদের বিবিএসের সার্ভে করা। দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টিনিরাপত্তায় ভুগছে মানুষ। এমনকি দারিদ্র্যসীমার ওপরে যারা আছে তারা এবং বিশেষত শিশুরা; যাদের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাহীনতা তুলনামূলকভাবে বেশি। সে ক্ষেত্রে আমরা মনে করেছিলাম স্কুল ফিডিংয়ের মতো কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে, কিন্তু তা দেখিনি। বাজেটে যে ধরনের প্রস্তাব করা হয়েছে, তাতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বৃদ্ধি তেমন একটা হয়নি। অন্যদিক থেকে অনেক পণ্যের ওপর ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে। যদিও আইএমএফের কথা উল্লেখ নেই। তবে ২০১২ সালের ভ্যাট সাপ্লিমেন্টারি যেটা করা হয়েছিল, অর্থাৎ গড়ে ১৫ শতাংশ সাপ্লিমেন্টারি; সে ক্ষেত্রে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে বেশ কিছু পণ্য ও মোবাইল টক টাইম থেকে শুরু করে অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাত আছে, যেখানে এই ভ্যাট বৃদ্ধির ফলে অথবা ভ্যাট প্রত্যাহারের যে সুযোগ ছিল সেগুলো বাতিল হওয়ার ফলে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে।

আমাদের বড় সমস্যা হলো, আমাদের রাজস্ব জিডিপির হার যেহেতু কম, আমরা ক্রমান্বয়ে ঋণনির্ভর হয়ে পড়ছি। আমাদের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি যেটা ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকার মতো আছে, সেটা পুরোটাই হয় অভ্যন্তরীণ ঋণ, নয়তো বৈদেশিক ঋণ। এই ঋণনির্ভরতা বাজেটেও দেখেছি। সুদের ব্যয় দুই নম্বরে চলে আসছে। প্রথমত, জনপ্রশাসন ব্যয়, তারপর সুদের ব্যয়। এটা নিঃসন্দেহে একটি অশনিসংকেত। ক্রমান্বয়ে সুদ ও আসলের পেছনে একটি বড় অংশ চলে যায়। তাহলে অন্যান্য খাতে ব্যয়ের যে সুযোগ সেগুলো থাকবে না। চেষ্টা করতে হবে, যেভাবেই হোক রাজস্ব যেন বাড়াতে পারি। রাজস্ব টার্গেট ধরা হয়েছে ৯.৭ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এটা ছিল ৮.৩ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে বলে মনে হচ্ছে না। সেখানে ৭০-৮০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি থাকবে। এ রকম অবস্থায় যদি ৯.৭ শতাংশ রাজস্ব আদায় করতে হয়, তাহলে ২৫ শতাংশের মতো রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। সে ক্ষেত্রে যে ধরনের বিনিয়োগ দরকার সেটা বাজেটে দেখিনি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে শক্তিশালী করা দরকার। ডিজিটালাইজেশনকে শক্তিশালী করা দরকার। করখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। সে ধরনের উদ্যোগ এবারের বাজেটে দেখা যায়নি বরং আমরা দেখেছি যারা কর দেননি এবং যাদের কাছে অপ্রদর্শিত টাকা রয়েছে তাদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে ১৫ শতাংশ কর দিয়ে সেটাকে বৈধ করার। এখানে আমরা দেখেছি ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিলে আর কোনো ধরনের প্রশ্ন করা হবে না। অর্থাৎ যারা অবৈধভাবে টাকা আয় করেছে তাদেরও একধরনের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এটি অন্যায় এবং একটি অযৌক্তিক পদক্ষেপ এবং এটা প্রত্যাহার করা উচিত। এটা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। কর না দিয়ে পরবর্তী সময়ে ১৫ শতাংশ দিয়ে এ অপ্রদর্শিত টাকাকে বৈধ করে নেওয়া হলো। আমরা মনে করি সেটাও ঠিক নয়। এটা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

রাজনৈতিকভাবেও মানুষ এটাকে ভালোভাবে নিতে পারে না। নৈতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক- কোনোভাবেই এটা গ্রহণযোগ্য পদক্ষেপ নয়। এ কথা মনে রাখতে হবে যে, রাজস্ব ব্যয়, যেটা সরকারের রাজস্ব আয় এবং ঘাটতি অর্থায়ন ৪.৬ শতাংশ ধরা হয়েছে। এটা মিলে মোট সরকারি ব্যয় ১৪ শতাংশের মতো। রাজস্ব আদায় বাড়িয়ে বিভিন্ন খাতে ব্যয় সক্ষমতাকে বাড়াতে হবে এবং ঋণনির্ভরতা কমাতে হবে। একই সঙ্গে এটা মনে রাখতে হবে যে সরকারের ব্যয় যদি ১৪ শতাংশ হয় জাতীয় আয়ের, তাহলে বাকি অংশ বেসরকারি খাতে। বিনিয়োগবান্ধব ও ব্যবসার পরিবেশ যাতে ভালো হয় সেদিকেও নজর দিতে হবে। সেটা শুধু রাজস্বনীতি দিয়ে হবে না। সামষ্টিক অর্থনীতি পরিচালনায় সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিতে হবে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা একটা সংকোচনমূলক নীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বাজেটও কিছুটা সংকোচিত করা হচ্ছে। এ রকম একটা অবস্থায় বিনিয়োগ পরিস্থিতির যদি মান এবং দক্ষতা না বাড়ানো যায়, তাহলে আমরা যে প্রাক্কলন করছি, প্রবৃদ্ধি ৬.৭৫ শতাংশে নিয়ে আসব বা মূল্যস্ফীতি ৬.৫ শতাংশে নিয়ে আসব সেটা সম্ভব হবে না।  

সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা শুধু বাজেট দিয়ে হবে না। সেই ব্যবস্থাপনা ও এর গুণগত মান ভালোভাবে রাখতে হলে সরকারি যেসব প্রতিষ্ঠান আছে, তার সেবা দেওয়ার দক্ষতাও সক্ষমতার দিকে নজর দিতে হবে। তাহলে বিভিন্ন বিনিয়োগ এবং আয় বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি, কর্মসংস্থান ইত্যাদি কাজগুলো করতে পারব। সুতরাং বলা যায়, একটা চ্যালেঞ্জিং টাইমের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি। যেখানে একদিকে মূলস্ফীতি কমাতে হবে, অন্যদিকে প্রবৃদ্ধি কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও বিনিয়োগ উৎকর্ষ বাড়িয়ে কর্মস্থান সৃষ্টি করে আয় বাড়াতে হবে। এটা একটা চ্যালেঞ্জিং সময়। অর্থনীতি যদি আগের জায়গায় নিয়ে যেতে হলে উচ্চ প্রযুক্তি, নিম্ন মূল্যস্ফীতি, সামষ্টিক স্থিতিশীলতার দিকটি বিবেচনায় রাখতে হবে। বাজেট কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে সেটার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। বিশেষত, বাজেটের ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকার যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি, এটা যাতে সাশ্রয়ীভাবে ও  সময়মতো করতে পারি, সুশাসনের সঙ্গে করতে পারি, সেদিকটায় বেশি নজর দিতে হবে। এবারের বাজেট বাস্তবায়নের উৎকর্ষ ও মানসম্মত বাস্তবায়ন প্রয়োজন।  তার কারণ হলো যে, অর্থায়ন কিছুটা সংকুচিতভাবে করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বাজেটের আকারও খুব একটা বাড়েনি। গতবারের থেকে ৪-৫ শতাংশ মতো হয়তো বেড়েছে। এই কম টাকা দিয়েই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হবে। সুতরাং সুশাসনের পাশাপাশি সরকারি প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি প্রয়োগ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এই বাজেটে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সংকট কাটবে না। এটার জন্য আরও সময়ও লাগবে। 

পরপর দুবার মূল্যস্ফীতির কারণে মূল্যস্তর অনেক ওপরে রয়েছে। সেটা কমাতে গেলে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে হবে। সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের যে অবনমন হয়েছে, সেটার প্রতি লক্ষ্য রেখে ফ্যামিলি কার্ড অথবা দুস্থ ভাতা প্রকল্প বলি, সে ক্ষেত্রে যে বাজেট বরাদ্দ হয়েছে সেটা আরও বৃদ্ধি করা উচিত। একই সঙ্গে যেসব খাতে বরাদ্দ আছে সে কাজগুলো যেন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয় স্পষ্টতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির  মাধ্যমে, সেদিকেও নজর দিতে হবে। টাকা সাদা করার মতো এ ধরনের পদক্ষেপ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। দায়মুক্তি থেকে বেরিয়ে এসে বরঞ্চ যারা এগুলো করছে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে এসে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি বলে মনে হয়। সামগ্রিকভাবে যদি বলি, একটা ব্যতিক্রম সময়ে বাজেট দেওয়া হয়েছে, এই বাজেট গতানুগতিকতার বাইরে যেতে পারেনি। 

লেখক: সম্মানীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি 
ডায়ালগ (সিপিডি)

শুদ্ধাচার পুরস্কার পাওয়া প্রশ্নবিদ্ধ

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪, ০১:৫২ পিএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪, ০১:৫২ পিএম
শুদ্ধাচার পুরস্কার পাওয়া প্রশ্নবিদ্ধ
ড. আবুল কাসেম ফজলুল হক

আজিজ আর বেনজীর অপরাধমূলক কাজ করে গেছেন ক্রমাগতভাবে। এখন যেভাবে তদন্ত হচ্ছে সেখানে অনেক সত্য বের হয়ে আসছে। এখন পক্ষপাতমুক্ত অবস্থান থেকে বিষয়টার বিচার করা দরকার জাতীয় স্বার্থে। অপরাধীদের শাস্তি হওয়া দরকার।

এ ছাড়া দুর্নীতিপ্রবণ মানসিকতা যেন আর অন্যদের মধ্যে দেখা না দেয় সেরকম একটা ধারণা দিতে হবে। আমাদের দেশে অন্য দেশের তুলনায় দুর্নীতি, অনাচার অনেক বেশি। কিন্তু এর আগে সরকার এরকম অগ্রসর হয়নি। এবার অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ হয়েছে। 

এখন শুদ্ধাচার পুরস্কার পাওয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে। পুরস্কার যে সরকার কী উদ্দেশ্যে দেয়? এই সরকার গত দশ বছরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরস্কার প্রবর্তন করেছে। পুরস্কার বাবদ অর্থও দিচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে সঙ্গে রাখা হচ্ছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ যাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে পুরস্কার দিচ্ছে সেসব পুরস্কার সম্পর্কে বিভিন্ন সভা, সমাবেশে নানা কথা শুনি। সরকার যদি সঠিক নীতি দিয়ে পুরস্কার দেয় তাহলে ভালো হবে। দলীয় মনোভাব থেকে পুরস্কার দিলে তার ফল ভালো হয় না।

অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

নির্বাচন-প্রক্রিয়া সৎভাবে মানা হচ্ছে না

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪, ০১:৫০ পিএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪, ০১:৫০ পিএম
নির্বাচন-প্রক্রিয়া সৎভাবে মানা হচ্ছে না
সুলতানা কামাল

শুদ্ধাচার পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পরবর্তী সময়ে দুর্নীতিবাজ হিসেবে চিহ্নিত বা প্রমাণিত হওয়ার ঘটনাই সাক্ষ্য দেয় যে, এসব পুরস্কারের জন্য যে নির্বাচন-প্রক্রিয়া রয়েছে, সৎভাবে কিংবা নীতিনিষ্ঠভাবে তা মানা হচ্ছে না। যারা এই প্রক্রিয়ার দায়িত্বে রয়েছেন, হয় তারা নিজ স্বার্থে বা কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত হয়ে তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। এটা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক এবং গর্হিত একটি কাজ। 

রাষ্ট্রের এত সম্মানীয় পুরস্কার দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত এসব ব্যক্তি নিশ্চয়ই সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারাই যখন এ ধরনের অনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান, তখন বুঝতে হবে সমাজের নৈতিকতাবোধের কত অধঃপতন ঘটেছে এবং তাদের মাধ্যমে দুর্নীতি কতটা প্রশ্রয় লাভ করেছে। 

কাজেই  এসব পদক দেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু প্রক্রিয়াগত ত্রুটি নিয়ে ভাবলে চলবে না,  ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থান করা প্রভাবশালী, শক্তিধর ব্যক্তিদের নৈতিক মান নিয়েও প্রশ্ন তুলতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা ব্যতীত এ ধরনের স্খলনের কোনো সুরাহা হবে না। 

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও চেয়ারম্যান, টিআইবি

এটা এখন মূল্যহীন আনুষ্ঠানিকতা

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪, ০১:৪৮ পিএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪, ০১:৪৮ পিএম
এটা এখন মূল্যহীন আনুষ্ঠানিকতা
গোলাম রহমান

অশুদ্ধ কিছু আছে বলেই শুদ্ধাচারের কথা উঠেছে। দায়িত্বপালনের ক্ষেত্রে সেবা প্রদান নিয়ে পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকা উচিত নয়। এটা যদি ইন্টিগ্রিটির উপাদান বা মানদণ্ডের দিক বিবেচনায় হয়ে থাকে, তাহলে ঠিক আছে। পুরস্কার পাওয়ার পর কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হবে, এটাই স্বাভাবিক। 

যাদের বিরুদ্ধে নৈতিক স্থলন, অসদাচরণ, অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ আছে তাদেরকে পুরস্কারের বিবেচনায় আনা ঠিক নয়। এ ক্ষেত্রে নির্বাচকদের নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। এতে পুরস্কার প্রদানকারী এবং পুরস্কার প্রদানের প্রক্রিয়া দুটোই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এমনটাই হচ্ছে। এখন এটা শুধু মূল্যহীন আনুষ্ঠানিকতা। 

সাবেক চেয়ারম্যান, দুর্নীতি দমন কমিশন
 

দেশের উপজেলা ও বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ চার নির্বাচন: বয়ান ও বিশ্লেষণ

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪, ১১:৩২ এএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪, ১১:৩২ এএম
দেশের উপজেলা ও বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ চার নির্বাচন: বয়ান ও বিশ্লেষণ
ড. তোফায়েল আহমেদ

২০২৪ সাল বিশ্বব্যাপী প্রায় ৬০টি দেশের নির্বাচন বর্ষ। ইতোমধ্যে অনেক দেশে নির্বাচন হয়ে গেছে। সম্প্রতি শেষ নির্বাচন হলো বড় দেশ ভারতে। ভারতের ৯৭ কোটির বেশি ভোটারের সাত দফা নির্বাচনের পর ফলাফল ঘোষিত হলো। ৫৪৩ আসনের লোকসভায় বিজেপির (২৪০ আসন লাভ), একক নিয়ন্ত্রণ শিথিল এবং কংগ্রেসসহ বিরোধীরা অর্থাৎ ইন্ডিয়া জোটের বিজেপি-এএনডিএর মুখোমুখি অবস্থান। দক্ষিণ আফ্রিকায় জাতীয় পরিষদের ৪০০ আসন ও ৯টি প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন ২৯ মে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এবং প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায়, ৩০ বছর পর এএনসির একক প্রাধান্য থাকল না। 

জুলাই মাসের ৪ তারিখ যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচন ঘোষিত হয়েছে। আনুষ্ঠানিক প্রচারাভিযান শুরু হয়েছে। চলতি বছর নভেম্বর ৫-এ অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের ৬০তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা, বিশ্লেষণ ও উত্তেজনার পারদ ধীরে ধীরে ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। বাংলাদেশে উপজেলা পরিষদের নির্বাচন শেষ হলো। ভোটকেন্দ্রে ভোটার অনুপস্থিতি বরাবরের মতো। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকার নির্বাচন নানাভাবে আলোচিত ও বিশ্লেষিত হচ্ছে।

বাইডেন ও ট্রাম্প একে অপরের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছেন

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের প্রধান দুই দলের প্রার্থী মনোনয়ন চূড়ান্তই বলা যায়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মামলায় শাস্তিমূলক রায় হলেও প্রার্থিতার ক্ষেত্রে রিপাবলিকানরা তাতে প্রভাবিত হচ্ছে না। আপিলের সর্বশেষ রায় আসতে আসতে নির্বাচনি প্রক্রিয়া প্রায় সমাপ্ত হয়ে যেতে পারে, তবে এখন পর্যন্ত যে জনমত তা একে অপরের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলার মতো। কিছু বোদ্ধা বিশ্লেষকের অভিমত, শেষ পর্যন্ত কম মার্জিনে হলেও জো বাইডেন বেরিয়ে আসতে পারেন। 

ট্রাম্পের অপরাধ জগৎ, একগুঁয়েমি, গণতন্ত্রবিরোধী অবস্থান, গর্ভপাতবিরোধী অবস্থানে অনেকের নানা অস্বস্তি জো বাইডেনকে ভোট দিতে বাধ্য (Relacted Voting) করতে পারে। আবার ইসরায়েলের গাজা অভিযান ও গণহত্যা, অভিবাসন ও আইনশৃঙ্খলা ইস্যুতে ট্রাম্প ও বাইডেন দুজনকেই অপছন্দের কারণে অনেকে ভোটদানে বিরত থাকতে পারেন। তৃতীয় প্রার্থী হিসেবে জন এফ কেনেডি জুনিয়র কোনো চমক দেখাতে পারেন কি না, তা সময়ই বলে দেবে। কেনেডি এগিয়ে গেলে তা বাইডেনের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে এবং ট্রাম্প তাতে কিছু সুবিধা পেতেও পারেন।

বর্ণবাদোত্তর দক্ষিণ আফ্রিকায় এএনসির প্রথম হার

দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ অবসানের প্রায় ৩০ বছর পরের এ নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এবারে দীর্ঘদিন পর এএনসির প্রাধান্য ক্ষুণ্ন হলো। গত নির্বাচনে ৫৭.৫০ শতাংশ ভোট পেয়ে এএনসি ৪০০ আসনের জাতীয় পরিষদে ২৩০ আসন লাভ করেছিল। পরের তিনটি বড় দল যথাক্রমে ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স, ইকোনমিক ফ্রিডম ফাইট ও ইনডিপেনডেন্ট ফ্রিডম পার্টি সর্বসাকল্যে ৩৪.৯৪ শতাংশ ভোট পেয়ে ৮৪+৪৪+১৪=১৪২ আসন পেয়েছিল। 

এবার নানা বিশ্লেষণে দেখানো হচ্ছে এএনসির ভোটে ধস নেমেছে। গত নির্বাচনে ছোট-বড় ১৪টি দল অংশ নেয়। এবার তাদের সবারই আঞ্চলিক ও জাতীয়ভাবে ভোট ও আসন বাড়তে পারে। এখানে একটি বিষয় জেনে রাখা দরকার, তা হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকায় আমাদের মতো সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা (Majoritarian) পদ্ধতির নির্বাচন হয় না। দক্ষিণ আফ্রিকা সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের (Proportional Representation) নির্বাচন পদ্ধতি অনুসরণ করে। সেখানে জাতীয় পরিষদের ৪০০+৯০টি আসন ও ৯টি প্রদেশে একই সঙ্গে বদ্ধ তালিকার আনুপাতিক (Close-list PR) প্রতিনিধিত্বশীলতার নীতি অনুসৃত হয়। 

তাই প্রাপ্ত ভোটসংখ্যা ও হার এখানে প্রধান বিবেচ্য বিষয়। ভোট প্রাপ্তির হারের ভিত্তিতে আসনসংখ্যা নির্ণীত হবে। নির্বাচনের আগেই প্রার্থী তালিকা নির্বাচন কমিশনে জমা হয়ে যায়। নির্বাচনের পর প্রাপ্ত ভোটের হার অনুযায়ী ওই তালিকা থেকে আসন বণ্টন হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার নির্বাচন পদ্ধতি অত্যন্ত আধুনিক ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে।

ব্রিটেনে টোরিদের পতন কি অত্যাসন্ন!

যুক্তরাজ্যে ক্ষমতাসীন টোরি দল একটি টার্ম পার করতে পাঁচবার প্রধানমন্ত্রী বদলাতে হয়েছে। এটি দলের অভ্যন্তরে একটি বড় সংকটের ঈঙ্গিতবহ। তবে বরিস জনসনকে পদত্যাগে বাধ্য করে রক্ষণশীল দল তাদের নৈতিক অবস্থানে অটল থেকেছে। দীর্ঘদিন একনাগাড়ে ক্ষমতায় থাকা ব্রিটেনে ভোটারদের মধ্যে একধরনের ‘টোরি ক্লান্তি’ (Tory Fatigue) বোধ হয় তৈরি করেছে। 

শ্রমিক দল বেশ চাঙা, সঙ্গে লিবারেল ডেমোক্রেটও। টোরি দলের প্রায় ৭০ জন বর্তমান এমপি এবার ভোটে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এটি টোরিদের জন্য একটি অশনিসংকেত। পরাজয় আঁচ করতে পেরেই তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে সাধারণভাবে মানুষ ধরে নেবে। তা ছাড়া সম্প্রতি সমাপ্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে টোরি দলকে ‘হোয়াইট ওয়াশ’ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৫-৬ সপ্তাহের বিশ্লেষণে অনেক নতুন দিক উন্মোচিত হতে পারে। এ প্রশ্নটি ঘুরেফিরে আসছে- টোরিদের পতন কি অত্যাসন্ন?

ভারতের নির্বাচনে পিলে চমকানো ফলাফল!

ভারতের নির্বাচনের ফলাফলের নানা জরিপকে ভুল প্রমাণ করেছে সর্বশেষ প্রাপ্ত ফলাফল। পাঁচটি সংস্থার আটটি জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণ করে মোদির এনডিএ জোটকে ৫২-৪২ শতাংশ ভোট ও ৪১১-৩৭৩ আসন প্রাপ্তির একটি সম্ভাব্য ফলাফল দেখানো হয়েছিল। সে ক্ষেত্রে ইন্ডিয়া জোটের ১৫৫-১০৫ আসন জয়ের ইঙ্গিত ছিল। এসব ভোট-পূর্ব জরিপ ও বুথফেরত জরিপ সঠিক হয়নি। ভারতের গণতন্ত্র ও নির্বাচনের সৌন্দর্যের একটি প্রকাশ হচ্ছে, সে দেশের অত্যন্ত মেধাবী, প্রতিশ্রুতিশীল ও পেশাদার একাডেমিক ও গবেষকদের মনোগ্রাহী নির্বাচন বিশ্লেষণ এবং কিছু মেধাবী, অধ্যয়নশীল, অভিজ্ঞ ও ক্ষুরধার সাংবাদিকের তীক্ষ্ণ প্রশ্নবাণ। ভারতের নির্বাচন বিশ্লেষকদের মধ্যে দুজনকে আমি এখন অনুসরণ করার চেষ্টা করি। 

একজন প্রশান্ত কিশোর, অপরজন যোগেন্দ্র যাদব। প্রথমজন পেশাদার সেফোলজিস্ট এবং দ্বিতীয়জন গবেষক, একাডেমিক ও রাজনীতিবিদ। প্রশান্ত কিশোরের সর্বশেষ বিশ্লেষণে এনডিএ জোট ও মোদি কিছু আসন হারিয়েও ৩১০-এর কাছাকাছি যাবেন বলে ভবিষ্যদ্বাণী ছিল। তিনি রাজ্যওয়ারি লাভ-লোকসান হিসাব করে তা দেখিয়েছেন। বিপরীত দিকে যোগেন্দ্র যাদব মহাশয়ও রাজ্যভিত্তিক একটি হিসাব কষেন, যা তার ভাষায় খুব রক্ষণশীল হিসাব। তাতে ষষ্ঠ ধাপ শেষে সর্বভারতীয় ফলাফলে এনডিএ ২৪৮, অর্থাৎ ২৫০-এর কম আসনে এগিয়ে আছে। সপ্তম ধাপে তা পূরণ হয়ে ২৭২-এ যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। 

বাস্তবে হয়েছেও তাই, বিজেপি এককভাবে ২৪০ অতিক্রম করতে পারেনি। তিনি উত্তর প্রদেশ, বিহার, কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, হরিয়ানাসহ আরও কিছু রাজ্যে বিজেপির হার ও ইন্ডিয়া জোটের বেশ কিছু অর্জন দেখছেন। তিনি সারা ভারত ঘুরেছেন এবং প্রতিটি রাজ্যের একটি সাধারণ বিশ্লেষণ আবার ঝুঁকিপূর্ণ বা দোদুল্যমান আসনগুলোর নানা গতিধারা বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি নিজে ষষ্ঠ দফায় হরিয়ানায় ভোট দিয়েছেন। সেখানে তিনি ইন্ডিয়া জোটের ৩-৪টি অর্জন দেখতে পান। একইভাবে দিল্লিতেও কংগ্রেস-আম আদমির চারটি অর্জন দেখেছেন, যা অবশ্য সঠিক হয়নি। বিহারে তেজস্বী যাদবের রুপালি রেখা ও উত্তর প্রদেশে অখিলেশ-রাহুলের ‘গাটবন্ধন’ ভালো ফল দেবে বলে তার স্থির অনুমান ছিল, তা বহুলাংশে সফল হয়েছে। বাংলায়ও অবস্থা আশাতিরিক্ত ভালো হয়েছে। 

জোট সঙ্গীদের নিয়ে ‘ঐশ্বরিকভাবে আবির্ভূত বা জন্ম নেওয়া’ মোদি তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসবেন। তবে এবারের আসন রাজাসন হওয়ার নয়। এবার তিনি হবেন সমঝোতার প্রধানমন্ত্রী। বিহারের নীতিশ কুমার ও অন্ধ্রের চন্দ্রবাবু নাইডু কিং মেকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ। তাদের নানা চাওয়া-পাওয়া আছে। তা কতটুকু মেটানো হয় বা মেটে তা দেখার বিষয়। 

ভারতীয় কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষকের আশঙ্কা এ ‘ম্যারেজ অব কনভেনিয়ান্স’ ও এর মধুচন্দ্রিমা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ মোদি সিংহাসনে বসেই তার দলের আসন ২৭২-এর কাছে নিয়ে যাওয়ার নানা ছলচাতুরীতে লেগে যাবেন এবং এই দুই শরিককে নানাভাবে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা করবেন। এখন এই দুই শরিকের মোদির সঙ্গে থাকাটা ভারতীয় প্রেক্ষিত থেকে একধরনের ‘মজবুরি’। ছয় মাস পর কিছু উথাল-পাতাল শুরু হতে পারে। 

মোদি মহাশয় নির্বাচনে ফলাফলের পর সংসদীয় দলের সভা না করেই তড়িঘড়ি করে হিন্দি প্রবাদের ‘ঝট করে মাগনি, ফট করে বিয়ে’র মতো জোটসঙ্গীদের দস্তখত সংগ্রহ করে নিলেন। কারণ বিজেপি দলের অভ্যন্তরে নিথিন গটকরিসহ কিছু নেতার অসন্তোষ আছে, তা দলীয় সভায় ওঠার সম্ভাবনা ছিল। তিনি জোটসঙ্গীদের সমর্থনের ওপর ভর করে বিজেপি সংসদীয় দলের আনুষ্ঠানিকতা শেষ না করেই সব জল্পনা-কল্পনার ওপর এক কলস জল ঢেলে দিলেন। এখন জোটসঙ্গীদের নিয়ে সহজে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হলেন। কংগ্রেসের নেতৃত্বের জোট আপাতত বিরোধী দলে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার নির্বাচন থেকে বাংলাদেশের অনেক কিছু শেখার আছে। বাংলাদেশে অনেক নির্বাচন পর্যবেক্ষক ব্যক্তি ও সংস্থা আছে, কিন্তু সত্যিকারের কোনো সেফোলজিস্ট এখানে গড়ে ওঠেনি। এখানে বিশ্লেষণের অবকাশ সীমিত। কিছু বয়ান-বর্ণনা থাকে। কিছু বিরোধিতা, কিছু প্রশস্তি এবং অনেক অনেক পিঠ চুলকানি। আমাদের উপজেলা পরিষদ নির্বাচন সব ধাপ পেরিয়ে এখন শেষ। 

ফলাফলে ঘুরেফিরে চারটি বিষয়। এক. প্রার্থীর সম্পদ ও পেশা, দুই. সংসদ সদস্য, প্রভাবশালী নেতা ও মন্ত্রীদের সঙ্গে আত্মীয়তা, তিন. অপরাধ ও সন্ত্রাস এবং চার. ভোটে মানুষের অংশগ্রহণ খুবই কম। প্রায়ই ফোনে রিপোর্টারা প্রশ্ন করেন, স্যার অংশগ্রহণ এত কম কেন? আমি পাল্টা প্রশ্ন করি, আপনি কী জানেন না? আমতা আমতা করে বলেন, ‘জানি স্যার, তবু যদি একটু বলতেন’! ‘যা জানেন, তা দলিল-প্রমাণসহ লেখেন’। সাংবাদিক নিরুত্তর। এখানে কোনো অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা নেই। নেই গভীর একডেমিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। আমরা বাংলাদেশে সব দিক দিয়ে একটি বন্ধ্যা সময় অতিক্রম করছি।

লেখক: শিক্ষক ও স্থানীয় শাসন বিশেষজ্ঞ
[email protected]

মানব পাচার ও দুষ্ট শ্রমবাজার চক্র: ব্যবস্থা নেবে কে?

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪, ১১:২৭ এএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪, ১১:২৭ এএম
মানব পাচার ও দুষ্ট শ্রমবাজার চক্র: ব্যবস্থা নেবে কে?
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

সাধারণত জোরপূর্বক শ্রম, যৌন দাসত্ব অথবা পাচারকৃত মানুষের ব্যবসায়িক যৌন শোষণমূলক কাজে নিয়োজিত করার জন্য সংঘটিত অবৈধ মানব-বাণিজ্যকে মানব পাচার বলা হয়। মানব পাচার একটি দেশের অভ্যন্তরে বা এক দেশ থেকে অন্য দেশে সংঘটিত হতে পারে। তবে মানব পাচার যেখানে এবং যেভাবেই সংঘটিত হোক না কেন, তা বড় ধরনের অপরাধ। মানব পাচার বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সংঘটিত এমন একটি অপরাধ, যা মানুষের মুক্ত চলাচলের অধিকারকে হরণ করে। 

মানব পাচার আইন ২০১২ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির অধিকার হরণ করে জবরদস্তিমূলক শ্রম আদায়, দাসত্বমূলক আচরণ, পতিতাবৃত্তি বা যৌন শোষণ বা নিপীড়নের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে শোষণ বা নিপীড়ন করা হলে মানব পাচার হিসেবে গণ্য হবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মতে, শিশুশ্রমিক, সংখ্যালঘু এবং বেআইনি অভিবাসীরা প্রচণ্ডভাবে শোষিত হওয়ার সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে আছে। আর আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী, মানব পাচার হচ্ছে মানুষের অধিকারের লঙ্ঘন। 

দুঃখজনক হলেও সত্য, মানব পাচারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। দেশ থেকে মানব পাচারের ঘটনা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। অভাবের তাড়নায় বা অর্থনৈতিক সংকট দূর করতে বা উন্নত জীবনের আশায় বাংলাদেশ থেকে নারী-পুরুষ ও শিশু মালয়েশিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাচারের শিকার হচ্ছেন। উন্নত জীবন আর ভালো চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের পাচার করার পর শেষ পর্যন্ত তাদের পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হচ্ছে। অর্থলোভী, অসৎ লোক এবং দালালদের খপ্পরে পড়ে এভাবে অনেক মানুষের জীবন নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। 

বাস্তবতা হচ্ছে, মানব পাচারসংক্রান্ত ঘটনায় অনেক মামলা হলেও শেষ পর্যন্ত এসব মামলার তদন্ত এবং বিচার সেভাবে এগোয় না। গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১২ সালে দেশে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন হওয়ার পর থেকে গত বছরের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত মানব পাচারসংক্রান্ত প্রায় ৬ হাজার মামলা দায়ের করা হয়। 

এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় ৯ হাজার ৬৯২ জনকে। ২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এসব মামলায় সাজা হয়েছে মাত্র ৫৪ জনের। আর মানব পাচারসংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তির হারই খুব কম, যা দুঃখজনক। মূলত পাচারের শিকার অধিকাংশ পরিবারই ভোগান্তি ও সমস্যার মধ্য দিয়ে দিন যাপন করে এবং মানব পাচারকারী ও দালালরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সিনেমার দাদা ভাইয়ের মতো পর্দার আড়ালে বা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে।

ফলে মানব পাচার বন্ধ হয় না, বন্ধ হচ্ছে না। আবার মানব পাচারসংক্রান্ত মামলার তদন্তে ঘাটতি থাকায় অনেক আসামি খালাস পেয়ে যায়। মানবাধিকারকর্মীরা প্রায়ই অভিযোগ করে বলেন, দেশে আইনের শাসন থাকলে এত মানুষ পাচারের শিকার হতো না। মানব পাচারকারীরা অনেককেই টাকার ভাগ দেন। আর এটা বন্ধ করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার প্রয়োজন। 

ইতোপূর্বে দেশে মানব পাচারবিষয়ক কোনো সুনির্দিষ্ট আইন ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে দণ্ডবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মানব পাচারসংক্রান্ত অপরাধের বিচার করা নিষ্পত্তি করা হতো। সর্বশেষ ২০১২ সালে দেশে ‘মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন-২০১২’ নামক আইন প্রণয়ন করা হয়। 

এ আইনের ৬ ধারায় মানব পাচার নিষিদ্ধ করে এর জন্য অনধিক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও কমপক্ষে পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়। আইনটির ৭ ধারায় সংঘবদ্ধ মানব পাচার অপরাধের দণ্ড মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা কমপক্ষে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়। 

এই আইনের অধীনে কৃত অপরাধগুলো কগনিজেবল বা আমলযোগ্য অপরাধ এবং আপস ও জামিনের অযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন হওয়ার পরের আট বছরে এ-সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ৫ হাজার ৭১৬টি এবং ওই সময়ের মধ্যে মাত্র ২৪৭টি মামলার নিষ্পত্তি হয়। অর্থাৎ মামলা নিষ্পত্তির হার মাত্র ৪ শতাংশ। 

দ্বিতীয়ত, অতি সম্প্রতি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মীদের পাঠানো নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতি ও শেষ সময়ে কর্মীদের যেতে না পারার বিষয়টি দেশের সচেতন মহলকে ভাবিয়ে তুলেছে। খবরে প্রকাশ, গত মে মাসের শেষ ১০ দিনে প্রায় ৩০ হাজার মালয়েশিয়াগামী যাত্রীর কাছ থেকে বিমানের টিকিটের কথা বলে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া ভিসা ও ছাড়পত্র পেয়েও যথাসময়ে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক মালয়েশিয়ায় যেতে পারেননি। 

এ জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠান ও জড়িত ব্যক্তিরা কোনোভাবেই এই দায় এড়াতে পারে না। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সর্বাগ্রে মালোয়েশিয়ার ভিসাপ্রাপ্ত শ্রমিকদের মালয়েশিয়ায় পাঠানোর ব্যাপারে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবার পক্ষ থেকে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। পাশাপাশি ভবিষ্যতে দেশে যেন শ্রমবাজার নিয়ে দুষ্টচক্র এ ধরনের নৈরাজ্যকর ও জঘন্য পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়টিও সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সুনিশ্চিত করতে হবে। 

লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
[email protected]